সড়কপথে রায়পুর থেকে সোনাখানের নিকটতম কেন্দ্র পিথোড়া পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে লাগে ঘন্টা দু’য়েক। কিন্তু গ্রাম পর্যন্ত অবশিষ্ট ৩০ কিলোমিটার যেতে সময় লাগে দুই ঘন্টারও বেশি। জয়সিং পাইক্রা বলেন, “গ্রামের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ৩৫ কিলোমিটার পথ আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে হয়।”
অর্জুন সিংয়ের হাসপাতালের কী হল? “হাসপাতাল উদ্বোধন হওয়ার পর বিগত ১৩ বছরে ওখানে ডাক্তার আসেননি,” পাইক্রা আমাদের জানান। একজন কম্পাউন্ডার আছেন বটে, প্রেসক্রিপশন লিখে দিতে তাঁর আপত্তি নেই, যদিও ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।
তাহলে এত “তাবড়তাবড়” লোকেদের এখানে আসার উদ্দেশ্যটা কী? তাঁরা এখানে এসে আসলে কোন কাজটা করেন?
পাইক্রার ভাষায়, “প্রত্যেকবার সেই এক গল্প। নারায়ণ সিংকে নিয়ে বক্তৃতা দেন, তারপর একমাত্র একটা পরিবার, যারা নাকি নারায়ণ সিংয়ের বংশধর, তাদের উপহার অর্থ সাহায্য ইত্যাদি দিয়ে ফিরে যান।” আমরা অবশ্য বংশধরদের সন্ধান পেলাম না।
চরণ সিং বলেন, “তারা এখানে থাকেই না। কে জানে তারা আদৌ নারায়ণ সিংয়ের বংশধর কিনা! তারা অবশ্য দাবী করে যে তারাই প্রকৃত বংশধর। অথচ তারা কখনও গ্রামদেবতার স্থানে পূজো দেয় না।”
“অথচ সকল সুবিধে তারাই পায়,” পাইক্রা বলেন।
সরকারী নথিপত্রগুলির মধ্যে মধ্যপ্রদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তালিকাটি বেশ চমকপ্রদ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অসংখ্য আদিবাসী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তালিকায় আদিবাসীদের নাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ছত্তিশগড় বা বস্তার সর্বত্র একই চিত্র। অথচ মিরধা, শুক্ল, আগরওয়াল, গুপ্তা, দুবের ছড়াছড়ি। এইইতিহাস বিজয়ীর লেখা।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি, মধপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী, শুক্ল ভ্রাতৃদ্বয়ের ক্ষমতা খর্ব করতে উঠেপড়ে লাগেন।এঁদের একজন শ্যামাচরণ শুক্ল তিনবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকেছেন। অপর জন, বিদ্যা চরণ শুক্ল একাধিকবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। ছত্তিশগড় ছিল তাঁদের গড়, আজও কিছুটা হলেও তাঁদের প্রতিপত্তি এখানে বিদ্যমান। প্রদেশ কংগ্রেসে চূড়ান্ত ক্ষমতা দখল করার তাগিদে অর্জুন সিং এঁদের পেছনে লাগেন। এইসময় সহযোগী হিসেবে বীর নারায়ণ সিং অপরিহার্য হয়ে পড়েন।
ইতিহাস বইয়ে ঠাঁই না পেলেও বীর নারায়ণ সিং এই অঞ্চলের মানুষের সত্যিকারের নায়ক ছিলেন। এইবার রাজ্য সরকার তাঁকে আত্মসাৎ করতে অগ্রণী হলেন।
নারায়ণ সিংকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার কারণ শুক্ল ভ্রাতৃদ্বয়ের ডানা ছাঁটা ছাড়া আর কিছু নয়। ছত্তিশগড়ের প্রকৃত নায়ক কে? এই আদিবাসী বীর নাকি অভিজাত শুক্লরা? ছত্তিশগড়ের যে মহান পরম্পরা তার উত্তরাধিকার কে? বর্তমানের জটিল রাজনৈতিক সংগ্রামের পটভূমি হিসেবে অতীতকে টেনে আনা হল। বীর নারায়ণকে সমর্থন করে অর্জুন সিং শুক্ল ভাইদের বিরুদ্ধে নিজেকে আদিবাসী-বান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন।
শীঘ্রই রাজ্য সরকারের আমলারা নারায়ণ সিংয়ের এক নতুন “সরকারী’ এক অবতারের নির্মাণ করলেন। কিছু সদর্থক ফলাফল যে হয়নি এমন নয়। একজন জননায়ক যাঁর কথা বেশি লোকে জানত না, তিনি নিজের প্রাপ্য কিছুটা হলেও পেলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর অন্তরালে আসলে উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। নিজেদের বীর নারায়ণের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণ করার তাগিদে ঘন ঘন সোনাখান যাত্রার দরকার পড়ল। হাসপাতাল এবং অন্যান্য প্রকল্পের উদ্বোধন হল। যদিও এইসব প্রকল্পগুলি মোটেই কার্যকরী হয়নি। চাকরি এবং “সাহায্য” ঘোষণা হয়েছে। বীর নারায়ণের নামে জলাধার এবং উদ্যানের নামকরণ হয়েছে।
কিন্তু গ্রামবাসীদের অভিযোগ মোটে একটা পরিবার লাভবান হয়েছে।
অন্যান্য অঞ্চলে নারায়ণ সিংয়ের নামের সাথে মানুষের পরিচিতি বাড়ছিল, অথচ তাঁর নিজের গ্রামেই তিনি ব্রাত্য হয়ে পড়লেন। বীর নারায়ণের নামে মাত্র একটা পরিবারকে সমস্ত সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার ঘটনাটা সোনাখানের মানুষ মেনে নিতে পারেন নি।
যে প্রতিবাদী রাজনীতির প্রতীক ছিলেন বীর নারায়ণ, তার গৌরব হারিয়ে গেল। দয়া-দাক্ষিণ্যের রাজনীতির জয় হল। একজন খাঁটি লোকনায়কের আত্মীকরণ করল কুলীন সমাজ। যে সংহতির বাতাবরণ তিনি নির্মাণ করেছিলেন তা চূর্ণবিচূর্ণ হল। ৮০-এর দশকের আগমন সূচীত হল।
আমাদের যাত্রার শেষের দিকে অবশ্য গ্রামবাসীদের মন নরম হয়ে এল। তাঁদের ক্ষোভ অমূলক মনে হলেও অযৌক্তিক ছিল না। বিজয় পাইক্রার কথায়, “তিনি ছিলেন সত্যিকারের ভালোমানুষ। তিনি আমাদের সবার অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন, শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়। নিঃস্বার্থ মানুষ ছিলেন তিনি। আজ তাহলে শুধুমাত্র একটা পরিবার কেন লাভবান হবে?”