সযত্নে লালিত চুল তাঁর – তেল দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে বাঁধা বেণি। অসংখ্য রেখার কাটাকুটি সারা মুখ জুড়ে। পায়ে হাওয়াই চপ্পল আর পরনের খাদির শাড়ি গোড়ালির একটু ওপরে উঠে আছে। সারাদিনের কাজের জন্য প্রস্তুত তিনি, এখন অবশ্য আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন পিননাথ পর্বতশ্রেণি জুড়ে প্রবাহিত, কুমায়ুন অঞ্চলের কোশী নদীর উত্স রুদ্রধারী জলপ্রপাত দেখাতে।
আমরা উত্তরাখণ্ড রাজ্যের বাগেশ্বর ও আলমোরা – এই দুই জেলার সীমান্তে অবস্থিত প্রায় ২৪০০ জনসংখ্যা বিশিষ্ট গ্রাম কৌসানীর মার্চ-এপ্রিল মাসের বার্ষিক উৎসবে অংশগ্রহণ করতে এসেছি। মানুষের কাছে বাসন্তী বেহেন [দিদি অর্থে] বলেই পরিচিত, ৬০ বছর বয়সী বাসন্তী সামন্ত, এই অনুষ্ঠানের একজন বক্তা। অনেক ভাবনাচিন্তা করেই তাঁকে আমাদের দলটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কয়েক বছর আগে কৌসানীর আশপাশে কোশী নদীকে বাঁচানোর জন্য, তিনি একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি ২০০টি দল গঠন করেন, প্রতিটি দলে ছিলেন ১৫-২০ জন মহিলা। ১৯৯২ সালে কোশী নদীর গ্রীষ্মকালীন জল প্রবাহ ছিল ৮০০ লিটার প্রতি সেকেন্ড, ২০০২ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৮০ লিটার প্রতি সেকেন্ডে দাঁড়িয়েছিল। সেইসময় থেকেই সামন্ত ও কৌসানীর মহিলারা নদী সংরক্ষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন।
২০০২ সালে, সামন্ত এই অঞ্চলের মহিলাদের জ্বালানির জন্য জলজ্যান্ত গাছের কাঠ কাটা বন্ধ করতে এবং দীর্ঘ পাতা বিশিষ্ট বাঞ্জ ওক জাতীয় নানান স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। জলের অপচয় বন্ধ করা এবং দাবানল প্রতিহত করার ব্যাপারে মহিলারা এলাকার মানুষের কাছে আবেদন রাখেন। সামন্ত গ্রামের মহিলাদের সংগঠিত করে জোট বাঁধতে অগ্রণী ভূমিকা নেন, গ্রামতুতো ভগিনীদের এই জোট একদিকে যেমন পরিবেশকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে বহু বছর একসঙ্গে সংগ্রাম করার ফলে পরস্পরের জোরে নিজেদের পরিবারের মধ্যেও লড়াই করার সাহস জোটাতে সক্ষম হয়েছে।
এত সবের আগে অবশ্য বাসন্তী সামন্তকে নিজের জন্য লড়াই করতে হয়েছিল।
তাঁর কথায়, “আমার জীবন ঠিক এই পর্বতের মতো - কঠিন এবং চড়াই।” মাত্র ১২ বছর বয়সে, বাসন্তীর বিয়ে হয়ে যায়, তিনি সবে তখন ৫ম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিয়ের পর, পিথোরাগড় জেলার থারকোট গ্রামে তাঁর স্বামীর বাড়িতে চলে যান। তাঁর যখন ১৫ বছর বয়স, তখন তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, স্বামী ছিলেন স্কুল শিক্ষক। “শাশুড়ি আমাকে এই বলে দুষতেন যে আমিই আমার স্বামীকে গ্রাস করেছি!” বাসন্তী বলছেন।





