নিজেদের ১২ একর জমি অতি সামান্য অর্থের বিনিময় ইজারা দিয়ে তিনি সেলাই শিখতে শুরু করেন। তিনি বলছিলেন, “ছোটোবেলায় আমি কিছু কিছু সেলাই করতাম বটে। আমার মনে হল এই কাজটা আমি ঠিক পারব।” সত্যি সত্যিই পেরেছেন। প্রায় ক্রীতদাসের মতো কাজ করতে হয়েছে, তাছাড়া মাল্লাপ্পার নেওয়া ঋণ পরিশোধের বোঝাও ছিল। সেটাও তিনি করেছেন, ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকা আর পোষ্য জীব ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে। এই পুরো সময়টা তিন শিশুকন্যাকে নিয়ে তিনি একা দাঁতে দাঁত চেপে থেকেছেন। বড়ো মেয়ে দুটি এখন স্কুলে ভালোমতোই পড়াশুনা করছে। এক মেয়ে এরই মধ্যে বিজ্ঞানের একটা পরীক্ষায় ৫০-এ ৪৯ পেয়েছে। ওরা ‘যত দূর চাইবে তত দূর’ অবধি লেখাপড়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই পার্বতীর লক্ষ্য।
সেলাইয়ের কাজটা কেন শুরু করলেন? নিজের গ্রামের পরিস্থিতি দেখে তিনি এই কাজ করবেন বলে স্থির করেন। “আমাদের এখানে ৮০০টির মতো পরিবার আছে। প্রায় প্রত্যেকেরই মেয়ে আছে। অতএব, একদিকে যেমন সেলাইয়ের কাজ যা পাই তা করে রোজগার খুব সামান্য হলেও, অন্যদিকে সেলাই শেখাবার যথেষ্ট সুযোগ এখানে আছে। যদি এখানকার দশ শতাংশ পরিবারও নিজেদের মেয়েদের সেলাই শেখাতে চায়, তাতে আমি যত সংখ্যক ছাত্রী পাব, তা একা সামলাতেই পারব না।” তাই খানিক সাহায্য নিয়ে আরও দুটি মেশিন কিনে তিনি তাঁর ‘স্কুল’ খুলবেন বলে প্রস্তুত হয়েছেন। “মেয়েগুলো যতক্ষণ স্কুলে থাকে, আমি অনেক বেশি কাজ করতে পারি। ওরা ফিরে এলেই হুলুস্থুল শুরু হয়ে যায়,” তাঁর নালিশ।
“আশ্চর্য সাহস তাঁর,” অনন্তপুর গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার পরিবেশ বিভাগের অধিকর্তা, মাল্লা রেড্ডি বললেন। তিনি যে সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত, মেয়েদের শিক্ষায় সেটি সহযোগিতা করে। “তিনটে বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে একা হাতে সব অসুবিধার মোকাবিলা করা সহজ কাজ নয় মোটেই। অথচ, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। নিজের কর্তব্য সম্বন্ধে তিনি খুব সজাগ। মেয়েদের মধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। ওরাই তাঁর প্রেরণা।”
এই জেলাতেই আছেন আরও অনেকে কৃষ্ণাম্মা আর পার্বতী, তাঁরা হয়তো পরিস্থিতির মোকাবিলা ততটা শক্ত হাতে করে উঠতে পারেননি। অনেকে জমি-জিরেত বেচে দিয়েও দেনা শোধ করতে পারেননি। অনেকে অসহায় চোখে নিজের সন্তানদের স্কুলছুট হতে দেখেছেন। অনেকে নামমাত্র মজুরিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ তাঁরা জাতীয় গ্রামীণ কর্ম সুনিশ্চয়তা প্রকল্পের মাধ্যমে কোনও কাজ পাননি। দেশের অন্যান্য প্রান্তে, কৃষি-সংকটের কারণে আত্মহত্যার করাল গ্রাসে পড়া পরিবারগুলির মতোই এই পরিবারগুলিও ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও যাতনার শিকার। অনেক পরিবার একই সংকটের কারণে প্রথমবারের পর দ্বিতীয়বার আত্মহত্যাও দেখতে বাধ্য হয়েছেন। দেশব্যাপী এক লক্ষাধিক পরিবার এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে যাতে পরবর্তী প্রজন্ম একটু স্বস্তিতে বাঁচতে পারে। যে কথাটা পার্বতী বলেছিলেন, “এখন সবই সন্তানগুলোর মুখ চেয়ে। আমাদের সময় তো পার হয়ে গেছে…”
এই প্রতিবেদনের একটি সংস্করণ সর্বপ্রথম ২০০৭ সালের ২৬শে জুন দ্য হিন্দু সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
অনুবাদ: চিলকা