মধু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দিন ১৫-এর একটি অভিযানে সাধারণত ৬-৭ জন যোগ দেন এবং প্রত্যেকে গড়ে প্রায় ১/১.৫ কুইন্টাল করে মধু সংগ্রহ করেন। সরকার নির্ধারিত স্থির মূল্যে, বন দপ্তরকে এই মধু বিক্রি করা মউলিদের জন্য বাধ্যতামূলক। সঞ্জিত আমাদের জানান যে এই বছর মধুর দর ছিল কিলো প্রতি ১১৫ টাকা – ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে বনদপ্তর থেকে এই মধু কিলো প্রতি ৩০০ টাকা দরে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন পর্ষদ লিমিটেড (ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন লিমিটেড) মৌবন মার্কা এই মধু শোধন তথা বিপণনের ব্যবস্থা করে।
এই বছর অবশ্য বন দপ্তর থেকে মউলিদের সংগ্রহ করা সমস্ত মধু গ্রহণ না করে মউলি প্রতি মধু জমা দেওয়ার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সঞ্জিত জানান, “আমাদের পরিবারের কাছ থেকে এই বছর বনদপ্তর মধু কেনে নি, কারণ দপ্তরের মধু সংগ্রহ করার কোটার পরিমাণ আগেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।” তিনি এবং তাঁর পরিবার উদ্বৃত্ত মধু নিজেরাই বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছেন। “আমরা ৮০-৯০ কেজি মধু সংগ্রহ করেছি এবংপ্রতিবেশী গ্রামগুলিতে ২০০-২৫০ টাকা কিলো প্রতি দর রেখেছি। কলকাতায় আমরা আরও ভালো দাম পাই।”
সঞ্জিত বলেন, “আগের বছরগুলিতে, আমরা মোটে পাঁচ কেজি করে মধু ঘরে তুলতে পারতাম। এছাড়া অবশিষ্ট পুরো মধু বনদপ্তরের কাছে জমা দিতে হত। আমাদের নৌকোয় মধু লুকিয়ে রাখা আছে কিনা সেটাও পরীক্ষা করে দেখা হত বনদপ্তর থেকে। বাজারে মধু বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়লে আমাদের নৌকো বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হত।”
সঞ্জিত তাঁর পিতার মত মৎসজীবী এবং মরশুমি মধুসংগ্রাহক হলেও প্রতিবছর ২-৩ মাসের জন্য দৈনিক ৩৫০-৪০০ টাকা মজুরিতে নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে কাজ করার জন্য ব্যাঙ্গালোর অথবা চেন্নাইয়ের মত শহরগুলিতে পাড়ি দেন। “বাবা এবং তাঁর বন্ধুরা আজীবন সুন্দরবনেই কাজ করেছেন। তাঁরা এখানকার জঙ্গলের প্রেমে পড়েছেন এবং স্বীকার করেন যে এই জঙ্গল ছাড়া তাঁরা কোথাও শান্তি পাবেন না। আমাদের প্রজন্ম বিদেশে যায় কাজের সন্ধানে। মাছ ধরে আর মধু সংগ্রহ করে কি আর পরিবারের ভরণপোষণ সম্ভব?”
স্নাতক স্তরের শিক্ষা শেষ করার আগেই সঞ্জিতকেপড়াশোনা ছেড়ে সংসারের হাল ধরার জন্য উপার্জন শুরু করতে হয়। তাঁর ১৮ মাস বয়সের পুত্রসন্তানকে তিনি শিক্ষিত করতে চান। “আমার ছেলেকে যেন জঙ্গলে না যেতে হয়। জঙ্গল ভীষণ বিপদসঙ্কুল।”
যদিও, নিতাইয়ের মতে যাদের কাজের জন্য দেশান্তরি হতে হয় তারা মনের দিক থেকে অসুখী, কারণ সেখানে প্রতারিত হওয়ার এমনকি খুন হয়ে যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। বরং বিপদ এবং ঝুঁকি সত্ত্বেওসুন্দরবনে কাজ করাই শ্রেয় বলে তিনি মনে করেন।