যত্রততত্র মলমূত্র ত্যাগ করাটাই এখানকার রীতি, ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমাশয় লেগে থাকে ঘরে ঘরে, বিশেষ করে বন্যার পরপরই প্রকোপ বাড়ে তার। পানীয় জলের কাহিনি তো বেশ করুণ, একেকটি টিউবওয়েলের ভরসায় বেঁচে থাকে ১০টি করে পরিবার, সেটা বিগড়ে গেলে তার মেরামতির যাবতীয় খরচপাতিও নিজেদেরকেই বহন করতে হয়।
"আমাদের চরখানা দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে বিভক্ত – দখিন পাড়ে বোকো আর উত্তরে চেঙ্গা। তবে কি যেন একটা সরকারি গড়বড় হয়েছিল, তাই চেঙ্গা কেন্দ্রের লোকজন বহুযুগ ধরে বিপিএল (দারিদ্রসীমার নিচে) রেশন পাচ্ছিল না," জানালেন আলি। ইনি নিজে অবশ্য বোকো বিধানসভা কেন্দ্রের মানুষ, তাই আর কোনও সুযোগ-সুবিধা না জুটলেও অন্তত বিপিএল রেশনের চালটুকু পান।
এ পোড়া চরের দেশে কেবল খোয়াব হয়েই রয়ে গেছে বিদ্যুতিক সংযোগ, নিদেনপক্ষে একটি সৌরচালিত লণ্ঠনও জোটে না। ফলত কেরোসিনের ভরসাতেই বেঁচে আছেন এই পরিবারগুলি, যার দাম লিটার-পিছু ৩৫ টাকা হলেও আলির সংসারে কমসে কম ৫-৭ লিটার তো লাগেই প্রতি মাসে। এমনকি রেডিয়োর মতো একটা তুচ্ছাতি তুচ্ছ জিনিসও বিলাসিতা এখানে।
আলি বলছিলেন: "চরগুলো যদি নিদেনপক্ষে ২০টা বছরও টিকে থাকত গো, তাহলে জীবনটা অনেকখানি সহজ হত। কিন্তু চরগুলো যে ১০টা বছরও টেকে না। যতদিনে ধরুন খানিক খানিক রোজগারপাতি শুরু করে মোটামুটি থিতু হতে পারি, ততদিনে ভাঙন শুরু হয়ে যায়। ব্যাস, আর কি? তল্পিতল্পা গুটিয়ে কেটে পড়তে হয়।"
"এটাই আমাদের সাতকাহন। যতজন চরবাসী আছে, সব্বার একই হাল। তবে হ্যাঁ, আমার গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়..." এই অবধি বলে নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের কথা শুরু করলেন আলি। ১৮ বছর বয়সী সেই ছেলেটি লোয়ার আসামের বরপেটা জেলায় একটি কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে। বড়োছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করতে অক্ষম ছিলেন আলি। কিন্তু, বছর দুই আগে, শিক্ষকদের সাহায্যে এই ছেলেটি হাজার তকলিফ সয়েও উচ্চমাধ্যমিকে ৮৩ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল।
"মেডিক্যাল কলেজে ঢোকার বড্ডো ইচ্ছে আমার পোলাটার, জেদ ধরে বসে আছে," বললেন আলি, "কিন্তু ওর টিচাররা বলেছে, ডাক্তারি পড়তে কম করে হলেও ৩০ লাখ টাকা লাগবে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করলেও শেষ অবধি যে ও কী করে টানবে তা ভেবে পাই না।"
তবে জিন্দেগির পানি যে একদিন না একদিন ঠিক নতুন খাতে বইবেই, মরেও না মরা সে আশার ঝিলিক দেখেছিলাম আলির দুচোখে।
অনুবাদ: জশুয়া বোধিনেত্র (শুভঙ্কর দাস)