এই নির্মম পুলিশি অত্যাচার দেখে শিউরে উঠেছেন হাবিব-উন-নিসা, কিন্তু প্রতিবাদী ছাত্রদের অদম্য সাহস অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে তাঁকেও। “আমি তো একজন সাধারণ মা, সন্তানদের নিয়েই আমার জগৎ,” বলছিলেন তিনি, “আমি তো আর পাঁচটা গৃহিণীর মতোই জীবন কাটাচ্ছিলাম! গদিতে বসে থাকা লোকেরা আমার সেই সাধারণ জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। ওদের সিদ্ধান্তের ফলেই আমার মেয়েটা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। আচ্ছা, আপনাদের কাজ তো আমাদের রক্ষা করা, জীবন নষ্ট করে দেওয়া তো নয়।”
২০২৬ এর ৩ মে দুর্দান্ত পরীক্ষা দিয়ে ফেরেন সানা। আর ঠিক তার পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয় যে নীট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে, সুতরাং আবার পরীক্ষা দিতে হবে। এতদিকার প্রস্তুতির প্রবল ধকলে ইতিমধ্যেই পরিশ্রান্ত সানা একেবারেই ভেঙে পড়েন এই ঘোষণার পর। নীট অসম্ভব প্রতিযোগিতামূলক একটি পরীক্ষা, মেডিকেল কলেজগুলোর মাত্র ১ লক্ষ ৩০ হাজার আসনের জন্য কুড়ি লক্ষেরও বেশি ছাত্র প্রতি বছর এই পরীক্ষা দেন। এতগুলো বছর মাথা গুঁজে প্রস্তুতির পর অবশেষে সানা ভেবেছিলেন এবার বুঝি যাবতীয় চাপ সাঙ্গ হয়েছে। কিন্তু না। বাস্তবে দেখা গেল, আবার তাঁকে আগাগোড়া ওই একই জাঁতাকলে পিষে মরতে হবে।
প্রবল চাপ মাথায় নিয়ে আবার পরীক্ষার উত্তর লিখতে বসার চেয়ে আত্মহত্যার চিঠি লেখাটা বুঝি সহজ ঠেকেছিল তাঁর কাছে। একটা কাগজে “আমি ক্ষমাপ্রার্থী,” লিখে ২১জুন নিজের ঘরেই গলায় দড়ি দেন তিনি, ফিরতি পরীক্ষাটা হওয়ার ঠিক এক দিন আগে।
সাম্প্রতিক কালে সানা সহ ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী এই একই কারণে আত্মহত্যা করেছেন।
“সকালে ফোন করলাম, ধরল না,” বলতে বলতে গলাটা কেঁপে যায় জাফরের। “যদি কথা বলার একটু সুযোগ পেতাম, এভাবে হয়তো চলে যেত না,” প্রতিবাদ স্থলে দাঁড়িয়ে জলভরা চোখে বলেন শোকার্ত পিতা।
“আমার মধ্যে যে কী চলছে, সেইটা একটু ভাগ করে নেব বলেই এসেছি,” দৃশ্যতই ধ্বস্ত লাগে মা হাবিব-উন-নিসাকে। বড়ো মেয়ে বেঁচে নেই, এ কথা মেনে নিতে এখনও মন সায় দেয় না তাঁর। “হয়তো আর বছর পাঁচেকের মধ্যেই মরে যাব আমরা। আর বুড়ো বয়স অবধি বেঁচে থাকলে তো এই যন্ত্রণাটা পাথরের মতো বয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন,” ক্লান্ত গলায় বলে চলেন তিনি। “রাতে আর ঘুমোতে পারি না। মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ হাত পা কাঁপতে থাকে আমার।”
তা সত্ত্বেও, ১৫ আর ১১ বছরের দুই মেয়েকে বাড়িতে রেখে দিল্লি এসেছেন তাঁরা। “ওদের কথা যত ভাবি, তত চিন্তা হয়। গদিতে বসা লোকগুলোকে বলতে এসেছি যে, আপনারা ভুল। একদম ভুল। ক্ষমতার চোটে কি চোখেও কিছু দেখতে পাচ্ছেন না? আমার মতো মায়েদের জন্যই তো আন্দোলন করছে এই বাচ্চাগুলো। কত বোঝে ওরা। আমার কষ্টটা যারা ভাগ করে নিচ্ছে, সেদিন তাদেরকেই পুলিশ ওরকম নির্দয় ভাবে মারল। বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল আমার। আপনারা যদি আমাদের যন্ত্রণা বুঝতেই না পারেন, তাহলে আর ক্ষমতায় থাকার মানে কি? ওদের আর মারবেন না। বাচ্চোঁ পে ইতনা জুল্ম মত করিয়ে [বাচ্চাগুলোর ওপর এত অত্যাচার করবেন না]।”