২৬ বছর বয়সে বিয়ে করার পর একার কাঁধে পুরো সংসারটা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন সেলভি। স্বামী ছিলেন বিদ্যুৎ-মিস্ত্রি, রোজগারের কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। সে দৈনন্দিন ব্যয় হোক কিংবা দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ — সবই নিজের স্বল্প আয়ের ভরসায় বহন করতেন সেলভি। মাস ছয়েক আগে, কম্পিউটারে এমএসসির পাট চুকিয়েছে তাঁর ২২ বছর বয়সি বড়ো ছেলে। ২০ বছর বয়সের ছোটো ছেলেটি এখনও চেঙ্গালাপাট্টুর একটি সরকারি কলেজে পড়ছে।
ভগ্নমনস্কতায় আক্রান্ত রুগীরা যাতে চিকিৎসা করান হন, গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে সেই বিষয়ে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করার আগে নিজেই কাউন্সিলিং করতেন সেলভি। তিন বছর ধরে ১০জন রোগীর সঙ্গে এমনটা করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “হপ্তায় একবার করে দেখা করতাম ওদের সঙ্গে। সেশন চলাকালীন আমরা রোগী ও তাঁদের বাড়ির লোকেদের বোঝাতাম যে চিকিৎসা, সুস্থ হওয়ার পরেও ডাক্তারের কাছে যাওয়া, খাদ্যাভ্যাস আর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব ঠিক কতখানি।”
গোড়ার দিকে সামাজিক স্তরে যারপরনাই বৈরিতা সহ্য করতে হয়েছিল তাঁকে। “সমস্যা যে আছে, সেটা কেউ স্বীকার করতেই চাইত না,” জানালেন তিনি, “কিন্তু এটা যে সত্যি সত্যিই অসুখ, আর এসবের চিকিৎসাও যে আছে — সেসব বোঝাতাম ওদের। রোগীর বাড়ির লোকজন রেগে যেত। অনেকে তো তাঁদের অসুস্থ আত্মীয়দের হাসপাতালের বদলে ধর্মীয় স্থানে নিয়ে যেতে চাইতেন। বহুত খাটাখাটনির পর, বারবার গিয়ে গিয়ে হত্যে দিয়ে তবেই চিকিৎসা শিবিরে আসতে রাজি করাতে পেরেছি ওদের। আর যাতায়াতে রোগীর কোনও অসুবিধে হলে ডাক্তারবাবু নিজেই পৌঁছে যেতেন ওদের ঘরে।”
সামাজিক দ্বিধার বাঁধ ভাঙতে, মাথা খাটিয়ে নিজস্ব একটি কৌশল ফেঁদেছিলেন সেলভি। গাঁয়ের প্রত্যেকটা বাড়িতে তো যেতেনই, এছাড়াও যেখানে বহু মানুষের সমাগম ঘটে, সেই চায়ের দোকানে গিয়ে হাজির হতেন। বার্তালাপ চলত ইস্কুল শিক্ষক ও পঞ্চায়েত নেতাদের সঙ্গে। তাঁরাই ছিলেন গ্রামের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র। সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গসমূহের বর্ণনা দিতেন, বোঝাতেন কেমন করে চিকিৎসায় সুফল মেলে, তারপর আন্তরিকভাবে অনুরোধ করতেন — যাতে গাঁয়ে কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হলে সেই খবর তাঁকে দেওয়া হয়। “অনেকেই ইতস্তত করতেন বটে, তবে জনাকয় হয় খবর দিতেন, কিংবা রোগীর বাড়ি চিনিয়ে দিতেন। নির্দিষ্ট সমস্যাটা যে কী, সেটা অনেকেই জানতেন না। শুধু বলতেন যে অমুক লোকটা সন্দেহ-বাতিকগ্রস্ত, তমুক লোকটা বহুদিন ধরে অনিদ্রায় ভুগছে, এইসব।”
কঠোরভাবে অন্তর্বিবাহে আবদ্ধ, স্বগোত্রে বিয়ে করার ঘটনা যেখানে স্বাভাবিক ব্যাপার — এমনই একটি ঘনিষ্ঠ বেরাদরিতে বড়ো হয়েছেন সেলভি, দেখেছেন, কেমনভাবে জন্মগত বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এ পৃথিবীর আলো দেখে অসংখ্য শিশু। তিনি বললেন, এমনটা না হলে মানসিক রোগ ও বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার উপসর্গে যে সূক্ষ্ম তফাতগুলো আছে, সেগুলো এত সহজে ধরতে পারতেন না — ওঁর কাজে এই দক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম।
ওষুধপত্র রোগীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সেলভির। সে স্বাস্থ্যসেবাই বলুন বা ওষুধপাতি, এদেশে কেউ মানসিক রূপে অসুস্থ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবই দিতে হয় নিজের ট্যাঁক থেকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় যে সকল সেবার বন্দোবস্ত করা আছে, তার সুবিধা নিতে ১০ কিলোমিটারেরও অধিক পাড়ি দিতে বাধ্য হন ৪০ শতাংশ রোগী। প্রত্যন্ত সব গাঁয়ে যাঁরা থাকেন, নিয়মিত চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় তাঁদের। আরেকটি বাধা হল রোগীদের সঙ্গে যুক্ত কলঙ্ক, যে কারণে তাঁরা তাঁদের অসুস্থতার উপসর্গের সঙ্গে লড়াই করার পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করে উঠতে ব্যর্থ হন।