দক্ষিণমুখী এই যাত্রা শুরু করার আগে কেউ একজন মাটিতে একটা নারকোল আছড়ে ফেলে ভাঙেন, আর তারপরেই ২৪ বছর বয়সি ট্রাক্টর চালক মহাদেব তিড়কে, ইঞ্জিন চালু করেন। রাত তখন ১০টা। তিড়কে নিজেও বোডখারই মানুষ। তিনি ১৯ বছর বয়স থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়ার কাজ করছেন।
“জয় ভীম,” সত্যভান চিৎকার করেন, আর ট্রাক্টরটা ঝকঝকে তারায় ভরা আকাশের নিচে ঘন অন্ধকার রাস্তায় চলতে শুরু করে। বাতাসে সামান্য শৈত্যের ভাব। মহাদেব একটা পেন ড্রাইভ নিয়ে তাঁর সিটের পিছনে একটা সকেটে লাগাতেই হিন্দি সিনেমার গান বেজে ওঠে উঁচুস্বরে, আর অন্ধকার ভেঙে খান খান হয়ে যায়। বাক্স-বস্তার মধ্যে নিজেদের বসার জায়গা ঠিক করতে করতে ট্রাক্টরে বসা মানুষেরা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের বিদায় জানান।
দুটো ছাগলও উঠেছে ট্রাক্টরে। “বেলগামে দুধ খেতে কাজে লাগবে,” ট্রাক্টরের ঝাঁকুনির মধ্যে ছেলে অর্জুনকে কোলে বসাতে বসাতে শোভা বলেন। আশপাশ দিয়ে গাড়ি আর ট্রাক চলে যায়। খোলা ট্রেলারের উপর দিয়ে হিমেল বাতাস বইতে শুরু করলে শোভা তাঁর ব্যাগ থেকে অর্জুনের জন্য মাঙ্কি ক্যাপ বার করেন আর নিজের কানের চারদিকে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে নেন। সহযাত্রীরাও বাক্সপ্যাঁটরা থেকে ছেঁড়াখোঁড়া কাঁথাকম্বল বার করে শীতের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কয়েকজন আবার এরমধ্যেই দিব্যি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
স্টিয়ারিং-এ বসা মহাদেবের গলায় মাফলার, পরনে পুরোহাতা শার্ট। রাস্তার আলো খুব একটা জোরালো না হলেও তিনি তারই মধ্যে আঁকাবাঁকা পথ ধরে ট্রাক্টর চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। ভোর ৩:৩০ নাগাদ তাঁকে একবার থামতে হয়। “এটা খুবই চাপের কাজ,” তিনি লম্বা শ্বাস ফেলে জানান, “এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বোজার উপায় নেই। এতগুলো পরিবারকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার উপর।”
হাইওয়ের ধারে একটা ঢাকা জায়গা দেখতে পাওয়ামাত্র তিনি গাড়ি থামান। একখানা কম্বল বার করে চাতালে বিছিয়ে তার তলায় ঢুকে পড়েন। বাচ্চাকাচ্চা-সহ তাঁর গাড়ির প্রায় ২৪ জন সওয়ারি অবশ্য আগেই ট্রেলারের উপর ঝিমিয়ে পড়েছেন। ঘণ্টা দুয়েক বাদে মহাদেবের গাড়ি ফের চালু হয়।