মাঠে প্রান্তরে দিনান্ত ঘাম ঝরাচ্ছেন খেতমজুরেরা, কিংবা লবণভাটির কর্মী, হয়তো বা জনাকয় খনিশ্রমিক, অথবা নৌকা বাইতে বাইতেই গান গেয়ে উঠছেন কয়েকজন ধীবর — এ আর এমন আশ্চর্যের কী? সংস্কৃতির ঝুলি হাতড়ে আমরা হামেশাই দেখেছি কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে গানের কেমন নিবিড় সংযোগ রয়েছে, যে গান বিশেষ কিছু পেশা ঘিরে। তা পেশামূলক লোকসংগীতের এই ধারা কিন্তু কৌম নির্বিশেষে বিদ্যমান। কখনও সে গানমালা একত্রে কর্মরত মানুষদের সাহস জোগায়, কখনও বা সে সমন্বয়ের উৎস। কখনও সে কাটায় একঘেয়েমি, কখনও বা সে ঘামরক্ত জল করা যন্ত্রণার উপসম।
১৭০ কিলোমিটার লম্বা কচ্ছ উপসাগর এক দিগন্তবিস্তৃত ইন্টারটাইডাল বা আন্তঃজলোয়ার জোন। অসংখ্য খাঁড়ি, মোহনা ও কাদাময় প্রান্তর মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক অনন্য জৈবতন্ত্র, যা সংখ্যাতীত সামুদ্রিক প্রজাতির প্রজননভূমি। যুগ যুগ ধরে উপকূলবর্তী কচ্ছে মাছ ধরে বেঁচে আছেন বহু মানুষ, অথচ দরিয়ার ঢেউ আর উপকূলীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে ভাঙন ধরেছে সেই মৎস্যজীবীদের রুজিরুটিতে। নানান সমস্যার মোকাবিলায় অতিষ্ঠ জেলেরা, এ গানে ফুটে উঠেছে সেসব কথা।
কচ্ছের মৎস্যজীবীদের ইউনিয়ন, বিশেষজ্ঞ তথা অন্যান্য অনেকেই এসকল উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে সরব হয়েছেন। দ্রুতগতিতে সামুদ্রিক জৈববৈচিত্র্য নিঃশেষ হয়ে আসার জন্য টাটা গোষ্ঠীর মুন্দ্রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আদানি গোষ্ঠীর মুন্দ্রা বিদ্যুৎ প্রকল্পকে তাঁরা কাঠগোড়ায় তুলেছেন — জৈববৈচিত্র্যে ধ্বংস হতে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এখানকার মৎস্যজীবীরা। আজকের এই গান অসম্ভব সহজ সরল ভাষায় এসকল মুসিবতের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
এই মেহনতিয়া গানটি অপূর্ব ছাঁদে গেয়েছেন মুন্দ্রা তালুকের জুমা বাঘের, তিনি নিজেও একজন মৎস্যজীবী। প্রধান গায়ক তিনিই, তবে পিছনে আরেকদল গাইয়ে বারবার ধুয়ো তুলছেন: হো জামালো (ওহে ধীবরগণ)। এ গানের মনমোহিনী সুর আমাদের পৌঁছে দেয় সুদূর কচ্ছের ভাঙন ধরা উপকূলে।



