“আমরা একবার মোটে জল পেয়েছি, যেখানে কিনা সেচের প্রয়োজনে আমাদের জন্য তিনবার বরাদ্দ। মোট বরাদ্দের দেড় ভাগ পেয়েছি বলা যায়, কিন্তু প্রথমবারের জল বিনা বিজ্ঞপ্তিতে খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়া হয়,” জানান প্রশান্ত নিমসে। তিনি নিজে নান্দুরগাঁওয়ের কৃষক, এই গ্রামটিতে গঙ্গাপুর বাঁধের বাঁদিকের জলাধার থেকে জল দেওয়া হয়। নিমসে আঙুর, ডুমুর এবং এইরকম অন্যান্য হর্টিকালচারাল শস্য ফলান; তিনি বলেন তাঁর জমিতে নির্মিত বিয়েবাড়ির জন্য ভাড়া দেওয়া ঘর থেকেই তিনি ভদ্রস্থ আয় করতে সক্ষম হয়েছেন। নাসিক শহরের সীমানার মধ্যে তাঁদের গ্রামটি চলে আসার ফলে, তাঁর বিয়েবাড়ির জন্য ভালোই চাহিদা আছে। “আমি না হয় বেঁচে গেছি, কিন্তু যাঁরা পুরোপুরিভাবে চাষাবাদের উপর নির্ভরশীল, তাঁরা শেষ হয়ে গেছেন।”
নদীপথের নিম্নবর্তী অঞ্চলের চাষি বাসুদেব খাতে আমাদের জানান, “আঙুর শস্যের বিপুল ক্ষতি আমাদের যেন মেরুদণ্ডটাই ভেঙে দিয়েছে। খরার মরশুমে জলের অভাবে শস্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। আঙুর ফলাতে পারলেও তার গুণাগুণ এবং স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। মনে রাখবেন, একর এবং বছর প্রতি ১০০টি শ্রমদিবসের সমান পরিশ্রম দিতে হয়েছে এই চাষের পিছনে। ৪০,০০০ একর জমির শস্য ধ্বংসের মুখে, যার অর্থ শ্রমের চূড়ান্ত সঙ্কট, প্রায় ৩০ লক্ষ কর্মদিবস নষ্ট। এখানে বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল – মূলতঃ মারাঠওয়াড়া, এছাড়া লাতুর, বীড়, ঔরঙ্গাবাদ, ওসমানাবাদ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে কাজের জন্য শ্রমিকেরা আসেন।” শস্যের ক্ষতি হওয়ার ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ধাক্কা খায়, যার ফলস্বরূপ মারাঠওয়াড়ার হাজার হাজার পরিবার চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়।
ইতিমধ্যেই সারা রাজ্য জুড়ে বর্ষা নেমে গেছে। কিন্তু, কৃষক, কৃষিজীবী শ্রমিক এবং কৃষির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য মানুষেরা জানেন বর্ষার বৃষ্টি ভালোমতো হলেও, এই বিপুল ক্ষতি ভালো বর্ষার সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে না। ফটোগ্রাফার-পুরোহিত আকোলকরের কথায়, “এতে হয়তো কিছুটা স্বস্তি আসবে, কিন্তু ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকা এই দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট এত সহজে চলে যাবে না।”
নাসিক জেলার সেচ দপ্তরের অধীক্ষক ইঞ্জিনিয়ার পি. বি. মিসাল অবশ্য সমস্যাটি নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “মহারাষ্ট্রে আমাদের কিন্তু কখনই কোনও চিরজীবী / বহুবর্ষজীবী নদী ছিল না। বিগত ২০ বছর ধরে ভূগর্ভস্থ জলসম্পদে একটু বেশিরকম হ্রাস হতে দেখা গেছে। কৃষির প্রয়োজনে খুব বেশি পাম্পিং করে জল তোলা হয়েছে। নাসিক শহরের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়ে প্রায় ২০ লক্ষের কাছে পৌঁছে গেছে, যার মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা তিন লক্ষেরও বেশি। জমি ব্যবহারের প্রথাগত রীতিতেও ব্যাপকভাবে পরিবর্তন এসেছে। শহরটিকে ঘিরে থাকা সবুজ বনানী তথা মাঠগুলির বেশিরভাগই এখন কংক্রিটে রূপান্তরিত হয়েছে।” মিসালের মতে, বর্ষা এখন অনেক বেশি খামখেয়ালি হয়ে উঠেছে; যদিও বৃষ্টিপাত সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ থেকে অবশ্য এটা বলা যায় না যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণে সেই অর্থে হ্রাস হয়েছে। অধ্যাপক মাধব গাডগিলের মতো পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে মহারাষ্ট্রে চিরজীবী নদী ছিল। কিন্তু এই নদীগুলিকে “খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঋতুনির্ভর নদীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে।”
এখান থেকে ঘুরে ফিরে প্রশ্ন ওঠে মহারাষ্ট্রের এই বিপুল জল সঙ্কটে মানুষের ভূমিকা কতখানি তাই নিয়ে। ত্রিম্বকেশ্বরের জল সংক্রান্ত সমস্যাগুলি, পশ্চিম মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার পুরনো মহাবালেশ্বরের কৃষ্ণ নদীর উৎসের জল সংক্রান্ত যে সমস্যাগুলি আমরা প্রত্যক্ষ করলাম প্রকৃতিতে তার মতোই। (এই স্থানেও আমি এবং আমার সহকর্মীরা গত মে মাসে নদীপথ বরাবর যাত্রা করে গিয়েছিলাম: নদীর উৎস তো নয়, যেন শাসকের দুর্নীতির ঘাঁটি!)
আকোলকর আমাদের স্মরণ করান, “মনে রাখবেন নাসিক এখন একটি অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী হিসেবে উঠে এসেছে। এবং এই সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে নানান খাতে বরাদ্দ অনুযায়ী যে জল বিভাজনের রীতি ছিল, সেই ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের, সমস্ত এলাকা জুড়ে একটি বিশাল, অনিয়ন্ত্রিত পানি [জল] বাজার গজিয়ে উঠেছে। এমনকি বর্ষা আশানুরূপ হলেও বৃষ্টিপাত এই পানি বাজারের উপর খুব সামান্যই প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যটনের বাড়বাড়ন্তের জন্য সর্বত্র কংক্রিট, কোথাও এক চিলতে মাটি নেই। জলধারা নির্বিবাদে বয়ে যাওয়ার কোনও পথই আর নেই।”