আর. কৈলাসম ব্যাঙ্কে গেলেই তাজ্জব বনে যান। তিনি বলছিলেন, "যখনই পাসবই আপডেট করাতে যাই আমাকে ভাগিয়ে দেয়, বলে যে মেশিন খারাপ, মেরামত করা হচ্ছে, অন্যদিন এসো।"
অথচ কে. জি. কান্ডিগাই শহরের এই ব্যাঙ্কে পৌঁছতে গেলে তাঁকে বাঙ্গালামেডু থেকে প্রায় দু'ঘন্টা হাঁটতে হয়। (বছরটাক আগেও আধা রাস্তা বাসে করে যাওয়া যেত, কিন্তু সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে এখন)।
তবে, আসল যুদ্ধটা শুরু হয় তিনি ব্যাঙ্কে পৌঁছনোর পর। তামিলনাড়ুর থিরুভাল্লুর জেলায় অবস্থিত এই যে কানাড়া ব্যাঙ্কের কে. জি. কান্ডিগাই শাখা, এখানে পাসবই আপ-টু-ডেট করানোর জন্য রয়েছে একটি স্বচালিত মেশিন। তবে আজ অবধি কৈলাসম এটা কোনদিনও চালাতে পারেননি ঠিকঠাক। "আমার দ্বারা এসব হবে না," অসহায় কণ্ঠে জানালেন তিনি।
ব্যাঙ্কে গেলেই তাঁর কপালে থাকে এন্তার ভোগান্তি, একদিন সকালবেলা তিনি সেই গল্পই শোনাচ্ছিলেন আমায়। কাছেই একটা ভেলিকাথান গাছের নিচে কয়েকজন মহিলা বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন: "ও দাদু, ওই মেশিনটা চালাতে গেলে বইয়ে একটা স্টিকার লাগাতে হবে তো!" ঠিক কথা, যে বারকোডটা না থাকলে মেশিন কাজ করে না সেটা সত্যিই কৈলাসামের পাসবইয়ে সাঁটা নেই। "বাবুরা কেন যে আমাকে এই স্টিকারটা দেননি তা আমি জানি না। এইসব ভজকট জিনিস মাথায় ঢোকে না আমার," বললেন কৈলাসম। ওই মহিলারাও এই সমস্যার তল খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অনেক ভেবেচিন্তে তাঁদের একজন বললেন, "আপনাকে একটা [এটিএম] কার্ড বানাতে হবে তো দাদু, তবেই ওই স্টিকারটা পাবেন।" সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলে উঠলেন, "আপনাকে ৫০০ টাকা দিয়ে একটা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।" ফুট কাটলেন তৃতীয়জন, "বিনেপয়সার অ্যাকাউন্ট হলে ওসব স্টিকার পাবেনই না।"
তবে ব্যাঙ্ককে ঘিরে এই যুদ্ধে তিনি একা নন। অ্যাকাউন্ট চালু রাখা, টাকা তোলা বা আয়ব্যয়ের হিসেব রাখা, এসব জিনিস বাঙ্গালামেডুর একাধিক মানুষের কাছে অত্যন্ত প্যাঁচালো একটি বিষয়। তিরুত্তানি ব্লকে রয়েছে রুখুসুখু জঙ্গলাকীর্ণ একটি অঞ্চল, তার মাঝ বরাবর চলে গেছে একটা রাস্তা, সেখানেই এই অসহায় মানুষগুলোর জনপদ – পোশাকি নাম যার চেরুক্কানুর ইরুলার কলোনি। রাস্তার দুই ধারে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িঘর, অল্প কয়েকটি পাকা দালান আর বাদবাকি সব অপরিসর কুঁড়েঘর। সর্বসাকুল্যে ৩৫টি ইরুলা পরিবারের নিবাস এখানে। (সরকারি নথিতে যদিও এই জনজাতির নামের বানান 'ইরুলার' লেখা হয় আজকাল)।
এই জনপদেই রয়েছে মাটি দিয়ে বানানো চারটি দেওয়াল এবং জরাজীর্ণ এক খড়ের ছাউনির তলায় কৈলাসম (৬০) এবং কে. সঞ্জয়াম্মার (৪৫) সংসার। আপনজন বলতে চারটি ছাগল যাদের দেখভাল করেন সঞ্জয়াম্মা। এঁদের চার সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বিয়েথা করে আলাদা ঘর বেঁধেছেন। দিনমজুর কৈলাসম জানালেন, "মাঠে কাজ করতে গেলে সারাটা দিন নুয়ে থাকতে হয় তো। পিঠটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যায় যেন, হাড়গোড়ে বড্ড ব্যথা হয়। তার চেয়ে পুকুর কাটার কাজ [অর্থাৎ এমজিএনআরইজিএর অধীনে ১০০ দিনের কাজ] অনেক ভালো।" মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট ২০০৫এর দ্বায়িত্ব প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরে ১০০ দিন মজুরি কাজ বরাদ্দ করা – তবে বাঙ্গালামেডুর ইরুলাদের কপালে ১০০ দিনের শিকে ছেঁড়ে কস্মিনকালে।











