প্রতিটি গ্রামেই কীটনাশক ছেটানোর পর কেউ না কেউ অসুস্থ হয়েছিলেন। “হাসপাতালের আইসিইউতে নিখিল ও অন্যান্যদের চিকিৎসায় ব্যস্ত জুনিয়র আবাসিক (রেসিডেন্ট) ডাক্তার, ডাঃ পরাগ মানাপে জানান, “রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে প্রাপ্ত ফলাফল থেকে দেখা গেছে যে কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় তাঁদের স্নায়ুতন্ত্র প্রভাবিত হয়েছে।” তিনি বলেন, বিষ পেটে গেলে যতটা মারাত্মক হতে পারে, এক্ষেত্রেও প্রভাব ততটাই ভয়াবহ হয়েছিল। তিনি ব্যাখ্যা করে বোঝান, এক্ষেত্রে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায় কারণ, বিষের কণাগুলিকে ‘স্টমাক ওয়াশ বা পেটের ভেতরটা ধুয়ে’ শরীর থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব হয়নি – কীটনাশকের ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসযন্ত্রটিকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।
অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কৃষকদের বয়ান থেকে দুটি স্পষ্ট প্রবণতা উঠে আসে: পাউডার বা গুঁড়ো একটি বিশেষ কীটনাশক যাঁরা ব্যবহার করেছেন তাঁদের মধ্যে দৃষ্টি শক্তির সমস্যা দেখা দিয়েছে। এবং অন্যদিকে, যাঁরা একটি নির্দিষ্ট তরল কীটনাশক ব্যবহার করেছেন, তাঁদের স্নায়ুতন্ত্র ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই কীটনাশক ওষুধগুলিতে থাকে প্রফেনোফস (এক ধরনের অর্গানোফসফেট), সাইপারমেথ্রিন (এক ধরনের কৃত্রিম পাইরেথ্রয়েড) এবং বহুবিধ ফসলে রকমারি কীটপতঙ্গ (পেস্ট-কমপ্লেক্স) রোধ করার জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক ডায়াফেন্থিউরন। কৃষকেরা বলেন, সবগুলি একসঙ্গে মিশ্রিত হলে তৈরি হয় প্রাণঘাতী এক সংমিশ্রণ যা মানুষ মারার জন্য যথেষ্ট।
* * * * *
টেম্ভী গ্রামের সোয়াম পরিবারের প্রবীণের শরীর ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছিল। প্রথমে তিনি বুকে ব্যথার অভিযোগ করেন, তারপর সারাক্ষণ বমি বমি ভাব এবং বমি, শেষে স্নায়বিক দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দেয়। ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাঁর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক একদিন পরে পান্ধরকাওড়ার একটি ছোট হাসপাতালে নিয়ে আসার ঠিক তিন ঘণ্টা পর তিনি মারা যান। মাত্র দুই দিনের মধ্যে সব শেষ গেল।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের ধারণা, প্রবীণ কীটনাশক স্প্রে করার সময় বিষ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করেন নি এবং বিষাক্ত ধোঁয়া শরীরের সংস্পর্শে আসার কারণে বিষক্রিয়ার প্রভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই অঞ্চলে প্রায় কেউই বিষ প্রতিরোধকারী দস্তানা ও মুখোশ এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা-জামা ব্যবহার না করেই এই মারাত্মক কীটনাশক ছেটানোর কাজ করেন।
ভাউরাও বলেন, “নামদেব অসুস্থ হয়ে পড়েছে দেখে আমি তাকে জমির কার্পাস ফসলে কীটনাশক স্প্রে করতে বলি।” এই বছর, তাঁদের গ্রাম তথা এই সমগ্র অঞ্চলের অন্যান্য কৃষকদের মতোই সোয়াম পরিবারও ২০১৭ সালের জুলাই মাস নাগাদ তাঁদের ফসল নানা রকম পোকামাকড়ের দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখে নানাবিধ কীটনাশকের মিশ্রণে তৈরি ওষুধ অনেক বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
কীটনাশক স্প্রে করার পরেই প্রবীণ শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করতে থাকেন, তা সত্ত্বেও তিনি ডাক্তারের কাছে যেতে অস্বীকার করেন। “আমরা ধরে নিই গরম থেকে শরীর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেই সময়ে বেশ গরম পড়েছিল এবং আমাদের গ্রামে বছরের এই সময়ে সাধারণত জ্বরের প্রকোপ দেখা দেয়,” ভাউরাও স্মরণ করেন। প্রবীণের অবস্থায় অবনতি হলে পরের দিন সন্ধ্যাবেলায় নামদেব এবং তাঁর মা বেবিবাঈ তাঁকে পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একজন সহায়ক প্রবীণকে দেখে বিপদ আঁচ করতে পেরে তাঁকে ৪০ কিলোমিটার দূরে পান্ধরকাওড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।
বেবিবাঈ জানান, তাঁরা প্রায় সন্ধ্যে ৭টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন। তাঁদের তরুণ সন্তান প্রবীণ রাত ১০টায় মারা যান। তাঁর পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে লেখা আছে: “মৃত্যুর কারণ অর্গানোফসফেটজনিত বিষক্রিয়া।”