তবে ৫৫ বছর বয়সী সালিমুনের কাছে বাড়িতে বসে থাকাটা সম্ভব ছিল না মোটেও। বারাণসী থেকে ৮০ কিমি দূরে চন্দৌলি জেলার আমধ্বা চরণপুর গ্রামের এই মানুষটি ২০২১ সালের মার্চে অসুস্থ হয়ে পড়েন। "দেখা গেল যে টাইফয়েড হয়েছে," নিজের কুঁড়েঘরের বাইরে বসে বসে বলছিলেন তিনি, "[প্যাথোলজি] ল্যাবে গিয়ে দেখলাম যে লোকটা ছুঁচ ফুটিয়ে রক্ত নিচ্ছে বটে, কিন্তু পারতপক্ষে আমার ত্রিসীমানায় ঘেঁষছে না। হাত দুটো টান-টান করে ইঞ্জেকশনটা ধরে ছিল। আমি তো মুখের উপরেই বলে দিলাম যে ওর মতো মানুষ আমি ঢের দেখেছি এর আগে।"
ইসলাম ধর্মাবলম্বী সালিমুন বেশ অভ্যস্ত এমনতর ব্যবহারে। "ওই তাবলীঘি জামাতের বিটকেলে কাণ্ডটা না ঘটলে এমনটা হত না, আমি মুসলমান কিনা," মার্চ ২০২০ সালের সেই বিতর্কিত ঘটনাটির কথা মনে করিয়ে দিলেন তিনি। সেই মাসে উক্ত ধর্মীয় সংগঠনটির সদস্যরা একটি সমাবেশে মিলিত হলে কোভিডের হটস্পটে রূপান্তরিত হয় দিল্লির মারকাজ নিজামুদ্দিন। দেখতে না দেখতে ঢাল-তলোয়ার বেঁধে নেমে পড়ে বিশেষ কিছু মানুষ, কোভিডের জীবাণু মুসলিমদের কারণেই ছড়াচ্ছে এই জঘন্য মিথ্যেটার প্রচার শুরু হয় জোরকদমে। ফলত ইউপি তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অমানবিক হেনস্থার শিকার হতে হয় মুসলিমদের।
আমধ্বা চরণপুর যে ব্লকটির অন্তর্গত, সেই নৌগড় এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাজিরা দিতে এলে বেশ জোর-গলাতেই জানান দেন নীতু সিং, ইনি সহযোগ নামক বেসরকারি সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত একজন সমাজকর্মী। "যাতে কর্মীরা জেনে যায় যে আমি কাছেপিঠেই আছি, আর ওমনি সুড়সুড় করে ব্যাটারা শ্রেণি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে রোগীদের চিকিৎসা শুরু করে দেয়," বুঝিয়ে বললেন তিনি, "নতুবা ভেদাভেদ জিনিসটা মাথায় করে তুলে রাখে এরা।" আজ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি নারী স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন নৌগড়ে, স্বাস্থ্যকর্মীরা হাড়ে হাড়ে চেনেন তাঁকে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রসবকালীন কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন সালিমুনের পুত্রবধূ শামসুন্নিসা (২২)। "গলগল করে রক্ত পড়ছিল, কিছুতেই আটকানো যাচ্ছিল না। বড্ডো কাহিল হয়ে পড়েছিল বেচারি," সালিমুন বললেন, "তখন ওই পিএইচসির আয়া দিদি বললেন নৌগড় শহরের সাধারণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (কম্যুনিটি হেল্থ সেন্টার বা সিএইচসি) নিয়ে যেতে।"
নৌগড় সিএইচসিতে শামসুন্নিসাকে পরীক্ষা করে দেখছিলেন একজন সহায়ক আয়া তথা ধাইমা, হঠাৎই শামসুন্নিসার একটি সেলাইয়ে আঘাত লাগে। "যন্ত্রণায় চিল্লিয়ে উঠেছিলাম," বলছিলেন শামসুন্নিসা, "সে মহিলা চড় মারার জন্য হাত ওঠাতে না ওঠাতেই আমার শাশুড়িমা খপাৎ করে ধরে ফেললেন হাতটা।"
সিএইচসির কর্মীরা বলেন যে তাঁরা শামসুন্নিসার চিকিৎসা আর করবেন না, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নাকি জায়গাই নেই, ওঁর পরিবার যেন তৎক্ষণাৎ অন্য কোন হাসপাতালে যায়। "নৌগড়ের একটা বেসরকারি হাসপাতালে গেলাম বটে, কিন্তু ওরা তো মুখের উপরেই বলে দিল বারাণসীতে চলে যেতে," সালিমুন জানালেন, "মেয়েটার জন্য প্রচণ্ড ভয় লাগছিল, জানেন? গলগল করে রক্ত পড়ছিল, বাচ্চা হওয়ার পর গোটা একটা দিন কেটে গিয়েছিল, একটিবারের জন্যও কেউ চিকিৎসা করতে হাত বাড়ায়নি।"