লিম্বডি রাজপথ থেকে একখান পিচ-ঢালা পথ বেরিয়ে ১০-১২ কিলোমিটার দূর মোটা টিম্বলা গাঁয়ের দিকে গেছে। গ্রামের একপ্রান্তে দলিত জাতির তাঁতিরা থাকেন, পাড়ার নাম বনকারবাস। খট-খটাং-খট...খট-খটাং-খট...সরু সরু গলিঘুঁজি জুড়ে ছুটতে থাকা মাকুর প্রতিধ্বনি, দুধারের টালিছাওয়া বাড়িগুলো সেকেলে, খানকতক খড়ে ছাওয়া কুঁড়েও আছে। থেকে থেকে তাঁতযন্ত্রের আওয়াজে যতিচিহ্নের মতন শোনা যাচ্ছে লোকজনের গলা। কান পেতে শুনলে মেহনতের শব্দও ঠাহর হবে। আরেকটু মন দিয়ে শুনলে এখানকার এই ইঁদুরকলের পদাবলির মাঝে আফসোসের ক্ষীণ ধুয়োও কানে আসবে, ঠিক যেন রেখা বেন বাঘেলার আখ্যানের গৌরচন্দ্রিকা।
“তখন সবে তিনমাস হয়েছে ক্লাস থ্রিয়ে উঠেছি। লিম্বডির একটা ছাত্রাবাসে থাকতাম, স্কুলের প্রথম পরীক্ষার পর সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছি কিনা মা বলে দিলো যে আমায় আর পড়তে হবে না। আমার বড়দা গোপাল ভাইয়ের মদত করতে হবে। রুজিরুটির তাগিদে বড়দাও গ্র্যাজুয়েশনের ঠিক আগে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আমার দুই দাদার [শিক্ষাদীক্ষার] খরচা চালানোর সামর্থ্য আমার বাড়ির লোকের কোনদিনও ছিল না। এভাবেই আমি পাটোলার কাজ শুরু করি।” দারিদ্র্যের শানানো আর পাঁচটা জিনিসের মতো রেখা বেনের কথাগুলোও সোজাসাপ্টা আর তীক্ষ্ণ। বছর চল্লিশের রেখা বেন গুজরাতের সুরেন্দ্রনগর জেলার মোটা টিম্বলা গাঁয়ের ওস্তাদ বুনকর।
“আমার বরটা পাঁড় মাতাল। মদ, জুয়া, পানমশলা, তামাক, সবকিছুর নেশায় বুঁদ,” বিয়ের পরের জীবন থেকে আরেক খি সুতো টেনে বলে উঠলেন তিনি। এ জীবনে দুঃখেরই ঠাসবুনন। হামেশাই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপমায়ের কাছে চলে যেতেন রেখা বেন, কিন্তু ওঁরা মেয়েকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার ফেরত পাঠাতেন। অসহ্য ঠেকলেও মুখ বুজে সব সহ্য করতেন। “লোকটা নিতান্তই বদচরিত্রের ছিল,” জানালেন তিনি।
“প্রায়ই আমার গায়ে হাত তুলত, এমনকি আমার পেটে বাচ্চা আসার পরেও।” রেখা বেনের কথা শুনলে বোঝা যায়, ক্ষতগুলো আজও কেমন দগদগে হয়ে আছে তাঁর মনের জমিনে। “মেয়েটা হওয়ার পর জানতে পারি যে আমার বর অন্য আরেক সম্পর্কে জড়িয়েছে। ওভাবেই গোটা একটা কেটে যায়। ঠিক তখনই [২০১০ সালে] গোপাল ভাই দুর্ঘটনায় মারা যায়। ওর পাটোলার কাজগুলো সব মুলতুবি হয়ে পড়েছিল। বড়দা যে বেনিয়ার থেকে কাঁচামাল নিয়েছিল, তার কাছে টাকা বাকি ছিল। তার পরের পাঁচটা মাস আমি বড়দার ফেলে যাওয়া কাজ খতম করব বলে ওখানেই [বাবা-মায়ের বাড়িতে] থেকে যাই। তারপর বর আমায় নিতে আসে,” রেখা বেন বললেন।
বাচ্চার দেখভাল আর মরমে মরতে মরতে আরও কয়েক বছর কেটে যায়, বোধহয় নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিতেন ‘ভালো আছি’ এই বলে। “শেষমেশ মেয়েটা সাড়ে চার বছরের হতেই এ নরক যন্ত্রণা আর সহ্য না করতে পেরে বরের ঘর ছাড়লাম,” রেখা বেন বাঘেলা জানালেন। স্কুল ছাড়ার পর পাটোলা বুননে সেই যে হাত পাকিয়েছিলেন, শ্বশুরবাড়ি থেকে মুক্তি পাওয়ার সেটা কাজে আসে। দারিদ্র্যের দংশনে মলম হয়ে দেখা দেয় পাটোলাশিল্প, নতুন ভাবে এক মজবুত জীবন শুরু করার সুযোগ মেলে।


















