কোনও প্রকল্পের সাফল্য কি তার কখনই না সম্পন্ন হওয়া কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিবেচিত হতে পারে?
আলবাত! যদি সেটি বিশ্বের জটিলতম গ্রামীণ জগৎ বিষয়ে রক্তমাংসের একটি চলমান আর্কাইভ হয়। বৈচিত্র্যে অনন্য গ্রামীণ ভারত, এই চরাচরে তার জুড়ি মেলা ভার। গ্রামীণ ভারতে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায় আর গোষ্ঠীর ৮৩.৩ কোটি মানুষে ভাষা প্রায় ৮০০। একই বৈচিত্র্য গোচর হয় বিবিধ পেশা, জীবিকা, শিল্প, কারিগরি, সংস্কৃতি, সাহিত্য, লোককথা, পরিবহণ ও অন্যান্য হরেক জিনিসে — পারির লেখায় ফুটে ওঠে এই সবকিছু।
বিজ্ঞাপন ও তারকা-নির্ভর ‘মূলধারার’ মিডিয়ায় ঠাঁই পায় না গ্রামীণ ভারত। আমাদের সমকালীন সময়ে দেশের গ্রামাঞ্চলে মানুষজন কেমনভাবে বেঁচে আছেন, কী কাজ করছেন, ২৫ কি ৫০ বছর পর এই বিষয়ে সম্যক ধারণা পেতে গেলে পারি বাদে আর কোনও মহাফেজখানা থাকবে না ভারতীয়দের কাছে। একইসঙ্গে এটি একটি সমসাময়িক ও চলমান জার্নালও বটে — আমজনতার বারোমাস্যা যেখানে লিপিবদ্ধ হয়ে চলেছে।
দ্য পিপলস্ লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সূত্র থেকে জানা যায় আমাদের এই সারা দেশে প্রায় ৮০০টি ভাষা এবং ৮৬টি ভিন্ন ভিন্ন লিপি ব্যবহার হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ৮০০টির মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ ভাষাই ব্যবহার হয়।
১২০ কোটি ভারতীয় যে যে ভাষায় কথা বলেন, যে সব বুলি তাঁদের মাতৃভাষা, তেমন ১৫টি ভাষায় আজ প্রকাশিত হয় পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন।
ভারতে সংবিধানের ৮ম সিডিউল অনুসারে, তালিকাভুক্ত ২২টি ভাষায় উন্নয়নকল্পে প্রসারের লক্ষ্যে দেশের সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অথচ, এমন রাজ্যও আছে যেখানকার সরকারি ভাষাটিই এই তালিকার ২২টি ভাষার মধ্যে স্থান পায়নি, উদাহরণস্বরূপ মেঘালয়ের গারো এবং খাসি ভাষার কথাই বলা যায়। একদিকে, ছ’টি ভারতীয় ভাষা ৫ কোটি বা তার বেশি মানুষ ব্যবহার করেন, তিনটি ভাষা ব্যবহার করেন ৮ কোটির অধিক মানুষ এবং একটি ভাষা ব্যবহার করেন প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। অন্যদিকে, অনন্য সব আদিবাসী ভাষা, হয়তো সেগুলিতে কথা বলেন মাত্র ৪০০০ মানুষ, কোনওটায় তার চেয়েও কম। পূর্ব ভারতের ওড়িশা রাজ্যেই প্রায় ৪৪টি আদিবাসী ভাষার অস্তিত্ব আছে। লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে জানাচ্ছে, বিগত ৫০ বছরে প্রায় ২২০টি লুপ্ত হয়ে গেছে। ত্রিপুরা রাজ্যের সায়মার ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র পাঁচে এসে ঠেকেছে।
ভারতবর্ষের গ্রামীণ জগৎ এক অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে চলেছে, তার অনন্য বৈচিত্র্যও অবলুপ্তির পথে – ফলস্বরূপ আমরা হয়ে পড়ছি দীর্ণ। আমাদের দেশে বয়ন শিল্পে যে অসংখ্য বুনন শৈলী, ধারা এবং ঘরানা বর্তমান তা, আর কোথাও দেখা যায় না। অথচ ঐতিহ্যশালী এই তন্তুবায় সম্প্রদায় এবং গোষ্ঠীগুলি আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। এই গোষ্ঠীগুলির অবলুপ্তিতে শেষ হয়ে যাবে পৃথিবীর এক গৌরবময় অধ্যায়। কথকতা, কিসসা ইত্যাদি বহু বিশিষ্ট পেশা আজ লুপ্তপ্রায়।
আবার আমাদের গ্রামাঞ্চলে এমন বেশ কয়েকটি পেশা আছে যার অস্ত্বিত্ব শুধুমাত্র কয়েকটি দেশেই রয়েছে। ধরা যাক খেজুর, তাল ইত্যাদি গাছ থেকে রস সংগ্রাহকরা, যাঁরা দিনে অন্তত ৫০টি গাছে চড়েন , রসের মরসুমে একই গাছে তিনবার। এই রস থেকে তাঁরা তৈরি করেন গুড় এবং আবার রস গাঁজিয়ে তৈরি করেন তাড়ি জাতীয় দেশি মদ। রসের মরসুমে রস সংগ্রাহকরা প্রতিদিন নিউ ইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর চেয়েও অনেক বেশি উচ্চতায় ওঠেন। কিন্তু এমন অনেক পেশাই ধ্বংসের মুখে। মৃৎশিল্পী , ধাতুশিল্পী এবং আরও অসংখ্য, চূড়ান্ত দক্ষতা সম্পন্ন কারিগরেরা অতি দ্রুত তাঁদের জীবন-জীবিকা হারাচ্ছেন।
গ্রামীণ ভারতকে যা কিছু চরিত্রগতভাবে বিশিষ্টতা দান করেছে, তার অধিকাংশই আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যাবে। দুঃখের বিষয়, এই অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্য পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত, উদ্বুদ্ধ করে তোলার জন্য রেকর্ড করে সংরক্ষিত করে রাখার যথাযথ কোনও প্রয়াসই করা হয়নি। গ্রামীণ ভারতের চমকপ্রদ পৃথিবীটির কথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে খুব সামান্যই পৌঁছবে। খুব কমই জানা যাবে। বর্তমান নতুন প্রজন্মের সঙ্গেও ক্রমাগত গ্রামীণ ভারতের সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসছে।
গ্রামীণ ভারতের সবটাই যে নির্মল, বিশুদ্ধ এমন নয় – এমন অনেককিছুই আছে যার এই মুহূর্তেই নির্মূল হওয়া প্রয়োজন। গ্রামীণ ভারতের যা কিছু কদর্য, নিষ্ঠুর, হিংস্র, করাল তা চিরতরে লুপ্ত হোক - অস্পৃশ্যতা, সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো, বন্ধুয়া শ্রম ব্যবস্থা, জাতপাত ও লিঙ্গভিত্তিক চরম শোষণ এবং বঞ্চনা, জমির দখলদারি ইত্যাদি। কিন্তু আফশোসের কথা এই যে, গ্রামীণ ভারতের যা কিছু বর্বর ও কদর্য তা আরও জাঁকিয়ে বসছে, আর অন্যদিকে শেষ হয়ে যাচ্ছে যা কিছু মহান, সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময়। পারির আর্কাইভে এইসব সংরক্ষণ করার প্রয়াস করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষিতেই পারি হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক।
পারি এক জীবন্ত জার্নাল, রক্তমাংসের চলমান আর্কাইভ।
গ্রামীণ ভারত বিষয়ে বর্তমানকালে এবং সমসাময়িক সময়ে যা কিছু প্রতিবেদন রচিত হয়েছে তা পারি এখানে একত্রিত করবে এবং নিজেও এধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রতিবেদন রচনা করবে। এছাড়া অতীতে এই বিষয় ঘিরে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রতিবেদন, নিবন্ধ, ভিডিও এবং অডিও ইত্যাদি যা কিছু প্রকাশিত হয়েছে, সেসবের আকর বা ডাটাবেস হিসেবেও পারি কাজ করবে। পারির নিজস্ব যাবতীয় বিষয়বস্তু ক্রিয়েটিভ কমন্স-এর রীতি মেনে চলে, এবং এই সাইট বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। যে কেউ পারির আর্কাইভে নিজের ক্ষমতা এবং দক্ষতা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেন। আমাদের এই সাইটের জন্য লিখুন, ভিডিও তৈরি করুন, রেকর্ডিং করুন – আমাদের আদর্শ এবং নির্দেশাবলীর সঙ্গে একমত হলেই আপনি এই সাইটটির জন্য মূল্যবান সম্পদ সৃষ্টি করতে পারেন। পারির মূল বিষয়টিই হল: সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
গ্রন্থাগার ও যাদুঘরে যাওয়ার রেওয়াজ ক্রমশ কমে আসছে, বিশেষ করে বিগত ২০ বছরে তা বেশিমাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। তবুওযাদুঘরে যা কিছু সম্পদ থাকে, তার অনেককিছুই বাইরেও আমরা দেখতে পেতাম: মিনিয়েচার চিত্রশিল্পের নানান ঘরানা, ভাস্কর্য রীতি ইত্যাদি। এখন এইসব পরম্পরাও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে গ্রন্থাগার ও যাদুঘরে যাওয়ার আর তেমন চল নেই, থাকলেও তা নেহাত নিয়মরক্ষায় দাঁড়িয়েছে। অথচ, এমন একটা স্থান রয়েছে যেখানে ভারতবর্ষ তথা তামাম দুনিয়ার নবীনদের আনাগোনা অনেক বেশি: ইন্টারনেটের দুনিয়া।
আজও এ দেশের কোটি কোটি নিম্ন বুনিয়াদি মানুষের কাছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছায়নি, তবে ধীরে ধীরে তা বেশি বেশি মানুষের নাগালে আসছে। [সর্বশেষ ডায়াল-আপ কানেকশনটি বন্ধ হয়ে যায় ২০২১ সালের মার্চ মাসে]। এই আন্তর্জালিক দুনিয়াই আম জনতার জীবন ঘিরে সৃষ্ট জীবন্ত সর্বজনীন জার্নাল ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার সেরা মঞ্চ। দ্য পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া। হাজার দুনিয়ার সুলুকসন্ধানী এক ওয়েবসাইট। আমাদের আশা, আগের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে সবচাইতে বেশি সংখ্যক ভাষা ও স্বরের সমাগম হবে আমাদের পোর্টালে।
অর্থাৎ, অভূতপূর্ব এক উদ্যোগ যার ব্যাপ্তি এবং সম্ভাবনা অপার, যেখানে ব্যবহৃত হবে অডিও, ভিস্যুয়াল, টেক্সট ইত্যাদি অসংখ্য মাধ্যম। এমন এক মঞ্চ যেখানে আখ্যান, পেশা, কার্যকলাপ, ইতিহাস ইত্যদি যতটা সম্ভব, গ্রামীণ ভারতের অধিবাসীদের দ্বারাই কথিত হবে। বলবেন চায়ের পাতা তোলা শ্রমিক চা-বাগানে দাঁড়িয়ে; সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া মৎস্যজীবী, গান গাইতে গাইতে ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত মহিলা শ্রমিকেরা; অথবা পরম্পরাগত কথকেরা। বলবেন খালাসিরা, যাঁরা সমুদ্রে বড়ো জাহাজ নামানোর জন্য ক্রেন বা মাল তোলার কর্কলিফট ব্যবহার না করে সাবেক পদ্ধতি আজও ব্যবহার করেন। অর্থাৎ এককথায়, সাধারণ মানুষ আমাদের বলবেন নিজেদের কথা, তাঁদের শ্রমের কথা, তাঁদের জীবন-জীবিকার কথা – এমন এক পৃথিবীর কথা যা আমাদের অগোচরেই রয়ে যায়।
২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের থেকে এক বহুমূল্য আকরের স্বীকৃতি পেয়েছে দ্য পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া। নিজেদের ওয়েবসাইট ও ডেটাবেসে পারিকে রেকর্ড ও আর্কাইভ করার অনুমতি চেয়েছেন তাঁরা।
পারির আধেয় বিষয়বস্তুগুলি কী কী?
পারি ভিডিও, ফটোগ্রাফ, অডিও এবং টেক্সট আর্কাইভের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অনন্য সাইট। একই সঙ্গে এটি একটি সমসাময়িক সংবাদ পোর্টাল।
ইংরেজি ভাষায় এক ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিন মঞ্চ রূপে ২০ ডিসেম্বর, ২০১৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে পারি। আর আজ নিউজ ওয়েবসাইট না হয়েও ১৫ ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে পারি, বছর বছর লক্ষ লক্ষ পেজ-ভিউ জমা হয় আমাদের ঝুলিতে।
পারির কিছু অনন্য প্রয়াসের কথা এখানে রইল। যদিও, ১২টি বিষয়ের এই সূচি নেহাতই পারির কাজের একটা ভগ্নাংশ মাত্র, এটা দিয়ে কিন্তু পারির কর্মকাণ্ড মাপা যায় না। মোটের উপর পারি কোন কোন বিষয় ঘিরে কাজ করে, একঝলকে সেটার একটা রূপরেখা পেতে পারেন এই তালিকায়।
জলবায়ু পরিবর্তন
বহু কৃষি-জৈবতান্ত্রিক অঞ্চল (এবং ৩০টি অঞ্চল ও উপ-অঞ্চল) থেকে উঠে এসেছে জলবায়ু বদলের রূপরেখা ঘিরে পারির ক্লাইমেট চেঞ্জ সিরিজ। ২০২০ সালের শেষভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের সূচনা, তারপর প্রকাশিত হয়েছে ৩০টিরও অধিক প্রতিবেদন যেগুলি পারিকে এনে দিয়েছে ৪টি পুরস্কার। জলবায়ু বিবর্তনকে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা — পারির কাহিনিগুলিতে খেটে খাওয়া ভারতীয় নাগরিকদের স্বরে উঠে এসেছে জলবায়ু ঘিরে তাঁদের যাপিত অভিজ্ঞতার কথা। এই মানুষেরা চাষি, মজুর, জেলে, যাযাবর পশুপালক, সামুদ্রিক শ্যাওলা সংগ্রহকারী, মউলি, পতঙ্গ-সংগ্রহকারীর মতো অসংখ্য পেশায় নিযুক্ত। ভঙ্গুর পার্বত্য জৈবতন্ত্র, অরণ্য, সমুদ্র, উপকূল অঞ্চল, প্রবাল দ্বীপ, মরুভূমি, শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক ভৌগলিক অঞ্চল — সর্বত্র হাজির হয়েছি আমরা সরেজমিনে জলবায়ুর গতিপ্রকৃতি বুঝতে।
আমজনতার কণ্ঠস্বরকে কেন্দ্রে রেখে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের বক্তব্যকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু প্রভাবের নিরিখে হামেশাই দেখা গেছে যে জনসাধারণের জীবন্ত অভিজ্ঞতা আর ভারতের তাবড় তাবড় জলবায়ু বিশেষজ্ঞের কথা মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে, এই প্রতিবেদনটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ: জলবায়ু বিবর্তনের ডানায় ভর করে যুদ্ধে নেমেছে পোকামাকড়ের দল।
গতানুগতিক মিডিয়ার কলম হয় অত্যন্ত বিমূর্ত কিংবা দাঁতভাঙা শব্দজালে সাজানো, পাঠকের জীবনের সঙ্গে যে সব বিষয়বস্তুর আদৌ কোনও সম্পর্ক নেই। যেমন ধরুন গলতে থাকা কুমেরুর তুষার পরত, কিংবা অ্যামাজনের দাবানল, নয় অস্ট্রেলিয়ার বুশফায়ার। আর তা না হলে সেই আন্তঃসরকারি বৈঠকের একঘেয়ে ধারাবিবরণী। পারির জলবায়ু রিপোর্টিংয়ের মধ্যে দিয়ে পাঠক তাঁর আপন জীবনের নিরিখে সমস্যাটিকে চিনতে এবং সনাক্ত করার চেষ্টা করেন।
গ্রন্থাগার
পারির গ্রন্থাগারটি অনন্য। কারণ আমরা কেবল বইপত্র জুগিয়েই দায়মুক্ত হইনি, একটা নিঃশুল্ক লাইব্রেরি গড়ে তুলতে পেরেছি। শুধু লিংক দিয়েও খালাস না হয়ে, গ্রামীণ দুনিয়া সংক্রান্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট, গবেষণা, সমীক্ষা, নথি এবং বই — যা হয় বৈদ্যুতিন ইলেকট্রনিক রূপে পেয়েছি কিংবা নিজেরাই ডিজিটাইজ করেছি — তা সম্পূর্ণরূপে প্রদান করি আপনাকে। পারির গ্রন্থাগারটি পুরোপুরি নিশুল্ক, প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ও ক্রেডিট দিলেই ডাউনলোড করা যায়।
পারির গ্রন্থাগার বিভাগ আদতে উপরিউক্ত রিপোর্ট ও গবেষণার একটি অনলাইন মহাফেজখানা নির্মাণের প্রচেষ্টা। গ্রন্থাগার ন্যাভিগেশনে যাতে অসুবিধা না হয়, সেই মর্মে প্রতিটি রিপোর্ট, গবেষণাপত্র ও বইয়ের সঙ্গে রয়েছে সযত্নে লেখা সারসংক্ষেপ — 'ফোকাস অ্যান্ড হাইলাইটস্'। এর পিছনে রয়েছে স্বেচ্ছাকর্মীদের একটি ক্রমবর্ধমান দল (৩২০ জনেরও অধিক, যাঁদের মধ্যে সর্বদাই ৪০-৫০ জন সক্রিয় রয়েছেন)।
পারির গ্রন্থাগারে রয়েছে সরকারি সমীক্ষা, স্বাধীন অসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও দ্বারা প্রকাশিত রিপোর্ট, ঐতিহাসিক জনগণনার তথ্য ও ইমপেরিয়াল গেজেটিয়ার, আইনের খসড়া বিল, আইন ও সাংবিধানিক সংশোধন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়, কপিরাইটমুক্ত সাহিত্য (প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু, উভয়ের জন্য), স্ক্যান করা বই ও ই-বুক, গবেষণাপত্র, পত্রিকা এবং আরও বহু জরুরি দস্তাবেজ।
কৃষক আন্দোলন
চাষিদের জীবনযুদ্ধ, কৃষি সংকট ও আরও নানান বিষয়ে শয়ে-শয়ে প্রতিবেদন রয়েছে পারিতে। পারির জন্মলগ্ন থেকেই এই বিষয়ে খবর প্রকাশ করছি আমরা। তবে আমাদের মনে হয়েছিল, ২০২০ সালে গৃহীত তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চাষিরা যেভাবে যুদ্ধে নেমেছিলেন, সেটার জন্য আলাদা একটি বিভাগ হওয়া দরকার। সাম্প্রতিক কালে এটিই ছিল সাংবিধানিক বিধি মেনে সংগঠিত সর্ববৃহৎ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন — তাও আবার এমন এক সময়ে যখন অতিমারির প্রকোপ ছিল তুঙ্গে।
পড়ুন: কৃষি আইনের বিরুদ্ধে লড়াই: সম্পূর্ণ কভারেজ। তাছাড়া আগেকার আন্দোলন ঘিরে খানকতক যে প্রতিবেদন রয়েছে আমাদের, সেগুলিও দেখুন — যেমন ধরুন ২০১৮ সালের নাসিক থেকে মুম্বইয়ের লং মার্চ।
মুখোমুখি
ভারত ভূখণ্ডের অধিবাসীদের মুখাবয়বের যে বৈচিত্র্য, সেটি সুপরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে সর্বপ্রথম ও একমাত্র পারি-ই ম্যাপ করেছে। এই ফেসেস প্রকল্পের বীজ লুকিয়ে আছে নিডো তানিয়ার মর্মান্তিক হত্যায়। ২০১৪ সালে, অরুণাচল প্রদেশের এই নবীন পড়ুয়াটির উপর দিল্লিতে নেমে এসেছিল বর্ণবাদী আক্রমণ, পিটিয়ে মারা হয় তাঁকে। দুষ্কৃতকারীর দল সাংবাদিকদের বলেছিল, “ওকে দেখে চিনা মনে হয়েছিল।” এর থেকে জন্ম নেয় একটি সওয়াল: তাহলে ভারতীয়র মতো দেখতে ঠিক কে? ‘ভারতীয় মুখশ্রী’ বলে আদৌ কিছু আছে নাকি?
এই প্রকল্পের যাত্রাপথে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে, হ্যাঁ, ‘ভারতীয় মুখশ্রী’ অবশ্যই আছে — তবে তা ১৪০ কোটি ধরনের। দেশের প্রতিটি জেলা, প্রতিটি ব্লক, পারির ফটোগ্রাফাররা যেখানে যেখানে পৌঁছতে পেরেছেন, সেখান থেকেই ‘ভারতীয় মুখ’-এর ছবি এসে জমা হয়েছে আমাদের ডেটাবেসে।
লকডাউনের গেরোয় জীবন-জীবিকা
কোভিড-১৯ অতিমারির জেরে যখন সমগ্র দেশে লকডাউন বলবৎ হল, তখন লক্ষ লক্ষ জীবিকার যে দুর্বিষহ হাল হয়েছিল, সেকথা দেশের সামনে তুলে ধরেছিল পারি। কোটির সংখ্যায় দেশান্তরি মানুষের দল যখন শহর ছেড়ে নিজ নিজ দেশগাঁয়ের পথে হাঁটা দেয়, বলা হয়েছিল যে সেটা নাকি 'ফিরতি পরিযান' — চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় মিডিয়ার — ওঁরা এভাবে ফিরে যাচ্ছেন কেন? অবশ্য সঠিক প্রশ্নটা কিন্তু পারিই করেছিল: ওঁরা গ্রাম ছেড়েছিলেন কেন? উত্তর মিলবে এক জোড়া শব্দে: কৃষি সংকট।
ফিরতি পরিযায়ীদের সঙ্গ নিয়েছিলেন পারির সাংবাদিকরা, তবে নগরের সীমানায় এসে তাঁরা থেমে যাননি। শ্রমিকরদের গ্রামে গ্রামে যাই আমরা, যাতে জীবন-স্মৃতিতে দেখা সর্ববৃহৎ এই মানবপ্রস্থানকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে অনুধাবন করা যায়, যাতে অভিবাসী জনগোষ্ঠী, বৃহত্তর সমাজ ও নীতিগঠকের দল কেউই অন্ধকারে না থাকে।
আর এই তাগিদ থেকেই, শুধুমাত্র ‘লকডাউনের গেরোয় জীবন-জীবিকা’ বিষয়টি ঘিরে উঠে আসে ২০০টির অধিক প্রতিবেদন। কোভিড-১৯ অতিমারির যে মূল্য চুকিয়েছে মানুষ, সেটাই এই সংকলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রসঙ্গত, এসব চলাকালীন জনাকয় পরিযায়ী শ্রমিকও সাংবাদিকতা ও গল্প-বলার জগতে পা রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
শিল্প, শিল্পী, কারিগর ও কারিগরির গল্প
ভারতীয় সংস্কৃতির যে তাজ্জব করা বৈচিত্র্য ও বহুত্ব তাকে পারি সযতনে খতিয়ে দেখেছে। এসব ঘিরে অসংখ্য বিভাগ ও চলমান সংবাদ-প্রকল্প রয়েছে আমাদের।
গ্রামীণ ভারতের গায়েন ও কবির দল, কিংবা মৃৎশিল্পের অসংখ্য চমৎকার ঘরানা, এসব নিয়ে আমাদের কাজ দেখতে পারেন। আস্তে আস্তে সবই হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন ধরুন ভারতীয় বুনকরদের অস্তগামী দুনিয়া। গ্রামীণ ভারতের বাজনা নিয়েও বিশেষ একটি বিভাগ রয়েছে আমাদের। সেখানে আছে এদেশের অসামান্য বাদ্যযন্ত্র ধারাসমূহ যাঁরা জিইয়ে রেখেছেন, তাঁদের কথা। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ঢোল-মৃদঙ্গ ও দক্ষতার হাতিয়ার সাজিয়ে নিজ নিজ পরিসরের জাতপাত ও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধও করে চলেছেন।
চর্মশিল্পী, কাঠপুতুল নির্মাতা, দারুশিল্পী বা শাঁখারি, এই সব পেশা ভিত্তিক মানবজীবন ঘিরে একটি গল্প, ছবি ও ভিডিও সহযোগে মহাকায় সংগ্রহশালা বানিয়েছে পারি।
জাঁতাপেষাইয়ের গান ও কচ্ছগীতি
এসকল ক্ষেত্রে আমাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি, ব্যাপ্তি ও জটিলতার আন্দাজ পেতে হলে এই দুটি চলতি প্রকল্পের দিকে নজর ফেরান, আর পাঁচটা সংবাদ ওয়েবসাইটে এমনটি পাবেন কিনা সন্দেহ। এদেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও সংস্কৃতি থেকে নিম্নোক্ত দুটির মতো আরও অসংখ্য প্রকল্প শুরু করতে চাই আমরা:
কোনও একটি ভাষায় গ্রামীণ মহিলাদের গাওয়া গানের সবচাইতে বৃহৎ সংগ্রহ পারির জাঁতাপেষাইয়ের গানের প্রকল্প। অনন্য এই আকরে রয়েছে গ্রামীণ মহারাষ্ট্রের মহিলাদের গাওয়া ১,০০,০০০টি ওভি বা দোহা। এর সঙ্গে আছে রেকর্ডিং, ভিডিও, প্রতিলিপি, তর্জমা ও কাহিনি। এই শিল্পধারার বৈচিত্র্য ও গভীরতা দুইয়ের স্বাক্ষ্য বহন করছে এই সংগ্রহ। এখানে দৈনন্দিন জীবনের রোজনামচা, পিতৃতন্ত্র, জাতপাত, সন্ত-কবি, ঐতিহাসিক ঘটনা, বাবাসাহেব আম্বেদকর ও আরও নানান বিষয়ে গান গেয়েছেন মহিলারা।
রণ-এর সুর: কচ্ছি লোকগীতির আর্কাইভ পারির একটি মাল্টিমিডিয়া সংকলন, এটি কচ্ছগীতির একটি সম্বৃদ্ধ চলমান আকর। ৩৪১টি গানে উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, বিবাহ, ইবাদত, মাতৃভূমি, লিঙ্গ-সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো নানান বিষয়। দৃশ্যকল্প, ভাষা ও সংগীতের বুননে উঠে এসেছে এই অঞ্চলের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির চিত্র। কচ্ছের শ্রতিধারা আজ মৃতপ্রায়, একদা প্রাণবন্ত সেই শিল্পরূপ পুনরুজ্জীবিত করতে আটপৌরে মঞ্চ গড়ে জোটবদ্ধ হয়েছেন গুজরাতের ৩০৫ জন বায়েন, গায়ক ও যন্ত্রী। ধীরে ধীরে মরুপ্রান্তরের এই ফিকে হয়ে আসা সুরলহরী আজ সংরক্ষণ না করলেই নয়।
আদিবাসী শিশুদের আঁকা ছবির আর্কাইভ
পারির এই অনন্য সংগ্রহ যেখানে আদিবাসী শিশুদের আঁকা ছবির মধ্যে দিয়ে জগৎসংসার দেখার সুযোগ মিলবে। আদিবাসী স্কুলপড়ুয়াদের শিল্পকর্মের এটিই সর্বপ্রথম আর্কাইভ। এখানে সংকলিত চিত্রগুলি এঁকেছে ওড়িশার জাজপুর ও কেন্দুঝাড় জেলার তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। আদিবাসী সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন, কৌম সমাজ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক পারির আটটি প্রতিবেদন জোরে জোরে পড়ে শুনিয়েছিলেন শিক্ষকরা, তার থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই ছবিগুলি এঁকেছে কচিকাঁচার দল।
ওড়িশা থেকে প্রাপ্ত এই সংগ্রহে রয়েছে ৫৭টি বিদ্যালয়ের ৯৮জন আদিবাসী শিশুর আঁকা ১১১টি ছবি। ৯-১৫ বছরের এই শিশুরা তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণির পড়ুয়া। পুঁচকে শিল্পীদের দলে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি — ৩০টি ছেলে, আর ৬৮টি মেয়ে। প্রতিটি ছবির সঙ্গে ২০-৩০ সেকেন্ডের একটি করে ভিডিও রয়েছে যেখানে নিজের তথা নিজের কাজের বিষয়ে বলছে খুদে শিল্পীরা। অধিকাংশ বার্তাই ওড়িয়া ভাষায়, তবে জনাকয় শিশু হো, মুণ্ডা ও বীরহোড়ের মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাতেও কথা বলেছে।
১২টি জনজাতি থেকে আগত পড়ুয়ারা অংশগ্রহণ করেছে এই প্রকল্পে: বাথুডি, ভুইঞা, ভূমিজ, গাণ্ডিয়া, গোণ্ড, হো, কোল্হা, মাঙ্কিরডিয়া (বিকল্প বানান মাঙ্কিডিয়া — বীরহোড় জনজাতির একটি শাখাবিশেষ), মুণ্ডা, সামটি, সাঁওতাল ও সৌন্তি। এই সম্প্রদায়গুলির মধ্যে অনেকেই বিশেষভাবে অসুরক্ষিত জনজাতি গোষ্ঠী হিসেবে নিবন্ধিত।
হ্যাঁ, এটাই সর্বপ্রথম, তবে সর্বশেষ নয়। দ্য পিপলস্ আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার লক্ষ্য — ভারতের প্রতিটি প্রান্তের আদিবাসী শিশুদের নিয়ে এমন সংগ্রহ গড়ে তোলা।
নারী-স্বাস্থ্য বিষয়ে পারির প্রতিবেদন সংকলন
ভারতীয় নারী, বিশেষত গ্রামীণ মহিলার প্রজনন স্বাস্থ্য ঘিরে লেখা এই সিরিজটি সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সংযোজন। প্রতিবেদনের পূরোভাগে থাকা গ্রামাঞ্চলের পূর্ণবয়স্ক নারী ও কিশোরীদের যাপিত অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠস্বরই এই সংকলনের ভিত্তি।
দেশের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসা এই ৫০টি কাহিনি আদতে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক পারির এক সিরিজের অন্তর্গত। সন্তানহীনতা ঘিরে সামাজিক কলঙ্ক, গর্ভনিয়ন্ত্রণের যাবতীয় দায় মহিলাদের উপর আরোপ, পরিবার পরিকল্পনায় ‘অংশগ্রহণে পুরুষের অনীহা’, গ্রামীণ স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার বেহাল দশা এবং যেটুকু আছে তা-ও নাগালের বাইরেই থেকে যাওয়া, অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক সংক্রান্ত সমস্যা। এছাড়াও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব, মাসিক ঋতুস্রাব ঘিরে মেয়েদের সঙ্গে বৈষম্য, পুত্রসন্তানের অশেষ আকাঙ্ক্ষা এবং এমন আরও অনেক কিছুই। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কুসংস্কার এবং অভ্যাস, মানুষ এবং সমাজ, লিঙ্গ এবং অধিকার, গ্রামীণ ভারতে মহিলাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং মাঝে মাঝে জোনাকির মতো জ্বলে ওঠা ছোটো ছোটো জয়গাথা সংকলিত হয়েছে এই সিরিজে।
দৃশ্যমান কাজ, অদৃশ্য নারী
সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাইজড্, কিউরেটেড ও স্থিরচিত্র প্রদর্শনী হিসেবে দৃশ্যমান কাজ, অদৃশ্য নারী প্রথম ও অদ্বিতীয়, কারণ এর আগে বাস্তব জগতের কোনও প্রদর্শনী (বড়ো আকারের আলোকচিত্রের সঙ্গে বেশ খানিকটা করে লেখা) কেউ অনলাইনে পরিবেশন করেনি। প্রতিটি প্যানেলে একটি করে ভিডিও রয়েছে, গড় দৈর্ঘ্য ২-৩ মিনিট। প্রদর্শনীর অন্তিম প্যানেলের ভিডিওটি অবশ্য ৭ মিনিট লম্বা।
প্রত্যেকটা ছবিই পারির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক পি. সাইনাথের তোলা। এগুলির জন্য তিনি ১৯৯৩ থেকে ২০০২ সালের মাঝে ভারতের দশটি রাজ্য জুড়ে প্রায় ১,০০,০০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিলেন। এদেশের অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রথম দশক ধরে চলতে থাকা এই প্রয়াসটি শেষ হয়েছিল জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান সুনিশ্চিতকরণ যোজনা বলবৎ হওয়ার দুই বছর আগে।
বাসস্টপ, রেলস্টেশন, কারখানার ফটক, কৃষি তথা অন্যান্য মজুরদের মিছিল, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় — এমন বহু জায়গা মিলিয়ে পরিবেশিত হয়েছিল প্রদর্শনীর আদি ও কায়িক সংস্করণটি। আজ তার পুরোটাই আমাদের ওয়েবসাইটে দেখতে পাবেন।
গ্যালারি: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী
আর বছরকয়েক বাদেই, ভারতের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণপাত করেছিলেন, তেমন আর কেউই বেঁচে থাকবেন না। যাঁদের সংগ্রামের জোরে বাস্তবায়িত হয়েছে এই দেশের স্বাধীনতা, আগামী প্রজন্মের ভারতীয়রা আর কোনওদিন তাঁদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হতে পারবে না, তাঁদের বক্তব্য শোনা বা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার অবকাশই পাবে না আর। আগামীর সেইসব প্রজন্ম তো বটেই, বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গেও সেই সুমহান প্রজন্মের সেতুবন্ধন করতে চলেছে পারির স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গ্যালারিটি।
এখানে, আপনি শুধুই যে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার ছবি দেখতে পাবেন তা নয়, তাঁদের দেখা যাচ্ছে এবং বক্তব্য শোনা যাচ্ছে তেমন কিছু ভিডিও-ও রয়েছে যা আর অন্য কোথাও নেই। এছাড়া তাঁদের পরিবার, বংশধর, ভিটে ও দেশগাঁয়ের আলোকচিত্রও রয়েছে।
১৫ অগস্ট ২০২২, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে উদ্বোধন হয় এই বৈদ্যুতিন গ্যালারিটির। এখানে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বল্প পরিচিত বেশ কিছু পদাতিক সেনার ছবি ও ভিডিও। এঁদের কয়েকজনের কাহিনি পারির ওয়েবসাইটের অন্যত্র থাকলেও যেহেতু সকল মুক্তিযোদ্ধার কাহিনি নেই, তাই দিনকে দিন এই সংগ্রহটিকে বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এছাড়াও এই গ্যালারিতে আমরা আরও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি-ভিডিও যোগ করব।
শ্রেণিকক্ষে পারি
গ্রামীণ ভারত নামক প্রসঙ্গের অনুপস্থিতি দেশের শহরাঞ্চলের স্কুলগুলির শ্রেণিকক্ষ ও পাঠ্যক্রমের বাস্তব। আর প্রসঙ্গ যদি বা থাকে তো সেই বহু ব্যবহারে জীর্ণ যত স্টিরিওটাইপে মোড়া। স্বদেশের মাটিতে বিদেশি হয়ে বড়ো হচ্ছে গোটা একটা প্রজন্ম। পারির শিক্ষা বিভাগ সেটাকেই বদলাতে চায়। ভারতের অন্তরে লুকিয়ে আছে যে হাজার ভারতবর্ষ — শ্রেণিকক্ষ, কর্মশালা ও ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে তাকেই আবিষ্কার করতে সাহায্য করি আমরা। এছাড়া সরেজমিন থেকে পাঠানো পড়ুয়া সাংবাদিকদের লেখা অসংখ্য গল্পও প্রকাশ করে পারি।
পারির ঝুলিতে এমন অনেক খবর পাবেন যা শহুরে বা গ্রামীণ এলাকার স্কুল, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের কলমনিঃসৃত। আবার এমন তরুণ সাংবাদিকও রয়েছেন যাঁদের স্কুল-কলেজের পাঠ শেষ হয়েছে, কিন্তু নিজ নিজে অঞ্চল, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ধরে রাখতে তাঁরা উৎসুক। পারির শিক্ষা প্রকল্প ‘পারি এডুকেশন’-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে প্রায় ১৫০টি বিদ্যালয়, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি — সংখ্যাটা ক্রমবর্ধমান। প্রয়োজন মাফিক রসদ আর কর্মী পেলে সংখ্যাটা তরতরিয়ে বাড়বে।
আপনার অংশগ্রহণ ও সহায়তা ছাড়া পারি অচল
যদিও আমরা আমাদের আর্কাইভে অবদানকারীদের একটি গোষ্ঠী গঠন করে তাতে ক্রমাগত নতুন সদস্য সংযোজন করে চলেছি, কিন্তু সম্পাদকীয় নীতি এবং মান নিয়ন্ত্রণ দুটোকেই অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় পারিতে। নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞ অবদানকারীদের এই কাজে খুব প্রয়োজন। এঁদের অধিকাংশই সাংবাদিক এবং লেখক। কিন্তু সকলেই নন। যে কোনও ব্যক্তি যিনি পারির কাজ পছন্দ করেন, তিনি নিজেই এই কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন; আমাদের জন্য লিখতে পারেন, মোটামুটি ভদ্রস্থ মানের ভিডিও তৈরি করা যায় এমন মোবাইল ফোনের সাহায্য নিয়েও চিত্র নির্মাণ করতে পারেন – শুধুমাত্র আমাদের ওয়েবসাইটের নৈতিক আদর্শ এবং নিয়মাবলী মেনে চললেই হল। পারির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আপনাকে যে একজন পেশাদার সাংবাদিক হতে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি।
স্মরণে রাখা দরকার, পারির আর্কাইভে থাকা সম্পদের একটা বড়ো অংশ এসেছে গ্রামীণ ভারতীয়দের কাছ থেকেই, সংবাদমাধ্যমের পেশাদার কর্মীদের কাছ থেকে নয়, এই কর্মীরা সেই গল্প রেকর্ড করতে সহায়তা করেছেন। এইসব গ্রামীণ মানুষদের কেউ কেউ তাঁদের নিজেদের গল্পের জন্য প্রয়োজনীয় স্যুটিং নিজেই করেছেন। এইসব গল্পগুলি বারবার বলা হবে নতুন করে - যতদিন গ্রামীণ ভারতের অস্তিত্ব আছে ততদিন।
পারির আর্কাইভ বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। সাইটটি কাউন্টার মিডিয়া ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত। একটি অপেশাদার নেটওয়ার্ক স্বেচ্ছাশ্রম, তহবিল গঠন, প্রত্যক্ষভাবে ব্যক্তিগত আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে ট্রাস্টের কাজকে আর্থিক সহায়তা এবং সমর্থন প্রদান করে। প্রতিবেদক, পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র সম্পাদক, আলোকচিত্রী, তথ্যচিত্র নির্মাতা, অনুবাদক এবং সাংবাদিক (টেলিভিশন, বৈদ্যুতিন এবং মুদ্রণ জগতের) প্রমুখ স্বেচ্ছাকর্মীদের নেটওয়ার্কটিই পারির সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। এরই পাশাপাশি আছে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য পেশা থেকে আসা বহু মানুষের অবদান এবং দক্ষতা যার সাহায্যে পারির মতো সাইট গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।
পারির জন্য স্বেচ্ছাকর্মীরা যে কাজ করছেন, তার বাইরেও এই কর্মকাণ্ডকে প্রসারিত করার জন্য আমাদের অর্থের প্রয়োজন। তাছাড়া এই সুবিশাল প্রয়সকে বাঁচিয়ে রাখা ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করে তোলার জন্যও সম্পদ প্রয়োজন। প্রত্যক্ষ সরকারি অনুদান বা কর্পোরেট তহবিল পারি চায়-ও না, গ্রহণ করা তো দূরের কথা। আমরা বিজ্ঞাপন নিই না, কারণ আমাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞাপনের বন্যায় ইতিমধ্যেই নবীন প্রজন্ম জর্জরিত। কাজেই বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, আপনার সাহায্য আমাদের কতখানি সহায়।
তহবিল গড়ে তোলার আবেদনটি ‘নিজের দেশের চিত্র তুলে ধরুন’ শিরোনামে রেখেছি বটে, কিন্তু আমরা জানি গ্রামীণ ভারতের চিত্র কখনই সম্পূর্ণ তুলে ধরা সম্ভব নয়, আমাদের ওয়েবসাইটের আধেয় বিষয়বস্তুও তাই গ্রামীণ ভারতের খণ্ড খণ্ড বাস্তবকেই তুলে আনে। যত বেশি মানুষ পারির সঙ্গে যুক্ত হবেন, এই আর্কাইভে তত বেশি করে গ্রামীণ ভারতের বাস্তব উঠে আসবে। আমাদের একান্ত আবেদন, মুক্তহস্তে অনুদান দিন পারিকে।


