আগে থাকতে মালুম হয়নি, এ যে সত্যিই ভোজবাজির খেল! দোকানের পিছনে রাখা একটি পুরাতন নীল বাক্স খুলে সাতরাজার ধন বার করছিলেন ডি. ফাতিমা। শিল্পের নমুনা বই তো নয়: বড়ো বড়ো, তাগড়া মাছ, ডেরা যাদের থুথুকুড়ি ছাড়িয়ে গভীর সমুদ্রে, আজ তারা সূর্য, লবণ ও দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় শুকিয়ে শুঁটকি বনে গেছে।
একখান কাট্টা পারই মীন বা রূপসা মাছ তুলে মুখের সামনে ধরলেন ফাতিমা। লম্বায় তাঁর আধা, গলাখানা তাঁর হাতের মতন চওড়া। মুড়ো থেকে ল্যাজা অবধি শুকিয়ে যাওয়া গভীর ক্ষত। ধারালো ছুরি দিয়ে মাছটার নধরকান্তি মাংস কেটে নাড়িভুঁড়ি বার করেছিলেন, এ তারই চিহ্ন। তারপর রূপসাটির পেটে নুন ভরে গনগনে রোদ্দুরে ফেলে রেখেছিলেন। এই মুলুকে সূর্যের তেজ এতটাই যে মাছ, মাটি, মানুষ — সব্বাই শুকিয়ে খটখটে হয়ে যায়...
ফাতিমার চোখমুখ আর দুহাতের বলিরেখা সেই ঝলসানো দিনযাপনের দাস্তান শোনায়। তবে সেসব সরিয়ে রেখে আপাতত অন্য একখানা গল্প জুড়লেন মানুষটি। সে এক ফেলে আসা সময়ের কথা, তাঁর আচি (ঠাকুমা/দিদা) যখন শুঁটকি বানিয়ে বেচতেন। সে এক অন্য শহর, এক অন্য সড়ক, আর সড়ক পেরিয়ে মোটে হাতখানেক চওড়া একটি খালের কাহিনি। এই খালপাড়েই ছিল তাঁদের পুরোনো বসতবাটি। এই গাথা ২০০৪ সালের সেই সুনামির। রাক্ষুসে ঢেউটা একরাশ জঞ্জাল বয়ে এনেছিল বটে তাঁদের জীবনে, তবে তার সঙ্গে নতুন বাস্তুভিটার প্রতিশ্রুতিও ছিল। অবশ্য একখান সমস্যাও ছিল। ঘাড় এলিয়ে, দিগন্তপানে হাত দেখিয়ে ফাতিমা জানালেন, নয়া ভিটেখানি “রম্ভা ধূরম [অনেক দূর],” ছিল। বাসে আধাঘণ্টা লাগত। আর যাতায়াত না করেও উপায় নেই, মাছ কিনতে সাগরতীরে তো আসতেই হবে।
ন’বছর পর, বোনদের সঙ্গে পুরোনো পাড়ায় ফিরে এসেছিলেন ফাতিমা — তেরেসপুরম, থুথুকুড়ির শহরের একপ্রান্তে। সারি সারি ঘরবাড়ি আর দোকানের পাশে আগের সেই খালটি আছে বটে, তবে সেটা যেমন চওড়া হয়েছে, পানির বেগও হয়েছে মন্থর। মন্থর আজকের বিকেলটাও — খানিক লবণ আর অনন্ত সূর্য মিশিয়ে নারীর জিন্দেগি বাঁচিয়ে রাখে যে শুঁটকি, ঠিক তারই মতো অনড়, অটল।
বিয়েথা করা পর্যন্ত দাদির মাছ ব্যবসার যুক্ত ছিলেন ৬৪ বছরের প্রৌঢ়া ফাতিমা। দুই দশক আগে শোহরের ইন্তেকাল হলে আবারও ফিরে আসেন এই ধান্দায়। আট বছর বয়সের কথা মনে পড়ে ফাতিমার, সেই যখন টাটকা তাজা জ্যান্ত মাছভর্তি জাল টেনে আনা হত দরিয়াপাড়ে। অথচ ৫৬ বছর বাদে, আজ সবই ‘বরফের মীন।’ বরফ-বোঝাই নৌকায় চেপে ফিরে আসে মৃত মাছের ঝাঁক। ইয়াব্বড়-বড় মাছ সব, লাখ লাখ টাকার বিকিকিনি চলে। “তখনকার দিনে আনা, পয়সা, এসবের কারবার ছিল, একশো টাকার মূল্য ছিল বিশাল, আর আজ তো হাজার বা লাখের নিচে কথাই নেই কোনও।”



























