নিজেদের মতো করে খেত দেখভালের ভার নিয়েছে এই পরিবারটি। বেশ দেখায় তাঁদের খেতটাকে, ফলনও হয় দিব্যি। “এই কুয়োটা দেখুন,” পারিবারিক শ্রমের ফসল এই বেশ বড়ো কুয়োর দিকে ইঙ্গিত করলেন কমলাবাই। “শুধু যদি এটাকে সাফসুতরো আর মেরামত করিয়ে নিতে পারতাম, তাহলে আজ আরও অনেক বেশি জল থাকত আমাদের হাতে।” কিন্তু সেজন্যেও তো অন্ততপক্ষে হাজার পনেরো টাকার প্রয়োজন। আর জমিতে বেড়া দিতে যে ১ লক্ষ টাকা দরকার তার কথা তো ছেড়েই দিলাম। জমির ঢালের নিচে এক একর জমিতে জলাশয় তৈরি করতে পারলেও মন্দ হত না। কিন্তু তাতে প্রচুর টাকা দরকার। ব্যাঙ্ক ঋণের বন্দোবস্ত করা এখন অসম্ভব। ওদিকে তাঁদের ভেঙে পড়া বাড়িটা ঠিকমতো মেরামতি করতে গেলে সে আরও হাজার পঁচিশেক টাকার ধাক্কা। তাঁর কথায়, “ফসলের ক্ষতির জেরে ১.৫ লক্ষ টাকা দেনা হয়ে গেছে বলেই তো আমার বর নিজের জীবনটা নিজেই শেষ করে দিল।” তাঁরা কিছু কিছু করে এই ঋণ শোধ করেছেন বটে। তবে রাজ্য সরকার থেকে যে এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ পেয়েছেন কমলা, তার পুরোটাই প্রায় সংসার চালাতে খরচ হয়ে গিয়েছে। পাওনাদারেরা এখনও তাঁকে উত্যক্ত করে চলেছে। “আমাদের তো ভালোই চলছিল। কিন্তু তারপর কয়েক বছর ধরে চাষাবাদের অবস্থা সত্যিসত্যিই পড়ে গিয়ে আমাদের অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেল।”
লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো তাঁর পরিবারকেও কয়েক দশকের সবচেয়ে ব্যাপক কৃষি সংকটের ফল ভুগতে হয়েছিল। ক্রমবর্ধমান পুঁজি, উৎপাদিত শস্যের পড়তি দ্রব্যমূল্য, অমিল ঋণ, সরকারি সহায়তা ব্যবস্থার প্রত্যাহার – সমস্যা নেহাত কম ছিল না। তিনি বললেন, “গ্রামের সবকটা লোকেরই এই এক দশা।” গত বছরও ফসলের বিপর্যয় ঘটেছিল। ভাস্কর বিটি-তুলোর ওপর ভরসা করে ক্ষতিগ্রস্ত হল তখন। আক্ষেপের সুরে কমলাবাই বলে ওঠেন, “আমাদের ভাগ্যে মোটে কুইন্টাল দুয়েক জুটেছিল।”
সরকার এরপর কার্যত লোকসান আরও বাড়িয়ে দেয়। গত বছরের শেষের দিকে, তাঁকে একটি “ত্রাণ প্যাকেজ” -এর “সুবিধাভোগী” করে দেওয়া হয় আর একটা মহার্ঘ্য “আধা জার্সি” গরু কিনতে বাধ্য করা হয়, যেটা আদৌ তিনি চাননি। ভর্তুকি অনেকটা দেওয়া হলেও তাঁকে গরুর মূল্য বাবদ ৫,৫০০ টাকার মধ্যে নিজের ভাগটুকু তো মিটিয়ে দিতেই হয়েছিল। তাঁর গলায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে, “আমরা সকলে মিলে যা খাই, ও ব্যাটা একাই তার চেয়ে বেশি সাবাড় করে দিত। গিলত আমাদের সকলের চেয়ে বেশি, আর দুধের বেলায় এক ছটাক। (দ্য হিন্দু, ২৩ নভেম্বর ২০০৬)
উলট ভাড়া
তারপর থেকে, “আমি দুইবার গরুটা লোকজনকে দিয়ে দিয়েছি, কিন্তু ওরা ঠিক শেষমেশ তাকে ফেরত দিয়ে গেছে,” একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো সুরে বললেন তিনি। যাকেই জন্তুটা উপহার দেন সেই বলে, “আমরা বাবা এর খোরাক জোটাতে পারব না।” তাই এখন, “আমি একজন প্রতিবেশীকে গরুর দেখাশোনা করার জন্য উল্টে মাসে মাসে ৫০ টাকা দিচ্ছি।” একে একরকম উলট ভাড়া বলা চলে। চুক্তি হল গরুটা যদি ঠিকঠাক দুধ দিতে শুরু করে তবে সেই দুধের অর্ধেক ভাগ তাঁর। অবশ্য, এসবই কেবল আশাবাদী ভবিষ্যতের কথা। বর্তমান পরিস্থিতি এই যে: উল্টে কমলাবাইকেই গরুর দেখাশোনা করার জন্য গাঁটের কড়ি খসাতে হচ্ছে। যেখানে কিনা সরকারের প্রতিশ্রুতি মতো গরুটার জন্যই তাঁর খানিকটা আর্থিক সুরাহা হওয়ার কথা।
কিন্তু এখনও অটুট তাঁর স্পৃহা। অন্য কোনও কাজ না জুটলে তিনি এখনও প্রতিদিন খেতের দিকে পায়ে হেঁটেই পাড়ি দেন লম্বা পথ। আজ যখন তাঁর ক্ষুদে ছটফটে নাতি-নাতনিরা তাঁর পায়ে পায়ে হাঁটে, দেখতে কি মজাই না লাগে। ওরা যাতে দুধেভাতে থাকে, একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ সামনে থাকে যাতে ওদের – সেই লক্ষ্যেই অদম্য জেদে এখনও কাজ করে চলেন কমলাবাই। বরাবরের মতোই আজও মাথা উঁচু তাঁর, কিন্তু বাচ্চাগুলোর দিকে তাকালে আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না। কমলাবাই বেশ বুঝতে পেরেছেন যে আত্মহত্যা আদতে মৃতের নয়, বরং অনন্ত যাতনা নিয়ে পড়ে থাকা পরিজনের বাস্তব। আর তাই সেই মানুষগুলোর জন্যই লড়াই জারি রেখেছেন তিনি।
এই নিবন্ধটি ২১ মে ২০০৭ সালে ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্রে প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিল।
অনুবাদ: পারি-ভাষা, বাংলা বিভাগ
অনুবাদ সম্পাদনা: রম্যাণি ব্যানার্জী