ইয়াসিন মেলায় এসেছেন ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে - সুদূর উত্তরাখন্ডের উধম সিং নগর জেলার বাজপুর শহর থেকে। অন্যান্য বছর তিনি পর্দা বা সোফার ঢাকা জাতীয় ঘরদোরের সামগ্রী বিক্রি করে এই দশদিনের মেলা থেকে মোট অন্তত ৬০,০০০ টাকা রোজগার করেন। এই বছর কুড়িয়ে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা আয় হয়েছে। “আমার ধার শোধ দিতে হবে। এখানে একটু ভালো ব্যবসা করতে না পারলে আমি শোধ দেব কেমন করে?” নিরাশ শোনায় তাঁকে।
জ্ঞান সিং দরয়াল এসেছেন সমুদ্রতল থেকে ১৪,০০০ ফুট ওপরে অবস্থিত ছাল গ্রাম থেকে। তাঁর দোকানে বিক্রির জন্য রয়েছে হিমালয়ের বিভিন্ন ঔষধি-গাছড়া, মশলা, এবং অধিক উচ্চতায় জন্মানো কালো পাহাড়ি রাজমা। দরয়ালের পরিবার নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস ধরচুলায় থাকে; আর গ্রীষ্মকাল কাটে ছাল গ্রামে, গাছগাছড়া আর মশলা চাষ এবং সংগ্রহ করে। জমিতে যা ফলন হয়, তার অধিকাংশই পরিবারটির খোরাকিতে লেগে যায়। “জড়িবুটি আর মশলা বিক্রি করে আমরা নগদ টাকা পাই,” তিনি জানালেন। “আমাদের গোটা পরিবার এই গাছগাছড়া সংগ্রহে হাত লাগায়, আর এই জাউলজিবি মেলায় এসে ওই দুর্গম এলাকায় পরিশ্রমের দাম পাই।”
এইবছর দরয়ালের বিক্রিবাটায় প্রবল কমতি দেখা দিয়েছে। “লোকজন মেলায় বিশেষ আসছেই না,” তিনি জানালেন। দরয়ালের স্থায়ী কোনও দোকান নেই। জাউলজিবি, মুন্সিয়ারি আর বাগেশ্বরের (সবকটি জায়গাই উত্তরাখন্ডে) অস্থায়ী ছোটো দোকানঘরগুলোই তাঁর নগদ উপার্জনের একমাত্র পথ। কিন্তু তিনি জানান, নোটবন্দির ধাক্কায় সেই সুযোগটুকুও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছে।
মেলায় এসেছেন অর্চনা সিং গুঞ্জিওয়ালও। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০,৩৭০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত গুঞ্জি গ্রামের গ্রামপ্রধান বা মোড়ল তিনি। জাউলজিবিতে বেচার জন্য তিনি ১২,৯৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চিনের তাকলাকোট মান্ডি থেকে গরম জামা ও জ্যাকেট কিনেছেন। এই মান্ডি জাউলজিবি থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার দূরে, যে দূরত্বের প্রায় অর্ধেক পথ বিক্রেতারা পায়ে হেঁটেই অতিক্রম করেন।
“মেলার প্রথম কয়েকদিন তো মনে হয়েছিল আমাদের নিজেদের মধ্যেই জিনিসপত্র বিক্রি করতে হবে,” তিনি জানালেন। “আমার এই বছর মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ বিক্রি হয়েছে।” তবে গুঞ্জিওয়াল আশাবাদী, ডিসেম্বর আর জানুয়ারি মাসে মুন্সিয়ারি আর বাগেশ্বরের মেলায় তাঁর এর চেয়ে বেশি বিক্রি হবে। “হয়তো ততদিনে নগদ টাকার এই সংকটও কিছুটা কমবে।”
নেপালের জুমলা এবং হুমলা জেলা থেকে মেলায় এসেছেন ঘোড়াবিক্রেতারা- এখানে পৌঁছোনোর জন্য ঘোড়াগুলোর সঙ্গে দশদিন পায়ে হেঁটেছেন তাঁরা। এমন একটি বিক্রেতাগোষ্ঠীর আনা ৪০টি ঘোড়া ও খচ্চরের মধ্যে মাত্র ২৫টি বিক্রি হয়েছে। এর আগের বছরগুলোতে মেলায় তাঁদের আনা প্রায় সব ঘোড়া-খচ্চরই বিক্রি হয়ে যেত। ঘোড়ার দাম ৪০,০০০ টাকা, খচ্চরের ২৫,০০০০ টাকা। এই কষ্টসহিষ্ণু প্রাণীগুলো পাহাড়ের জীবনযাত্রার জন্য আদর্শ, এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছে যেসব জায়গায় যাতায়াতের দু’একটি রাস্তাই আছে, সেখানে মালবহনের জন্য এদের কদর অনেক।
“আজ মেলার শেষদিন, এদিকে আমাদের সাতটা ঘোড়াও বিক্রি হল না,” হুমলা জেলারই অন্য একটি ব্যবসায়ী দলের সদস্য নর বাহাদুর জানালেন। “আমরা এই নোটবন্দির ব্যাপারে জানতামই না। জাউলজিবি পৌঁছোনোর পরে আমাদের কপালে লেখা এই দুর্ভোগের কথা জানতে পারি।”