“আপনাদের গ্রামে বৃষ্টি হচ্ছে?” উত্তর গুজরাটের বনসকাঁঠা জেলা থেকে ফোনে জানতে চাইলেন কারাভাই আল। “এখানে এক ফোঁটাও হচ্ছে না।” এটা হচ্ছে এই বছর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের কথা। “বৃষ্টি হলে আমরা বাড়ি ফিরব”, খানিক আশা নিয়ে তিনি বলেছিলেন।

তীব্র উৎকণ্ঠায় তিনি ভুলেই গেছিলেন যে তাঁর কথা হচ্ছে ৯০০ কিমি দূরে পুণে শহরে বসবাসকারী একজন অ-কৃষিজীবী মানুষের সঙ্গে। প্রতিবছর তিনি আর তাঁর পরিবার যে জীবন সংগ্রাম চালান তা এতটাই বর্ষাকেন্দ্রিক যে কারাভাইয়ের মনোযোগ স্বভাবতই বর্ষাতে নিবদ্ধ।

১২ মাস হয়ে গেল ৭৫ বছর বয়সী এই পশুপালক তাঁর পুত্র, পুত্রবধু, দুই নাতি ও ভাই এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে তাঁর বাৎসরিক অভিবাসনে গ্রামের বাইরে বাইরে ঘুরছেন। বিগত ১২ মাসে ১৪ সদস্যের এই দল তাদের ৩০০-এর বেশি ভেড়া, তিনটি উঠ, ও ভিচ্ছিও নামের এক রাতপাহারাদার কুকুর নিয়ে কচ্ছ, সুরেন্দ্রনগর, পাটন, বনসকাঁঠা জেলার উপর দিয়ে ৮০০ কিমি পথ পরিভ্রমণ করে চলেছে। 

গুজরাটের ৮০০ কিলোমিটার জুড়ে এই তিনটি অঞ্চলের উপর দিয়ে কারাভাই আলের সপরিবারে বাৎসরিক পরিভ্রমণ চলেসূত্র -গুগল ম্যাপস

কারাভাইয়ের স্ত্রী দোসিবাঈ তাঁদের স্কুল পড়ুয়া ছোটো নাতি-নাতনিদের নিয়ে গুজরাটের কচ্ছ জেলায় রাপার তালুকে জাতাভাদা গ্রামে তাঁদের নিজেদের বাড়িতেই থেকে যান। রাবারি সম্প্রদায়ভুক্ত এই গোষ্ঠী (এঁরা ওই জেলায় অন্যান্য অনগ্রসর জাতির তালিকাভুক্ত) প্রতি বছর ৮—১০ মাস তাঁদের ভেড়ার পালের জন্য চারণভূমির খোঁজে গ্রামের বাইরে থাকেন। নিয়ম মতো স্বাভাবিক বছরগুলোতে এই যাযাবর পশুপালকগণ দীপাবলীর পর (অক্টোবর-নভেম্বর) বেরিয়ে পড়েন আর ঠিক পরের বর্ষা শুরুর মুখে গ্রামে ফিরে আসেন।

অর্থাৎ বর্ষাকাল বাদে সারা বছরই তাঁরা ঘুরে বেড়ান। তাঁরা যখন ফিরেও আসেন তখনও পরিবারের কেউ কেউ বাইরেই থেকে যান জাতাভাদার সীমান্ত এলাকায় ভেড়া চরাবার জন্য। প্রয়োজনীয় বাসস্থান আর চারণভূমির অভাবে পশুগুলি গ্রামে থাকতে পারে না। 

“আমি তো ভেবেছিলাম গ্রামের প্যাটেল আমাদের তাড়িয়ে দেবার জন্য আপনাদের পাঠিয়েছেন।” আহমেদাবাদ থেকে ১৫০ কিমি দূরে অবস্থিত সুরেন্দ্রনগর জেলার গাভানা গ্রামের একটি শুষ্ক জমিতে মার্চের শুরুতে অবশেষে তাঁদের সন্ধান পাওয়ার পর এইভাবেই আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন কারাভাই।

তাঁর সন্দেহ অমূলক নয়। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির সময়ে কঠিন পরিস্থিতিতে গ্রামের জমির মালিকেরা ঘাস আর ফসলের গোড়ার অবশিষ্ঠাংশ নিজেদের পশুদের জন্য বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে পশুপালক ও তাঁদের পশুরপালকে নিজেদের এলাকা থেকে ভাগিয়ে দেন।

“এবারের দুষ্কাল (খরা) খুবই কঠিন”, কারাভাই আমাদের বললেন। সেইজন্যই আমরা গত বছর আষাঢ় মাসেই (জুন-জুলাই) রাপার ছেড়েছি কারণ একেবারে বৃষ্টি ছিল না।” তাঁদের শুষ্ক অনুর্বর জেলার খরা পরিস্থিতি তাঁদের বাৎসরিক অভিবাসনের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেরিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে।

“বর্ষার আগে অবধি আমরা আমাদের ভেড়ার পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াই। যদি বৃষ্টি না হয় আমরা বাড়ি ফিরতেই পারি না! এই তো হল মালধারীদের জীবন,” আমাদের তিনি বললেন। মালধারী কথাটি এসছে গুজরাটি মাল (পালিত পশু) ও ধারী (রক্ষক) থেকে।

“গুজরাটের অতি শুষ্ক ও প্রায় শুষ্ক অঞ্চলে ২০১৮-১৯ সালে খরা এত প্রবল হয়েছে যে যাঁরা ২৫ বছর যাবৎ গ্রামে থিতু হয়েছিলেন তাঁরাও অভিবাসী হয়েছেন খাদ্য, চারণভূমি ও জীবিকার সন্ধানে,” বললেন নীতা পান্ড্যা। নীতা আহমেদাবাদে মালধারী রুরাল অ্যাকশন গ্রুপ (মারাগ)-এর প্রতিষ্ঠাতা। এই অলাভজনক সংগঠনটি পশুপালকদের মধ্যে ১৯৯৪ সাল থেকে কর্মরত।

PHOTO • Namita Waikar
PHOTO • Namita Waikar

আল পরিবারের ৩০০ ভেড়া যখন একখণ্ড নিষ্ফলা জমিতে পরিণত হওয়া একসময়ের জিরে খেতে চরছিল তখন কারাভাই (ডানদিকে) তাঁর জাতাভাদা গ্রামের এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে জেনে নিচ্ছেন বাড়িতে সব ঠিকঠাক আছে কি না

২০১৮ সালে এই মালধারী পরিবারের বাসস্থান কচ্ছ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত নেমে গিয়েছিল ১৩১ মিলিমিটারে। কচ্ছের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৩৫৬ মিমি। তবে এটি নেহাত বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় এক দশক ধরে এই জেলার বৃষ্টিপাত ক্রমান্বয়ে খামখেয়ালি হয়ে চলেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুসারে ২০১৪ সালে জেলার বৃষ্টিপাত নেমে গিয়েছিল ২৯১ মিলিমিটারে, ২০১৬ সালে ২৯৪ মিলিমিটারে, কিন্তু ২০১৭ সালে তা আবার বেড়ে হয়েছিল ৪৯৩ মিমি। চার দশক আগের এমনই একটি পঞ্চবার্ষিকী (১৯৭৪—৭৮) বৃষ্টিপাতের গড় তথ্য দেখাচ্ছে যে একটি সর্বনাশা বছর (১৯৭৪ সালের ৮৮ মিলিমিটার) ছাড়া বাকি চার বছরই বৃষ্টিপাত ছিল গড় ‘স্বাভাবিকের’ তুলনায় বেশি।

গুজরাট ওয়াটার ক্রাইসিস রুটেড ইন ইয়ার্স অফ মিসপ্লেসড প্রায়োরিটিস শিরোনামের ২০১৮ সালের রিপোর্টে সাউথ এশিয়ার ড্যামস, রিভারস অ্যান্ড পিপল নেটওয়ার্ক-এর হিমাংশু ঠক্কর লিখছেন যে একের পর এক সরকার নর্মদা বাঁধকে কচ্ছ, সৌরাষ্ট্র ও উত্তর গুজরাটের খরা প্রবণ অঞ্চলের জীবনদায়ী বন্দোবস্ত হিসাবে হাজির করেছে। বাস্তবে কিন্তু এই অঞ্চলগুলি সবচেয়ে কম গুরুত্ব পায়। শহরাঞ্চল, শিল্পাঞ্চল ও মধ্য গুজরাটের কৃষকদের প্রয়োজন মেটানোর পর যে অবশিষ্ট জলটুকু থাকে সেটাই পায় এই অঞ্চলগুলি।

“নর্মদার জল পাওয়া উচিত এই অঞ্চলের কৃষক ও পশুপালকদের,” ঠক্কর আমাদের ফোনে বলেছিলেন। “কুয়োর সংস্কার তথা ছোটো বাঁধ নির্মাণের পূর্বগৃহীত পরিকল্পনাগুলির পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।”

মালধারীরা গ্রামের সাধারণ চারণভূমির উপর পশুখাদ্যের জন্য নির্ভরশীল। তাঁদের বেশিরভাগের জমি নেই বা যাঁদের আছে তাঁরা বাজরার মতো বৃষ্টিনির্ভর ফসল চাষ করেন যা তাঁদের নিজেদের  তথা পশুর পাল - উভয়ক্ষেত্রেই খাদ্য হিসেবে ব্যবহার্য্য।

“আমরা মাত্র দুদিন আগে এখানে এসেছি আর আজই এখান থেকে চলে যাচ্ছি। এখানে আমরা বেশি কিছু পাব না,” মার্চ মাসে একটি ফাঁকা জিরের খেতের দিকে দেখিয়ে বললেন কারাভাই। সেদিন অতিরিক্ত গরম আর শুষ্ক আবহাওয়া ছিল। ১৯৬০ সালে কারাভাই যখন কিশোর, সুরেন্দ্রনগরে বছরে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক তাপমাত্রা সম্বলিত দিনের সংখ্যা ছিল ২২৫। এখন এমন দিনের সংখ্যা ২৭৪; এই জুলাই মাসে নিউইয়র্ক টাইমস -এ প্রকাশিত আবহাওয়া ও বিশ্ব উষ্ণায়ন সংক্রান্ত একটি অনলাইন ইন্টার‍্যাক্টিভ টুল-এর গণনা অনুসারে ৫৯ বছর ধরে অন্তত ৪৯ টি দিন সংখ্যায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

যেখানে আমাদের সঙ্গে পশুপালকদের দেখা হয়েছিল, সেই সুরেন্দ্রনগরে, ৬৩ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষ কৃষিজীবী। গোটা গুজরাটে ৪৯.৬১ শতাংশ। এখানকার মূল ফসল তুলো, জিরে, গম, বাজরা, ডাল, চিনাবাদাম ও রেড়ি। ফসল কাটার পর তার গোড়া বা নাড়া ভেড়ার জন্য উৎকৃষ্ট পশুখাদ্য।

ভারতের ২০১২ সালের পশুশুমারি অনুসারে গুজরাটের ৩৩টি জেলার ১৭ লক্ষ ভেড়ার মধ্যে কচ্ছে আছে ৫৭০,০০০টি অর্থাৎ মোট ভেড়ার একতৃতীয়াংশের বেশি। রাবারি পশুপালকদের মধ্যে কাজ করে মারাগ — তার হিসাব অনুসারে ওই জেলার ওয়াগড় এলাকায় কারাভাই সহ আরও ২০০টি রাবারি পরিবারের বাস যাঁরা ৩০,০০০ ভেড়া নিয়ে ওই ৮০০ কিমি পথ পরিভ্রমণ করেন প্রতি বছর। তাঁরা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের বসত এলাকাকে কেন্দ্র করে ২০০-কিমি পরিসরের মধ্যেই পরিভ্রমণ করেন।

ফসল কাটার পর পশুর পালের মল-মূত্র জমিতে সার হিসাবে কাজ করে। বিনিময়ে চাষিরা পশুপালকদের বাজরা, চিনি এবং চা দেন। শতবর্ষ প্রাচীন পরস্পর-সহায়ক এই সম্পর্কে গভীর পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। 

“আপনাদের গ্রামে ফসল কাটা হয়ে গেছে?” পাটন জেলার গোবিন্দ ভারওয়াড়কে কারাভাই জিজ্ঞেস করলেন। “আমরা কি তাহলে ওই জমিতে খানিক থামতে পারি?”

“আপনাদের গ্রামে ফসল কাটা হয়ে গেছে,” পাটন জেলার গোবিন্দ ভারওয়াড়কে কারাভাই জিজ্ঞেস করলেন। “আমরা কি তাহলে ওই জমিতে খানিক থামতে পারি?”

“ওরা দুদিন পর ফসল কাটবে,” বললেন পাটন জেলের সামি তালুকের ধানোরা গ্রামের মারাগ দলের সদস্য এবং কৃষিজীবী-পশুপালক গোবিন্দ। “এইবার মালধারীরা গ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে পারবেন কিন্তু থাকতে পারবেন না। নিদারুণ জলাভাব ও পশুখাদ্যের অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এটা আমাদের পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত।”

পাটন অভিমুখেই কারাভাই ও তাঁর পরিবারের আগামী যাত্রা। বাড়ি পৌঁছাতে তাঁদের কচ্ছ, সৌরাষ্ট্র, ও উত্তর গুজরাট, এই তিনটি অঞ্চল পেরোতে হবে।

আবহাওয়া ও জলবায়ুর এত পরিবর্তনের পরেও, যাত্রাপথে তাঁদের অস্থায়ী গৃহেও আতিথেয়তায় কোনও ঘাটতি দেখা দেয়নি। কারাভাইয়ের পুত্রবধু হীরাবেন আল পরিবারের জন্য একগাদা বাজরার রোটলা (রুটি) আর সবার গরম চা বানিয়ে রেখেছেন। “আপনি কতদূর লেখাপড়া করেছেন? আমি নিজে কখনও স্কুলে যাইনি,” বলে তিনি বাসন মাজতে শুরু করে দিলেন। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষরা আছেন বলে যতবার তিনি উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন ততবারই চুনরি [আঁচল] মুখের উপর টেনে নিচ্ছিলেন। আবার যখনই কাজ করতে উবু হয়ে বসছিলেন তখনই সেটা পিছন দিকে টেনে নিচ্ছিলেন।

পরিবারের ভেড়াগুলি গুজরাট ও রাজস্থানের দেশীয় মাড়োয়ারি প্রজাতির ভেড়া। প্রতি বছর তাঁরা ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় ২৫ থেকে ৩০টি এঁড়ে ভেড়া বিক্রি করেন। ভেড়ার দুধ তাঁদের আয়ের আর একটি উৎস, যদিও এই জাতের ভেড়ার খুব বেশি দুধ হয় না। কারাভাই বললেন যে ২৫-৩০টি ভেড়া মিলে প্রতিদিন ৯-১০ লিটার দুধ দেয়। স্থানীয় ক্ষুদ্র দুগ্ধকেন্দ্রে লিটার প্রতি ৩০ টাকায় তা বিক্রি হয়। অবিক্রিত দুধ থেকে তাঁরা ঘোল তৈরি করেন আর যে মাখন তাতে ওঠে তার থেকে ঘি বানান।

ঘি পেট মা ছে! (ঘি পেটে আছে),” করাভাই মৃদু হাসলেন। “এই গরমে হাঁটতে পা জ্বালা করে, এটা খেলে লাভ হয়।”

আর পশম বিক্রি হয়? “দুবছর আগে পর্যন্ত মানুষ প্রতি পশুর পশম ২ টাকা করে কিনত। এখন কেউ কিনতে চায় না। এই পশম আমাদের কাছে সোনার তুল্য কিন্তু আমাদের তা ফেলে দিতে হয়,” বিষণ্ণ গলায় বললেন কারাভাই। তাঁর মতো পশুপালক, ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে ছাগল-ভেড়াই সম্পদ এবং তাঁদের জীবন-জীবিকার উৎস । এখন সেই সম্পদে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। 

PHOTO • Namita Waikar

১৩ বছরের প্রভুভালা আল আগামী পরিভ্রমণের জন্য উটটিকে প্রস্তুত করছে আর এর মধ্যেই তার বাবা ভালাভাই (ডানদিকে) ভেড়াগুলিকে একত্রিত করছেন। ইতিমধ্যে প্রভুভালার মা হীরাবেন (নিচে বাঁদিকে) একটু চা খেয়ে নিচ্ছেন আর কারাভাই (একেবারে ডানদিকে) দলের পুরুষদের তৈরি করছেন পরবর্তী দীর্ঘ যাত্রাপথের জন্য 

পশুশুমারি অনুসারে ২০০৭ থেকে ২০১২ এই পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতে ভেড়ার সংখ্যা ৭১.৬ মিলিয়ন থেকে ৬ মিলিয়নেরও অধিক কমে গিয়ে ৬৫.১ মিলিয়ন হয়েছে। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ ৯ শতাংশ। গুজরাটেও ৩০০,০০০ এর ঘাটতি হয়ে বর্তমানে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১.৭ মিলিয়ন।

কচ্ছেও পশুর সংখ্যা কমেছে কিন্তু মালধারীদের যত্নের কারণে এখানকার অবস্থা তুলনায় ভালো। এখানে ২০০৭-এর তুলনায় ২০১২-তে পশুর সংখ্যা কমেছে মাত্র ৪,২০০।

২০১৭ সালের পশুশুমারির ফল ছয় মাসের মধ্যে বেরোবে না, কিন্তু কারাভাই বলছেন যে পশুর সংখ্যায় কমতি তিনি দেখতে পাচ্ছেন এবং ভেড়ার সংখ্যা কমার জন্য একাধিক কারণের প্রভাব আছে বলে তিনি মনে করেছেন। “আমার যখন কৈশোর তখন কত ঘাস ছিল, কত গাছ ছিল, ভেড়া চরাবার কোনও সমস্যাই ছিল না। এখন জঙ্গল কেটে ফেলা হয়েছে, গাছ কেটে দেওয়া হয়েছে, তৃণভূমি সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, ছোটো হয়ে গেছে। গরম অনেক বেড়ে গেছে,” খামখেয়ালি আবহাওয়া ও জলবায়ু উস্কে দেওয়ার পিছনে যে মানুষের কাজকর্মই দায়ী সে বিষয়ে জোর দিয়ে তিনি এসব কথা জানালেন।

“অনাবৃষ্টির বছরগুলিতে আমরা যেমন কষ্ট পাই তেমনই ভেড়ারাও কষ্ট পায়,” তিনি বললেন। “তৃণভূমির সঙ্কুচিত হলে ওদের অনেক বেশি হাঁটতে হয়, ঘুরে বেড়াতে হয় খাদ্যের সন্ধানে। ভেড়া কমে যাওয়ার আর একটি কারণ বোধহয় এই যে কিছু রোজগারের জন্য মানুষ পশুগুলি বেচে দিচ্ছে।”

তৃণভূমির হ্রাস ও তাঁর পশুপালের জন্য চারণভূমি কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি ঠিকই বলেছেন। আহমেদাবাদের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভসের অধ্যাপক ইন্দিরা হিরাওয়ে জানালেন যে গুজরাটের ৪.৫ শতাংশ জমি পশুচারণভূমি। কিন্তু এই জমির উপর যে বড়ো ধরনের বেআইনি দখলদারি চলছে তা সরকারি তথ্য দেখায় না। অতএব প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পায় না। মার্চ ২০১৮-তে রাজ্য বিধানসাভায় এক প্রশ্নের উত্তরে সরকার স্বীকার করে যে ৩৩টি জেলায় ৪,৭২৫ হেক্টর চারণভূমি বেআইনিভাবে দখল হয়েছে। এমনকি এই সংখ্যাকেও কিছু বিধায়ক অবমূল্যায়িত তথ্য হিসাবে চ্যালেঞ্জ করেন।

সরকার স্বীকার করে যে ২০১৮ সালে রাজ্যের ২,৭৫৪টি গ্রাম ছিল একেবারে চারণভূমিহীন।

গুজরাট শিল্পোন্নয়ন নিগমকে হস্তান্তরিত জমির মধ্যে, যার মধ্যে সরকার দ্বারা অধিগৃহীত জমিও আছে, তার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ ও ২০০১ সালের মধ্যে সরকার কেবল এসইজেড-এর জন্য শিল্প খাতে ৪,৬২০ হেক্টর জমি হস্তান্তরিত করেছে। ২০০১ – ২০১১ এই সময়কালের শেষে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১,৩০৮ হেক্টর। 

PHOTO • Namita Waikar
PHOTO • Namita Waikar

জাতাভাদার পথে কারাভাই এবং (ডানদিকে) তাঁর স্ত্রী দোসিবাঈ আল ও প্রতিবেশী রত্নাভাই ধাগল, গ্রামে আল পরিবারের বাসগৃহের বাইরে

অন্যদিকে মার্চ মাসে সুরেন্দ্রনগরে দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কারাভাই সঙ্গী-সাথীদের তাড়া দিলেন, “প্রায় দুপুর হয়ে গেল, চল, এগোতে শুরু কর!” দলের পুরুষরা ভেড়ার পাল পিছনে নিয়ে এগিয়ে চললেন। তাঁর নাতি প্রভুভালা, পরিবারের একমাত্র সদস্য যে সপ্তম শ্রেণি অবধি স্কুলে পড়েছে — সে খেতের সীমানা ধরে ঝোপঝাড় খুঁজে বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরে বেড়ানো কয়েকটি পশুকে তাড়িয়ে পশুর পালের দিকে নিয়ে গেল।

তিন মহিলা তাঁদের দড়ির খাটিয়া, স্টিলের তৈরি দুধের পাত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন। দূরের গাছে বাঁধা একটি উটকে প্রভুভালা খুলে নিয়ে এল ওর মা হীরাবেনের গুছিয়ে রাখা ভ্রমনকালীন ঘর ও রান্নাঘরের তৈজসপত্রের কাছে, যাতে উটের পিঠে সেগুলি তুলে দেওয়া যায়।

পাঁচ মাস পর, অগাস্টের মাঝামাঝি রাপার তালুকের রাস্তায় কারাভাইয়ের সঙ্গে আমাদের আবার দেখা হল এবং আমরা জাতাভাদায় তাঁর বাড়ি গেলাম। “১০ বছর আগে অবধি আমিও পরিবারের সঙ্গে যেতাম,” সবার জন্য চা তৈরি করতে করতে বললেন তাঁর ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী দোসিবাঈ। “ভেড়া এবং সন্তানসন্ততিরাই আমাদের সম্পদ। ওদের সঠিক যত্ন নেওয়া দরকার, আমি কেবল এটুকুই চাই।”

এত ঘন ঘন খরা হচ্ছে বলে অভিযোগ করলেন ভাইয়াভাই মাকওয়ানা নামে তাঁদের এক প্রতিবেশী। “যদি জল না থাকে আমরা বাড়ি ফিরতে পারি না। গত ছয় মাসে আমি মাত্র দুবার বাড়ি আসতে পেরেছি।”

অন্য কিছু সমস্যার কথাও বললেন রত্নাভাই ধাগল, “আমি দুবছরের খরার পর বাড়ি ফিরে দেখি সরকার আমাদের চারণভূমিতে বেড়া দিয়ে দিয়েছে। আমরা সারাদিনই ঘুরে বেড়াই কিন্তু আমাদের ‘মাল’ [পশুগুলি] যথেষ্ট ঘাস পায় না। আমরা কী করব? ওদের চরতে নিয়ে যাব না খাঁচায় বন্দী করে রাখব? পশুপালনই একমাত্র কাজ যা আমরা পারি, এটাই আমাদের জীবিকা।”

“এই অনাবৃষ্টিতে বড্ড কষ্ট,” খামখেয়ালি আবহাওয়া আর জলবায়ুর কারণে ক্লান্ত বিধ্বস্ত কারাভাই জানালেন। “পশুদের কথা বাদ দিন, এমনকি পাখিদের জন্যও কোনও খাদ্য বা পানীয়টুকু জল নেই।”

অগাস্টের বৃষ্টি খানিক স্বস্তি দিয়েছিল। আল পরিবার যৌথভাবে বৃষ্টিনির্ভর আট একর জমির মালিক — তাতে তাঁরা বাজরা লাগিয়েছেন।

অনেকগুলি কারণ একযোগে পশুদের চারণ প্রক্রিয়া ও পশুপালকদের অভিবাসনকে প্রভাবিত করেছে - অমিল বর্ষা বা পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব, ক্রমগত খরা, তৃণভূমির সঙ্কোচন, রাজ্যে দ্রুতগতিতে শিল্পায়ন ও নগরায়ন, অরণ্যবিনাশ, পশুখাদ্যাভাব ও জলাভাব। মালধারীদের এই যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যে এইগুলি একাধারে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলাফল ও কারণ। সব মিলিয়ে এই সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার উপর এর গভীর প্রভাব পড়ছে এবং শতবর্ষ ধরে এঁরা যে নিয়মে জীবন যাপন করে এসেছেন তা বদলে যাচ্ছে।

“এই সমস্ত অসুবিধার কথা লিখুন,” আমাদের ফিরে আসার সময়ে কারাভাই বললেন, “দেখি তাতে কোনও পরিবর্তন আসে কিনা। না হলে ভগবান আছেন।”

ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজে সহায়তা করার জন্য লেখক আহমেদাবাদ এবং ভুজের মালধারী রুরাল অ্যাকশন গ্রুপের (মারাগ) প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন

পারি-র জলবায়ু বিবর্তনের উপর দেশব্যাপী রিপোর্টিং সংক্রান্ত প্রকল্পটি ইউএনডিপি সমর্থিত একটি যৌথ উদ্যোগের অংশ যার লক্ষ্য জলবায়ুর বিবর্তনের প্রকৃত চিত্রটি দেশের সাধারণ মানুষের স্বর এবং অভিজ্ঞতায় বিবৃত করা। 

নিবন্ধটি পুনঃপ্রকাশ করতে চাইলে [email protected]  – এই ইমেল আইডিতে লিখুন এবং সঙ্গে সিসি করুন [email protected]  – এই আইডিতে।

বাংলা অনুবাদ: চিলকা

চিলকা কলকাতার বাসন্তী দেবী কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার বিশেষ ক্ষেত্রটি হল গণমাধ্যম ও সামাজিক লিঙ্গ।

নমিতা ওয়াইকার লেখক, অনুবাদক এবং পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া, পারির নির্বাহী সম্পাদক। ২০১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য লং মার্চ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে।

Other stories by Namita Waikar