"মেয়েটা ঘন্টার পর ঘন্টা কেঁদেই যায় আর বলতে থাকে ওর মাকে যেন আমি এনে দিই," নিজের সাত বছরের কন্যা নব্যার কথা বলতে গিয়ে জানালেন শিশুপাল নিষাদ। "আমি কোথা থেকে ফিরিয়ে আনব ওকে? আমার তো নিজেরই মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আমরা কেউই হপ্তার পর হপ্তা দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি," বলছিলেন উত্তরপ্রদেশের সিংতৌলি গ্রামের ৩৪ বছরের এই শ্রমিক।
শিশুপালের স্ত্রী – ছোট্টো নব্যার মা – মঞ্জু ছিলেন জালৌন জেলার কুথৌণ্ড ব্লকের সিংতৌলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন “শিক্ষা মিত্র”, অর্থাৎ পার্শ্ব-শিক্ষক বা প্যারা টিচার। ইউপিতে পঞ্চায়েত নির্বাচনের বাধ্যতামূলক দায়িত্বভার পালন করতে গিয়ে যে ১,৬২১ জন শিক্ষক কোভিড-১৯ সংক্রমণ জনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মঞ্জুদেবীর নাম ১,২৮২ নম্বরে রয়েছে। তবে যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন, পাঁচজনের সংসারে মঞ্জু নিষাদ একটা নিষ্প্রাণ সংখ্যামাত্র ছিলেন না, ছিলেন অনেক কিছু।
মঞ্জু ছিলেন তিন সন্তানের মা এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য। সারামাসের রোজগার ছিল মোটে ১০,০০০ টাকা। হ্যাঁ, উত্তরপ্রদেশে শিক্ষা মিত্রদের মাইনে এতটাই নগন্য আর তার উপর তাঁদের চাকরি চুক্তিভিত্তিক, ফলত স্থায়ী মেয়াদ বা ওই ধরনের কোনও নিরাপত্তাটুকুও নেই। মঞ্জু এভাবে ১৯টা বছর কাজ করেছিলেন, এবং পুরোদমে শিক্ষকতা করা সত্ত্বেও তাঁর কপালে তকমা জুটেছিল নেহাতই একজন শিক্ষা সহায়কের (অর্থাৎ শিক্ষকের কাজে সাহায্যকারী)।
শিশুপাল নিজে ছিলেন শ্রমিক, বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়েতে কাজ করে তাঁর দৈনিক আয় হত ৩০০ টাকা। তবে সেটাও বন্ধ হয়ে যায় যখন “আমি এক্সপ্রেসওয়ের যে দফায় কাজ করছিলাম সেটা দু'মাস আগে শেষ হয়ে যায়। কাছাকাছি আর কোনও নির্মাণের কাজ হচ্ছিল না, তাই এই কয়মাস আমরা সবাই আমার স্ত্রীর রোজগারের উপরেই বেঁচেছিলাম।”
এপ্রিলের ১৫, ১৯, ২৬ আর ২৯ তারিখ জুড়ে উত্তরপ্রদেশে পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘিরে যে অতিকায় কর্মকাণ্ড চলেছিল তার দায়িত্ব ছিল হাজার হাজার শিক্ষকের উপর। প্রথমে তাঁরা প্রত্যেকে একদিন করে প্রশিক্ষণ নিতে যান, তারপর আরও দুদিন তাঁদের যেতে হয় নির্বাচনের কাজে – প্রথমদিন তদারকি এবং তার পরদিন ভোটগ্রহণের জন্য। এরপর দোসরা মে ভোট গণনার কাজে আবার হাজার হাজার শিক্ষককে ফিরে আসতে হয়। এসকল দায়িত্ব ছিল বাধ্যতামূলক এবং শিক্ষকদের ইউনিয়নগুলি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বারংবার আবেদন করা সত্ত্বেও তা গ্রাহ্য করা হয়নি।
১,৬২১ জন মৃত শিক্ষকের যে তালিকাটি ইউপির শিক্ষক মহাসংঘ (শিক্ষক ফেডারেশন্) বানিয়েছে সেখানে ১৯৩ জন শিক্ষা মিত্রের নাম আছে। তাঁদের মধ্যে মঞ্জু নিষাদকে নিয়ে মোট ৭২ জন মহিলা। অথচ ১৮ই মে নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী ইউপির প্রাথমিক শিক্ষা পরিষদ সংবাদ মাধ্যমকে যে বিবৃতিটি দেয় সেখানে বলা ছিল যে শুধুমাত্র যাঁরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেছেন তাঁদেরকেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। অর্থাৎ শিক্ষকদের মধ্যে একমাত্র যাঁরা ভোটকেন্দ্রে বা বাড়ি ফেরার সময় প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরাই পেতে পারেন এ ক্ষতিপূরণ। “রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ একমাত্র তাঁদেরকেই প্রদান করা হবে যাঁরা কোনও না কোন কারণে উক্ত সময়সীমার মধ্যে মারা গেছেন।”








