“বিড়ি বাঁধলে রোগ-ব্যাধি হওয়াটা তো মজুরের নিয়তি,” বলছিলেন মোটামুটি ৪৫ ছুঁইছুঁই শাহীনূর। মাস কয়েক আগে, টানা বসে বিড়ি বাঁধার কাজ করার জেরে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তাঁর। বেলডাঙ্গা গ্রামীণ হাসপাতালে গিয়ে তিনি ডাক্তার দেখিয়ে আসেন। একটি বেসরকারি পরীক্ষাগার থেকে বুকের এক্সরেটিও করান ডাক্তারের উপদেশ মেনে। ইতিমধ্যেই তাঁর স্বামী খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে, শাহীনূরের নিজের রোগভোগের চিকিৎসার ব্যাপারটা আর এগোয়নি। “আমার দুই বৌমা এখন আর আমাকে [বিড়ি] বাঁধতে দেয় না। পুরোপুরি ওরাই এখন বিড়ি বাঁধে। কিন্তু ওই [আয়] দিয়ে তো আর সংসার চলে না,” এইজন্যেই যে তিনি ঘুগনি বিক্রির কাজটা শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন, সেটা তাঁর কথা থেকে বোঝা গেল।
বেলডাঙ্গা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্র, বা বিপিএিচসি হাসপাতালে কর্মরত ডঃ সোলমান মণ্ডল জানালেন প্রতিমাসেই নিয়মিত ২০-২৫ জন যক্ষ্মা রোগী তাঁদের প্রতিষ্ঠানে আসেন। “বিড়ি বাঁধার কাজ করেন যাঁরা, তাঁদের টিবির মতো রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকেই, সর্বদাই তাঁরা তামাকের ক্ষতিকর মশলার সংস্পর্শে থাকতে বাধ্য হন। এর প্রভাবে বার বার সর্দিকাশি এবং নানান সংক্রমণের জেরে তাঁদের ফুসফুস লাগাতার দুর্বল হতে থাকে,” পারির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেলডাঙ্গা-১ ব্লকের স্বাস্থ্যবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক মেডিক্যাল অফিসার (বিএমও) ডঃ মণ্ডল বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করলেন।
বিপিএিচসি হাসপাতাল থেকে এগোলে খানিক দূরত্বে, বেলডাঙ্গার দর্জিপাড়া মহল্লায় সায়রা বেওয়া লাগাতার সর্দিকাশি সহ নানান উপসর্গে জেরবার হয়ে আছেন। এসব সমস্যা বাদেও এই ৬০ বছর বয়সি প্রৌঢ়া মধুমেহ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগে ভুগছেন গত ১৫ বছর ধরে। প্রায় পাঁচ দশক হল তিনি বিড়ি বাঁধছেন, স্বভাবতই হাতের আঙুল এবং নখে তামাকের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গুঁড়ো রয়ে যায়, দৃষ্টিগোচর না হলেও মশলার কণা থাকেই।
“এই মিহি গুঁড়ো মশলা খুবই পরিচিত একটা অ্যালার্জেন। বিড়ির মশলার সূক্ষ্ম কণিকা এবং তীব্র ঝাঁঝ বিড়ি বাঁধার সময়ে কারিগরদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে,” জানালেন ডঃ সোলমান মণ্ডল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা ৫ (NFHS-5) থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগের প্রকোপ দ্বিগুণ – প্রতি ১,০০,০০০ জন পিছু ৪,৩৮৬ জন মহিলা এই রোগে আক্রান্ত।
ব্লক মেডিক্যাল অফিসার ডঃ মণ্ডল এই কথাটাও স্পষ্ট করে জানালেন যে, “বিড়িতে ব্যবহৃত তামাকের গুঁড়ো মশলার অবিরাম সংস্পর্শে যক্ষ্মা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে এখনও অবধি আমাদের এখানে টিবি রোগের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক পরীক্ষা কিংবা স্ক্রিনিংয়ের কোনও বন্দোবস্ত নেই।” মুর্শিদাবাদ জেলা, যা কিনা বিপুল সংখ্যায় বিড়িশ্রমিক অধ্যুষিত তথা বিড়ি শিল্পের কেন্দ্র বা হাব বলে পরিচিত, সেখানে বিড়ি শ্রমিকদের জন্য যক্ষ্মার মতো মারণ রোগের নির্ণয় তথা প্রতিরোধের লক্ষ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্যশিবিরের বন্দোবস্ত না থাকাটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটা বড়ো খামতির দিকে ইঙ্গিত করে। দর্জিপাড়ার সায়রা বেওয়ার মতো বরিষ্ঠ বিড়ি শ্রমিক আজ এতদিন ধরে নানান সংক্রমণে ভুগছেন, তিনি একথাও জানালেন যে প্রায়শই কাশির সঙ্গে রক্ত উঠছে – এই উপসর্গ টিবির মতো রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক। “বেলডাঙ্গা গ্রামীণ হাসপাতালে দেখিয়েছি তো। ওরা দেখলো পরীক্ষা করে, তারপর কিছু ট্যাবলেটও দিয়েছে,” জানালেন প্রৌঢ়া এই মানুষটি। জানা গেল, হাসপাতাল থেকে তাঁর কফ পরীক্ষা করতে বলে দিয়েছে, এবং তিনি যাতে আর বিড়ির মশলা না ঘাঁটাঘাঁটি করেন, সেকথাও হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে। অবশ্য তাঁকে কোনও সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি।
সত্যি কথা বলতে, জেলার কোথাওই বিড়ি শ্রমিকদের কাজের সময়ে মাস্ক বা গ্লাভসের মতো সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারির প্রতিবেদক দেখেননি। এই শ্রমিকদের কাজ সংক্রান্ত কোনও নথিপত্র, সামাজিক সুরক্ষা বাবদ প্রাপ্য, নির্ধারিত ন্যায্য মজুরি, শ্রমিক কল্যাণের বন্দোবস্ত, নিরাপত্তা তথা স্বাস্থ্যপরিষেবার কোনও বিধান নেই। বিড়ি কোম্পানিগুলি সরাসরি এই শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ না করে, মহাজনদের মাঝখানে রেখে কর্মীদের প্রতি যাবতীয় দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়। আর ওদিকে, শ্রমিকদের থেকে তৈরি বিড়ি নিয়ে এবং কাঁচামালের জোগান দিয়ে নামমাত্র মজুরি ধরিয়েই মহাজনরা খালাস পেয়ে যান। এই শ্রমিকদের ব্যাপারে তাঁদের কোনও দায়বদ্ধতা নেই।