পাথরের তিনটে টুকরো আর কাঠের পাটাতন সাজিয়ে তৈরি একচিলতে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি – ঋজু। অসমান, এবড়োখেবড়ো পাথরগুলো। তবে কাঠের পাটাতনটা থাকায় যে সমতল জায়গাটুকু পাওয়া গিয়েছিল, তার উপরেই দাঁড়িয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের ইয়াবতমাল জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের ওই মহিলা। ট্যাঙ্কের পাইপ থেকে চুঁইয়ে পড়া জল যতটা সম্ভব জল কলসিতে ভরার মরিয়া চেষ্টা করছিলেন। অসীম ধৈর্য আর অবাক করার মতো দক্ষতায় তিনি একখানা কলসি নিজের মাথার উপর ধরেছিলেন। প্রথম কলসিটা জলে ভরে এলে সেই জল চটপট মাটিতে বসানো আরেকটা খানিক বড়ো কলসিতে ঢাললেন। দেখতে দেখতে দু’খানা পাত্রেই জল ভরা হয়ে গেলে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন তিনি, তারপর বয়ে আনা জলটুকু ঘরে রেখেই ফের বেরিয়ে পড়লেন আরও খানিক জল তুলতে। এভাবে প্রত্যেকবারে প্রায় আধ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ১৫-২০ লিটার জল দু’খানা ধাতব কলসিতে ভরে আনছিলেন তিনি।
একই রাজ্যের অমরাবতী জেলায় সারদা বদ্রে ও তাঁর মেয়েরাও বছরের পর বছর নিজেদের বাড়ির কাছের কমলালেবু গাছগুলোতে জল দেওয়ার জন্য এ হেন লড়াই করে আসছেন। তাঁদের বাড়ি থেকে জলের উৎস মাত্র ৩০০ মিটার দূরে, গ্রামাঞ্চলের মাপকাঠি অনুযায়ী যেটা প্রায় পাশের বাড়িতেই বলা চলে। কিন্তু তাঁদের কথায়, "অতগুলো গাছের জন্য ২১৪ খানা পেল্লায় সাইজের কলসিভর্তি জল দরকার।" অর্থাৎ আসা-যাওয়া মিলিয়ে তাঁদের ওই পথটুকু মোট ৪২৮ বার পাড়ি দিতে হবে, যার অর্ধেক সময়েই তাঁদের মাথায় থাকবে জলভরা ওজনদার কলসি। হিসেব করলে দেখা যাবে তিনজন মহিলার প্রত্যেককে সব মিলিয়ে ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। অগত্যা, "সোমবার অর্ধেক গাছে জল দেওয়া হয়, আর বাকি অর্ধেকে বৃহস্পতিবার।" তবে তাঁরা যে কেবল এই কাজটুকু করেই খালাস, এমনটা কিন্তু নয়! এর পাশাপাশি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে চাষজমিতে কাজ করা তো রয়েছেই। এপ্রিল-মে মাসের কাঠফাটা গরমে, যে সময় তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪৫° সেলসিয়াস (১১৩° ফারেনহাইট) ছুঁয়ে ফেলে, তখনও তাঁরা এভাবেই কাজ করে চলেন নিরন্তর।
এসবই অবশ্য বেশ কিছু কাল আগের কথা। আজকাল গ্রামগুলোতে জলসঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জলের পুরনো উৎগুলো ক্রমশ শুকিয়ে আসতে শুরু করেছে, শিল্পক্ষেত্রে এবং শহরাঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে আগের চাইতে আরও বেশি জল। এমনটা চলতে থাকলে ভারতের গ্রামাঞ্চল জুড়ে আরও লক্ষ লক্ষ নারীর মতো রোজ আরও অনেক, অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে সারদা ও তাঁর মেয়েদের। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের হতদরিদ্র গ্রামীণ মহিলারা যুগ যুগ ধরে এটাই তো করে চলেছেন।







