"ভারত ছাড়ো আন্দোলন চলাকালীন যখন আপনার স্বামী বৈদ্যনাথ ১৩ মাসের জন্য জেলে আটক ছিলেন তখন আপনার বেজায় কষ্ট হয়েছিল, তাই না? এত বড়ো একটা একান্নবর্তী পারিবার সামলানো তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়... আর তাছাড়া…" পুরুলিয়ার ভবানী মাহাতোকে প্রশ্ন করেছিলাম আমি।
“ফিরে আসার পর বরং ঝামেলা বাড়ল! ফিরে আসার মানে দাঁড়ালো যখন তখন স্যাঙ্যাৎদের নিয়ে আসবে, আমাকে তাদের আহারের ব্যবস্থা দেখতে হবে, আর নইলে তারা এসে রাঁধা খাবারদাবার তুলে নিয়ে যাবে। সময়ে অসময়ে পাঁচ, দশ বা কুড়ি অথবা তারও বেশি লোক এসে হাজির হত! একটা মিনিট যে একটু দম নেব, তার জো ছিল না,” ঠাণ্ডা গলায় তাঁর সদৃঢ় জবাব।
“কিন্তু, মানে বলছিলাম যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সঙ্গে আপনার যে যোগ…”
“ওইসব ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে আমার আবার কীসের যোগসাজশ?” তাঁর সপাট প্রশ্ন। “ওই আন্দোলনের সঙ্গে আমার কোনও লেনদেন নেই, সে ছিল বটে আমার স্বামী বৈদ্যনাথ মাহাতোর। আমার থোড়াই ওসবের সময় ছিল। এই এত্ত বিরাট সংসারের সবার দেখাশোনা, একগাদা লোকজন, তাদের সবার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি রান্না করতে হত না, বলুন দেখি! দিন কে দিন কাজ বেড়েই যেত! আর মনে রাখবেন এতসবের উপর ছিল চাষবাসের যাবতীয় কাজ,” বলে উঠলেন ভবানী দিদা।
এমনতর কথা শুনে আমরা তো হতবাক। হাবেভাবেই বোঝা যাচ্ছিল আমরা যারপরনাই নিরাশ। কতখানি পথ পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই প্রত্যন্ত এলাকায় আমরা এসেছি এখনও বেঁচে থাকা প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের খোঁজে। আর এই মানবাজার ১ ব্লকের চেপুয়া গ্রামে আমাদের সামনে বিরাজমান আছেন যিনি, যাঁকে সব অর্থেই সেই মহান ভূমিকা পালনকারী এক আদর্শ চরিত্র বলে মনে হচ্ছিল, তিনিই কিনা ভারতের স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামে তাঁর নিজের অবদানকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাসে জল ঢেলে দিলেন!
কি অসাধারণ স্বচ্ছতা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবানী দিদা কথা বলছিলেন – ভেবে দেখার মতো ব্যাপার যে তিনি এমন এক মানুষ যাঁর বয়স কিনা ১০১ থেকে ১০৪ বছরের মধ্যে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলের আম মানুষের বয়স নির্ধারণ করা আজকের দিনেও তো কম বিড়ম্বনার ব্যাপার নয়। আর এক শতাব্দী পূর্বে ভবানী মাহাতোর ভূমিষ্ঠ হওয়ার কালে জন্ম সংক্রান্ত দলিল দস্তাবেজের কোনও বালাই ছিল না। প্রয়াত স্বামীর নথিপত্র, মধ্য ৭০-এর তাঁর ছেলে, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বয়স এবং পুরুলিয়ার এই এলাকার অন্য আর পাঁচটা গ্রামে তাঁর চেয়ে বয়সে খানিক ছোটো অথচ সমসাময়িক মানুষজনের সঙ্গে কথাবার্তা - ইত্যাদি নানান অনুষঙ্গের মাধ্যমে তাঁর মোটামুটি সঠিক একটা বয়স আমরা ঠাহর করতে পেরেছিলাম।
বয়স নির্ধারণের এই পদ্ধতি, যা হোক একটা বয়স লিখে পাট চুকিয়ে দেওয়া আধার কার্ড নামক গেরোর চেয়ে ঢের বেশি ভরসাযোগ্য। আধার কার্ডের নিরিখে ভবানী মাহাতোর জন্মের সাল ১৯২৫, সেই হিসেবে তাঁর বয়স এখন মোটে ৯৭।
অথচ পরিবারের মানুষজন বলছেন তাঁর বয়স অন্তত ১০৪।









