পান চিবোতে চিবোতে কথা বলছিলেন আমজাদ সাহেব, “এমন একটা লোক খুঁজে দিন যার কাওয়ালি ভাল্লাগে না! এ এমনই একটা শিল্প যা সক্কলে ভালোবাসে।” মুখের পানটা খতম হতেই তাঁর নেশা ও পেশা কাওয়ালির বিষয়ে বলে উঠলেন, “পাবলিক কো খুশ করনে কা। বাস্ [মানুষকে খুশি করাটাই আসল কথা, ব্যাস্]!”
“পাওঁ মেঁ বেড়ি, হাথোঁ মেঁ কঢ়া রেহনে দো, উসকো সরকার কি চৌখট পে পড়া রেহনে দো... [দু'পায়ের বেড়ি-জোড়া, দু'হাতের বালা-তোড়া থাক তবে থাক... সাহেবের চৌকাঠে, যে আজ এসেছে জুটে, থাক সেও থাক],” সুরটা কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে, মনে হচ্ছে জনপ্রিয় কোনও একটা হিন্দি সিনেমার গান থেকে নেওয়া।
তবে দরগায় আসা মানুষজন কিন্তু কাওয়ালিতে এরকম বলিউডি সুর আরোপ করায় বিরক্ত হচ্ছেন না, বরং আমজাদ সাহেবের গানে মজে কেউ ১০ টাকা, কেউ ২০ টাকা দিয়ে যাচ্ছেন। মাজারে চাদর চড়িয়ে পরমপূজ্য সন্তের দোয়া চাইতে আসা ভক্তদের তিলগুল (তিল ও গুড়) বিতরণ করছেন তদারককারীরা। ভক্ত-সওয়ালিদের ঘাড়ে-পিঠে ময়ূর পালক ঝেড়ে ইবলিশের বদনজর তাড়াচ্ছেন এক মুজাওর। পীরের উদ্দেশ্যে নজরানা স্বরূপ টাকাপয়সা দিয়ে যাচ্ছে লোকে, অল্প একটু বকশিস কাওয়াল সাহেবও পাচ্ছেন।
ধনবানদের নিত্য সমাগম এই দরগায়, আমজাদ মুরাদ গোণ্ড জানালেন। আসার পথে অসংখ্য ছোটো ছোটো গুমটি পড়বে, সব জায়গাতেই দেখবেন নজর নিয়াজের জন্য চাদর আর ওড়না বিক্রি হচ্ছে। উপাসনাস্থল মানেই কত মানুষের পেটের জোগান আর কর্মসংস্থান।
হজরত পীর কমর আলি দরবেশ ভেদাভেদ করেন না। দরগার সিঁড়িতে দেখবেন ভিক্ষে চেয়ে ফিরছেন এক ফকির, তাঁরই পাশে দুটো পয়সা আর দয়ার তরে হাত বাড়িয়ে আছে কত প্রতিবন্ধী মানুষ। এক হিন্দু মহিলা নিয়মিত আসেন এ মাজারে, গায়ে থাকে মহারাষ্ট্রের প্রথাগত নওভরি বা নয় গজের শাড়ি। মনে মনে হজরত কমর আলি দরবেশের আশীর্বাদ অনুভব করতে পারেন তিনি। প্রতিবন্ধী, অনাথ, কাওয়াল — এখানে সক্কলে পীর সাহেবের কৃপার পাত্র।
আমজাদ মুরাদ গোণ্ড ভিখিরি নন মোটেই। তিনি একজন শিল্পী। সকাল ১১টায় আসেন, দরগার সামনে জুৎসই জায়গা দেখে নিজের 'মঞ্চ' বেঁধে বসে পড়েন। ধীরে ধীরে আসতে থাকে সওয়ালির দল। মাজারের চারধারে সাদা মর্মর ও কালো গ্রানাইটের মেঝে, দুপুর হতে না হতেই তেতে আগুন হয়ে যায়। ফোসকা-পড়া আঁচ থেকে বাঁচতে পড়ি কি মরি হয়ে দৌড় লাগান ভক্তরা। সওয়ালিদের মধ্যে মুসলিমের চাইতে হিন্দুর সংখ্যাই বেশি।
তবে পীরের কবরের কাছে মেয়েদের যাওয়া নিষেধ। তাই মুসলিম মহিলা-সহ অনেকেই বারান্দায় বসে বসে চোখ বন্ধ করে কুরআনের আয়াত পাঠ করতে থাকেন। তাঁদের পাশেই দেখলাম কাছাকাছি গাঁ থেকে আসা এক হিন্দু মহিলা, যাঁর উপর পীরের রূহ ভর করেছে। লোকের মুখে শুনলাম, “পীরাচা ওয়ারা [পীরের আত্মা]।”