১০ই মার্চ ২০১৮ তারিখে, তাঁরা আড্ডঙ্কি শহরে ‘রাম রাবণ যুদ্ধম’ পালাটি পরিবেশন করেন। আড্ডঙ্কি কলা পীঠমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের অংশ হিসাবে তাঁদের দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, এই প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশম জেলায় লোকশিল্পের প্রচার এবং বিস্তারের জন্য কাজ করে। রাম এবং রাবণের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে রচিত পালাটি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন – এই আদর্শকেই তুলে ধরে। সেদিনের নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলির সর্বশেষ পরিবেশনাটি ছিল পুতুলনাচ; ফলে, দুই ঘন্টার লম্বা পালাটিকে কেটেছেঁটে শিল্পীরা এক ঘন্টায় নামিয়ে আনতে বাধ্য হন। রাত ১১টা বেজে যাওয়ায়, বিলম্ব সত্ত্বেও নারী এবং পুরুষ দর্শকেরা পুতুলনাচের অপেক্ষায় ছিলেন। দর্শকদের একজন, ৭৪ বছর বয়সী মানিক্যালা রাও বিড়ি হাতে হাই তুলতে তুলতে বলেন, “বহু যুগ হল আমি পুতুলনাচ দেখিনি। সেইজন্যেই এত দেরি হওয়া সত্ত্বেও আমি অপেক্ষা করে আছি।”
কোটিলিঙ্গমের ১০ সদস্যের দলটি অন্ধ্র প্রদেশের এখনও অবধি টিকে থাকা শেষ কয়েকটি পুতুলনাচ গোষ্ঠীর মধ্যে একটি। দলের সদস্য-শিল্পীরা সকলেই মহারাষ্ট্রের আর্যক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের মানুষ, সম্পর্কে তাঁরা সকলেই কোটিলিঙ্গমের আত্মীয়। তাঁরা দক্ষিণ উপকূলীয় অন্ধ্র প্রদেশের গুন্টুর ও প্রকাশম জেলার বিভিন্ন স্থানে বাস করেন, অধিকাংশই আড্ডঙ্কি, দারসি ও ওঙ্গলে ইত্যাদি ছোট ছোট শহরে ফেরিওয়ালা এবং শ্রমিকের পেশায় নিযুক্ত। প্রতি তিন বা চার মাসে একবার অনুষ্ঠান করার জন্য তাঁদের দলকে বায়না করা হলে তাঁরা একত্রিত হন।
বংশ পরম্পরায় চলে আসা তাঁদের এই শিল্পধারার সঙ্গে ছত্রপতি শিবাজীর মারাঠা সাম্রাজ্যের সংযোগের কথা বলতে গিয়ে এই গোষ্ঠীর প্রধান মহিলা শিল্পী, ৪৫ বছর বয়সী ভনাপার্থী রামঞ্জুনেয়াম্মা জানান যে, শিবাজীর দুই ভাই, ভেঙ্কোজী এবং সেরফোজী সপ্তদশ শতাব্দীতে মাদুরাই-তাঞ্জাভুর অঞ্চলে আসেন। এইখানে আগমন কালে তাঁরা লোকশিল্পের নানান ধারা এবং আঙ্গিককের প্রচারে উৎসাহ প্রদান করেন, এই লোকশিল্পগুলির মধ্যে একটি ছিল আর্যক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের পুতুলনাচ শিল্প।
একে একে কোটিলিঙ্গম ও রামঞ্জুনেয়াম্মার বয়ানে আর্যক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের পুতুলনাচ শিল্প সৃষ্টির আদি কাহিনিটি উঠে আসে: “বহুযুগ আগে, জনৈক চোল রাজার রাজসভায় একজন ব্রাহ্মণ কামসালুদের [জাত বিশেষ; এখন অন্ধ্র প্রদেশে কামসালি হিসাবে তালিকাভুক্ত) ঘৃণা করতেন। একবার তিনি রাজার মনে কামসালুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করার উদ্দেশ্যে রাজার কাছে মিথ্যে করে বলেন যে এই কামসালুরা রাজার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। রাজা কমসালুদের গর্দান নেওয়ার আদেশ দিলেন। কামসালুদের অল্প কয়েকজন যাঁরা সে যাত্রা বেঁচে গেলেন, তাঁরা তাঁদের জীবিকা হারিয়ে বনেজঙ্গলে আশ্রয় নিলেন। সেখানে, তাঁরা মৃত প্রাণীদের চামড়া দিয়ে খেলনা তৈরি করতে শুরু করেন, এবং ক্রমশ এর থেকেই তাঁদের পুতুলনাচের লোকশিল্পটি বিকাশিত হয় এবং জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে তাঁদের শিল্পের মাধ্যমে অনুষ্ঠান পরিবেশনা করতে শুরু করেন। তাঁদের এই শিল্পে আগ্রহী হয়ে অন্যান্য বর্ণের মানুষও শিল্পটি রপ্ত করেন। ছয় মাস ধরে রামায়ণ পালা পরিবেশন করার সময় তাঁরা ওই ব্রাহ্মণ এবং রাজাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে প্রাসাদ পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ খনন করেন তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হিংসার প্রতিশোধ নিতে। তাঁদের পালা অনুষ্ঠানের শেষ দিনে যখন রাম রাবণকে বধ করেন, তখন তাঁরাও রাজা এবং ব্রাহ্মণকে হত্যা করেন। এর পর তাঁরা এই শিল্পটি ত্যাগ করেন এবং সেইসব মানুষদের হাতে ন্যস্ত করেন যাঁরা উৎসাহ এবং কৌতূহল নিয়ে এটা শিখেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে এই শিল্পধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা আর্যক্ষত্রিয় নামে পরিচিত হলেন।”