৫টা বেজে গেছে। অনেকেই বাড়ি যাওয়ার জন্য ধীরে ধীরে একটা ডিঙির দিকে অগ্রসর হলেন, কেউ কেউ তাড়াহুড়ো করে ঘরে রেখে আসা বাচ্চাদের খাওয়ানো ও দেখভাল করার তাগিদে এগোন, কেউ বা ঘরে ফিরে যাচ্ছেন স্বামীদের সম্ভাব্য উগ্রমূর্তির সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে। অণিমা সহ আরও কয়েকজন থেকে যান তাঁদের দলের প্রতিনিধিত্ব করতে। বনবিভাগের প্রতিক্রিয়া জানতে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
চত্বরের শেষে ঘোলাটে সবুজ পুকুর। তাঁরা ওখানেই ইতস্তত ঘোরাফেরা করেন। ওইখানেই তাঁদের বাজেয়াপ্ত হওয়া তাল গাছের গুঁড়ির ডোঙাগুলি সার দিয়ে রাখা আছে। মহিলারা সবাই তিতিবিরক্ত, ডোঙাগুলি থেকে কাঠের টুকরো আলগা হয়ে খসে খসে জলে মিশছে। গীতা সাহু নামে এক জেলেনি গলা নামিয়ে নিচু স্বরে জানান, ”আমাদের ডোঙাগুলি টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে জলে ফেলে দিয়েছে! লাখ লাখ টাকা এই নদীর জলে ভাসছে।” তাঁর কল্পনা অমূলক নয়। যে সকল কর্মীরা তাঁর সঙ্গে অপেক্ষা করছেন তাঁরাও ওই একই কথা বিশ্বাস করেন।
সবেধন নীলমণি
অপেক্ষমান মানুষজন তাঁদের লগ্নি করা টাকা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। ডোঙা তৈরি হয় খেজুর গাছের গুঁড়ি কুঁদে, তার দাম আছে। তারপর তাকে বাটালি দিয়ে খোদাই করার জন্য লাগে পারিশ্রমিক। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলকাতরা দিয়ে তাকে লেপতে হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০০ টাকা। প্রায় প্রতিবার ডোঙা বাজেয়াপ্ত হলে নতুন করে ডোঙা তৈরি করতে তাদের এই পরিমাণ টাকা গচ্ছা যায়। বীণা বাগ, একজন জেলেনি, বুঝিয়ে বলেন, “প্রায় দুই, তিন মাস লেগে যায় এই পরিমাণ পয়সা জোটাতেই। বন বিভাগের দ্বারা অনুমোদিত কাঠের নৌকা খুবই দামি, আমাদের নাগালের বাইরে।”
কিছু দূর হেঁটে গিয়ে তাঁরা বাজেয়াপ্ত করা দুই একটি ডোঙা দেখতে পেলেন। এখনও সেগুলি শক্তপোক্ত আছে। গাছের আড়াল থেকেই দেখা যাচ্ছে। মৎস্যকর্মীদের এই ডোঙা আর ডিঙিগুলির সাহায্যে কাঁকড়া ও মাছ ধরে পেট চালানোর একমাত্র উপায়। ততক্ষণে অণিমা রাগে গজগজ করছেন, “ডিঙিগুলি আটক করে আমাদের পেটে লাথি মারার কি দরকার? দেখুন, আমরা তো আর মাইনে পাই না। এটা তো আর কলকাতা শহর নয় যে মাস গেলে মাইনে পাব আর ব্যাংকে জমা দেব। রেঁধে খাওয়ার জন্য কেউ তো আমাকে বিনি পয়সায় এক বস্তা আনাজ এনে দেবে না! এখানকার জীবনযাত্রা অন্যরকম।”