পূজাদের বাড়ি থেকে ৭৫ কিমি দূরে টুমকুর জেলায় রয়েছে ডি. হোসাহাল্লি গ্রাম, এখানকার কাডুগোল্লা বাসিন্দাদের পাড়ায় থাকেন জয়াম্মা। আজ তাঁর মাসিক ঋতুস্রাবের তৃতীয় দিন, তাই ভর সন্ধ্যাবেলায় বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে একটি গাছে ঠেস দিয়ে বসে থাকতে দেখা গেল তাঁকে। ঠিক তাঁর পিছনে বয়ে যাচ্ছে একটি দুর্গন্ধে ভরা নর্দমা, স্টিলের একটি থালা আর গেলাস মাটিতে পড়ে আছে। বেশ জোর গলায় জানালেন যে রোদজলঝড়বৃষ্টি সব কিছু উপেক্ষা করে প্রত্যেক মাসের এই তিনটে দিন তিনি এই গাছতলাতেই কাটান। ঘরকন্নার কাজকর্ম তখন করতে পারেন না ঠিকই, তবে বাড়ির ভেড়াগুলো তাঁকেই চরাতে নিয়ে যেতে হয় কাছাকাছি একটা মাঠে।
"সাধ করে আর কে-ই বা মাঠেঘাটে এমন রাত কাটায় বলুন দেখি?" জিজ্ঞেস করলেন তিনি। "তবে করতে এটা হবেই আমাদের। আসলে কি জানেন তো, এ সবই ভগবানের [কাডুগোল্লারা মূলত কৃষ্ণের উপাসক] হুকুম। কপালটা এমনই যে গতকাল আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, কোনও মতে মাথাটা ঢেকে [একফালি ত্রিপল দিয়ে] বসেছিলাম আমি।"
জয়াম্মা এবং তাঁর স্বামী উভয়েই পেশায় পশুপালক, বেশ কয়েকটি ভেড়া আছে তাঁদের। আর আছে দুই ছেলে [দুজনেরই বয়স বিশের কোঠায়], তাঁরা বেঙ্গালুরুর কারখানায় কাজ করেন। "খোকাদের তো একদিন না একদিন বিয়ে হবেই, তখন বৌমারাও মাসিকের সময় বাইরে রাত কাটাবে, অক্ষরে অক্ষরে এই নিয়ম মেনে চলি আমরা," বললেন তিনি, "আমার ভাল্লাগে না এসব, কিন্তু তাই বলে তো আর দেওতার আদেশ অমান্য করা যায় না। তবে আমার বর এবং গাঁয়ের মোড়লরা যদি রাজি হয় এই নিয়ম তুলে দিতে, তাহলে অবশ্যই মাসিকের সময় এভাবে আর বাইরে পড়ে থাকব না, ঘরেই থাকতে পারব।"
কুনিগাল তালুকের ডি. হোসাহাল্লি গ্রামের কাডুগোল্লা মহিলাদের প্রত্যেকেই এই প্রথাটির শিকার। "আমাদের গাঁয়ে মাসিক শুরু হলে তিনটে দিন মেয়েদের বাইরে থাকতে হয়, তারপর চারদিনের দিন আমরা বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোতে পারি," বললেন ৩৫ বছরের লীলা এম. এন. (পরিচয় গোপন রাখতে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)। ঋতুস্রাব শুরু হলে এই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীকেও বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকতে দেওয়া হয় না। "এখন তো এটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিয়ম ভাঙতে কেউই চায় না, পাছে ভগবান শাপ দেন। রাত্তিরবেলা বাড়ির কোনও একজন পুরুষ, সে ভাই হোক বা বর কিংবা বাপ, সে হয় চৌকাঠের ওপার থেকে কিংবা বাইরে এসে আমাদের উপর নজর রাখে। কাছে আসে না, পাছে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায়। যদি চার দিনের দিনও মাসিক চলে তাহলে বাড়িতে আসতে দেওয়া হয় বটে, তবে লোকজনের থেকে দূরে দূরে থাকতে হয়। বৌয়েরা তাদের বরের সঙ্গে শুতেও পারে না। তবে হ্যাঁ, ঘরকন্নার সমস্ত কাজ আমরা করি তখন, তাতে কোনও বাধা নেই," বললেন লীলা।
ঋতুমতি কিংবা সদ্য মা হয়েছেন এমন মহিলাদের সঙ্গে এরকম নির্মম ব্যবহার করাটা আইনের চোখে ক্ষমাহীন অপরাধ হলেও কাডুগোল্লাদের জনপদে এই পৃথক রাখার প্রথাটি রোজকার একটি সহজ স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে কর্ণাটকে বলবৎ হওয়া (২০২০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি সরকারি নির্দেশনামা আসে) অমানবিক আচার এবং কালাজাদু প্রতিরোধ ও নির্মূলকারী আইন অনুযায়ী ১৬টি প্রথার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, এই তালিকাটির মধ্যে রয়েছে "মহিলাদের বিরুদ্ধে অমানবিক আচারসমুহ, যেমন তাঁদের গ্রামে ঢুকতে না দেওয়া, একা একা থাকতে বাধ্য করা এবং রজঃস্বলা কিংবা সদ্য মা হয়েছেন এমন মহিলাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক ব্যবহার করা।" এই আইনটির বয়ানে অপরাধীদের ১ থেকে ৭ বছর অবধি কারাবাস এবং জরিমানার নির্দেশও আছে।
তবে নখদন্তহীন এই আইনের চোখে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাডুগোল্লা জনজাতির মধ্যে রমরমিয়ে চলছে এই প্রথাটি। এমনকি অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মীরা, যাঁদের উপর রয়েছে সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভার, তাঁরাও পালন করে চলেছেন এই কুসংস্কারটি। ডি. হোসাহাল্লিতে কর্মরত আশাকর্মী ডি. শারদাম্মাও (নাম বদলে দেওয়া হয়েছে) তাঁদের মধ্যে একজন, ঋতুস্রাব চলাকালীন তিনিও খোলা আকাশের নিচে একা একা রাত কাটান।