আজ আমরা এক রুখাশুখা জংলা জায়গায় ‘ডেভিলস্ ব্যাকবোন’ (শয়তানের মেরুদণ্ড) খুঁজে বেড়াচ্ছি। আরে বাবা! পিরান্দাই বা হাড়জোড়া (সিসুস কোয়াড্রাঙ্গুলারিস) গাছকে তো লোকে এই নামেই চেনে। রথীর সঙ্গে এই যে চৌকোনা কাণ্ডযুক্ত ঔষধি লতাটি হন্যে হয়ে খুঁজছি, এটার গুণমানের তালিকা বেশ লম্বা। সাধারণত কচি দেখে কাণ্ড তুলে, ধুয়েমুছে আচার বানানো হয় লাল লংকা-গুঁড়ো, নুন ও তিলের তেল সহযোগে। ঠিকমতন বানালে এই আচারটা একবছর অবধি রয়ে যায়, পচে না। ভাত দিয়ে খেতে দুর্দান্ত লাগে!
জানুয়ারির এক উষ্ণ বিকেল, এক প্রাচীন শুকিয়ে যাওয়া ঝোরার পথ ধরে জঙ্গলে ঢুকেছিলাম। মৃত স্রোতস্বিনীর তামিল নামটা বড্ড মন-কেমন করা: এল্লাইয়াথাম্মন ওডাই, অর্থাৎ নিঃসীম দেবী। শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। তবে কাঁকুরে, বালি ভরা, কোথাও চওড়া, কোথাও ভেজা এই গা-ছমছমে জঙ্গলাকীর্ণ শুঁড়িপথটাও অবশ্য কোনও অংশে কম নয়।
হাঁটতে হাঁটতে আমায় নানান গল্প শোনাচ্ছিলেন রথী। কয়েকটা কাল্পনিক, মজাদার — কমলালেবু ও প্রজাপতিদের নিয়ে। কয়েকটা হাড়হিম করা সত্যি ঘটনা — নব্বইয়ের দশকে ফেলে আসা খাদ্য-রাজনীতি ও জাতপাতগত হিংসার কথা — রথী তখন হাইস্কুলে পড়তেন। “আমার পরিবার জান বাঁচাতে থুথুকুড়িতে পালিয়ে আসে...”
দুই দশক পর, আজ এক পেশাদার কথক, গ্রন্থাগার উপদেষ্টা ও পুতুলনাচিয়ে রূপে ছোটোবেলার গাঁয়ে ফিরে এসেছেন রথী। কথাবার্তা ধীরে ধীরে কইলেও পড়ার সময় গোগ্রাসে গিলে ফেলেন। “কোভিড অতিমারির সময়, ৭ মাসে ছোটোবড়ো মিলিয়ে ২২,০০০টা শিশুসাহিত্যের বই পড়ে নিয়েছিলাম। শেষমেশ এমনও দিন এল যখন আমার সহকারী আমায় হাতেপায়ে ধরে থামতে বলতেন। নইলে তো একাই সংলাপের ঢঙে কথা বলতে লাগব,” বলেই খিলখিলিয়ে উঠলেন তিনি।
যে নদীর নামে তাঁর নাম, হাসিটাও তারই মতো উন্মুক্ত: ভাগিরথী। তবে পুরো নামটা আর ইস্তেমাল না করে শুধু ‘রথী’-টুকুই রেখেছেন। তাঁর নামধারী নদী যে পর্বতমালার পাদদেশে গঙ্গায় রূপান্তরিত হয়, সেই হিমালয়ের প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দক্ষিণে, থেঙ্কালম গ্রামে রথীর নিবাস। তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার এই গ্রামটির চারধারে শুধু পাহাড় আর ঝোপঝাড়ে ভরা রুখাশুখা অরণ্য। এই টিলা, এই বনানীকে খুব কাছ থেকে চেনেন রথী, ঠিক যেমন গাঁয়ের সকলেই চেনে তাঁকে।
“জঙ্গলে যাচ্ছেন কেন শুনি?” মহিলা মজুরদের এ প্রশ্নে রথী জবাব দিলেন: “পিরান্দাইয়ের সন্ধানে।” এরপর প্রশ্ন করলেন জনৈক গোপালক, “পাশের ওই মহিলাটি কে? আপনার বন্ধু নাকি?” একগাল হেসে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ,” বলে উঠলেন রথী, আমি হাত নাড়লাম, তারপর আবার হাঁটা লাগালাম।

















