কিসের উপর ভিত্তি করে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে? অবশ্যই ভারতবর্ষের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে। বিশেষ করে, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত সংবিধানের নির্দেশিকাগুলির উপর নির্ভর করে। সংবিধানের এই অধ্যায়টি “আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাস” এবং “সামাজিক অবস্থা, সুযোগসুবিধা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টা...” বিষয়ে কথা বলে। এই সাংবিধানিক নীতিগুলি এমন “একটি সমাজব্যবস্থার কথা বলে যেখানে জাতীয় জীবনের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভিত হবে ন্যায়।”
এই সংসদীয় আলোচনার আরেকটি ভিত্তি হবে সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক নিরাপত্তা, কাজ, শিক্ষার অধিকার ইত্যাদি। পুষ্টি এবং জনস্বাস্থ্যের মান বৃদ্ধি করে সুস্বাস্থের অধিকার। জীবনযাত্রার মান উন্নত করার অধিকার। পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য সমান কাজে সমান বেতনের অধিকার। মানবিক এবং ন্যায়সঙ্গত কর্মপরিবেশের অধিকার। এইগুলিই হল সংবিধানের প্রধান প্রধান নীতি। ভারতবর্ষের সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার বলেছে সংবিধানের এই নির্দেশক নীতিগুলি আমাদের মৌলিক অধিকারের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিশেষ অধিবেশনের অ্যাজেন্ডা কী হবে? এই বিষয়ে নিম্নলিখিত মতামতগুলি খতিয়ে দেখা যেতে পারে, সংকটময় পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত মানুষজন অবশ্যই এইগুলিকে সংশোধন এবং এখানে আরও নতুন সংযোজন করতে পারেন:
৩ দিন: স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা – ১২ বছর হল স্থগিত রয়েছে। ডিসেম্বর, ২০০৪ থেকে অক্টোবর, ২০০৬ সাল – এই মেয়াদকালে স্বামীনাথন কমিশন পাঁচটি রিপোর্ট জমা দেয় যার উপজীব্য শুধু এমএসপি ছিল না, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয় এই রিপোর্টে আলোচিত হয়েছিল। রিপোর্টে উল্লিখিত কয়েকটি বিষয় ছিল: জমির উত্পাদনশীলতা, লাভপ্রদতা, স্থায়িত্ব; প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিজনিত সমস্যা; শুষ্কভূমি চাষ, ফসলের মূল্য সংক্রান্ত অভিঘাত এবং স্থিরতা - এবং আরও অনেক কিছু। কৃষি গবেষণা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের সর্বতোভাবে বেসরকারিকরণকে ঠেকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এবং আসন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়ের মোকাবিলাও করতে হবে।
৩ দিন: জনগণের সাক্ষ্য। এই সংকটের কবলে পড়ে যেসব মানুষ শিকার হয়েছেন, সংসদের কেন্দ্রীয় হলে দাঁড়িয়ে তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে দেওয়া হোক। তাঁরা কথা বলবেন এবং এই সংকটের স্বরূপ, কেমন করে এই সংকট লক্ষ লক্ষ কৃষিজীবীকে বিপন্ন করেছে ইত্যাদি বিষয়ে দেশের মানুষকে অবহিত করবেন। আর এই সংকট কৃষির পরিসর ছাপিয়ে কেমন করে চারদিকে ব্যাপ্ত হয়েছে, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রের ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণের ফলে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র জনতা শুধু নয়, প্রকৃতপক্ষে সব দরিদ্র মানুষের অবস্থাই সঙ্গীন করে তুলেছে সেসব কথাও বলবেন। সারা দেশ জুড়ে গ্রামীণ পরিবারগুলির ঋণের খাতগুলির মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে চলা খাতটি হল স্বাস্থ্য, সম্ভবত দ্রুততম অথবা দ্বিতীয় দ্রুততম খাত।
৩ দিন: ঋণ সংকট। কৃষকদের মধ্যে ঋণের বোঝায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। মৃত কৃষিজীবীরা বাদেও লক্ষ লক্ষ কৃষক ঋণের বোঝায় জর্জরিত। ফলস্বরূপ, তাঁরা নিজেদের চাষের জমি হারাচ্ছেন। অন্যদিকে, ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সরকারি নীতিই প্রকৃতপক্ষে গ্রামে গ্রামে মহাজনদের ব্যবসার পথ প্রশস্ত করেছে।
৩ দিন: দেশের ব্যাপক জল সংকট। শুধুমাত্র খরার প্রেক্ষিতে এই সংকটকে ভাবলে চলবে না, এই সংকট খরার তুলনায় অনেক বড়। বর্তমান সরকার ‘ন্যায্য মূল্যের’ নামে জলের বেসরকারিকরণের প্রয়াস করে চলেছে। একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে পানীয় জলের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন - এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই জীবনদায়ী সম্পদের বেসরকারিকরণ বন্ধ করতে হবে। একমাত্র এইভাবেই এই মহামূল্য সম্পদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং জলে সকলের বিশেষ করে ভূমিহীন মানুষের সমানাধিকার সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
৩ দিন: মহিলা কৃষিজীবীদের অধিকার। দেশের মহিলা কৃষিজীবীদের জমির মালিকানাসহ অন্যান্য অধিকারের কথা বাদ দিয়ে কিছুতেই কৃষি সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না; খেতে খামারে সর্বাধিক পরিশ্রম করেন কৃষিজীবী মহিলারাই, অতএব তাঁদের সমস্যার কথা সর্বাগ্রে ভাবতে হবে সংকটের মোকাবিলা করতে হলে। রাজ্যসভায় অধ্যাপক স্বামীনাথন মহিলা কৃষকদের অধিকার সংক্রান্ত বিলটি ২০১১ সালে পেশ করেন (২০১৩ সালে তামাদি হয়ে যায়), বর্তমানে, এই বিলটিই প্রাথমিকভাবে এই বিষয়ে আলাপ আলোচনা বিতর্কের জন্য আদর্শ পরিসর হিসেবে কাজ করতে পারে।
৩ দিন: নারী ও পুরুষ উভয়প্রকার ভূমিহীন শ্রমিকদের অধিকার। কৃষি সংকটজনিত দূরাবস্থার কারণে গ্রামগুলি থেকে যে বহুমুখী অভিবাসন হয়েছে তার ফলে এই সংকট এখন আর গ্রামাঞ্চলের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ নেই। এই শ্রমিকেরা যেখানেই অভিবাসিত হয়ে থাকুন না কেন, সেখানকার কৃষিক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের সময় এই ভূমিহীন শ্রমিকদের প্রয়োজন, তাঁদের অধিকার এবং তাঁদের প্রেক্ষাপট যেন অবশ্যই বিবেচিত হয়।
৩ দিন: কৃষি বিষয়ে তর্কবিতর্ক। আগামী ২০ বছরে আমাদের দেশের কৃষির স্বরূপ কী হবে? কর্পোরেট-মুনাফা নিয়ন্ত্রিত এক কৃষি ব্যবস্থা? নাকি সেই কৃষি ব্যবস্থা যা গ্রামীণ সম্প্রদায় এবং পরিবার – যাদের অস্তিত্বই কৃষিনির্ভর - তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে? এছাড়াও কেরালার কুদুম্বশ্রী আন্দোলনের মতো শক্তিশালী সংঘ নির্ভর কৃষি (সমষ্টিভিত্তিক চাষ) ব্যবস্থার মতো চাষের ক্ষেত্রে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাগুলির দৃষ্টান্ত সামনে রেখে এগোতে হবে। এবং সর্বোপরি আমাদের ভূমি সংস্কারের অসমাপ্ত কর্মসূচিটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। উপরের সব তর্কবিতর্কগুলি তখনই প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হবে, যখন সেগুলি আদিবাসী ও দলিত কৃষক এবং শ্রমিকদের অধিকারের দিকটিকে মাথায় রাখতে সক্ষম হবে - এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।
কোনও রাজনৈতিক দলই খোলাখুলিভাবে এই অধিবেশনের বিরোধিতা করবে না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কে এই কর্মসূচি সুনিশ্চিত করবে? দেশের সর্বহারা মানুষ নিজেরাই এই কর্মসূচি পরিচালনা করবেন।