তিনি যে খোদ পুলিশ স্টেশনের সামনেই তাঁর স্ত্রীকে আক্রমণ করছেন, সেটা যেন তাঁর কাছে কোনও ব্যাপারই ছিল না। হৌসাবাঈ পাটিলের মাতাল স্বামী তাঁকে নির্দয়ের মতো পেটাতে শুরু করলেন। স্মৃতির পরত সরিয়ে হৌসাবাঈ বললেন, “মারের চোটে আমার পিঠটা টনটন করছিল। এসব ঘটছিল ভবানী নগরের [সাংলী জেলার] ছোট্ট পুলিশ স্টেশনের সামনেই।” কিন্তু সেইসময় থানায় চারজন পুলিশের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দু’জন। “বাকি দু’জন মধ্যাহ্ন ভোজন সারতে বেরিয়েছিলেন।” তারপর তাঁর উন্মত্ত স্বামী “একটা বড় পাথর তুলে নিলেন। ‘আমি এই পাথর দিয়েই তোকে মেরে ফেলব’, বলে তিনি গর্জন করছিলেন।”
এই কাণ্ডকারখানা দেখে থানার ভেতর থেকে দু’জন পুলিশ তড়িঘড়ি ছুটে এলেন। “তাঁরা আমাদের ঝামেলা মেটানোর চেষ্টা করছিলেন।” হৌসাবাঈয়ের দাদা - যিনি সেসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন – তাঁকে হৌসাবাঈ বলছিলেন যে তিনি নিজে এইরকম অত্যাচারী স্বামীর বাড়িতে আর ফিরতে চান না। “বললাম আমি যাবো না, আমি কিছুতেই যাবো না। আমি এখানেই থাকবো, আপনি আমাকে আপনার বাড়ির পাশে মাথা গোঁজার জন্য একটা ছোট্ট জায়গা দিন। স্বামীর সঙ্গে তার বাড়িতে গেলে নির্ঘাত মরব, তার পরিবর্তে, আমি এখানেই থাকব এবং যেভাবে পারি বেঁচে থাকব... আমি তার আঘাত আর সইতে চাই না।” দাদা অবশ্য বোনের এই কাতর প্রার্থনা কানে তোলেন নি।
পুলিশ এই দম্পতিকে দীর্ঘক্ষণ অনেক পরামর্শ দিয়ে বুঝিয়েসুঝিয়ে, অবশেষে, সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে একটি ট্রেনে তুলে দিলেন। “তাঁরা এমনকি আমাদের টিকিটটাও কেটে আমার হাতে দিয়ে দিলেন। তাঁরা আমার স্বামীকে বলেছিলেন – স্ত্রী তোমার সঙ্গে থাকুক এইটা যদি চাও, তাহলে তার সঙ্গে ভালো আচরণ করো, তার যত্নআত্তি করো। ঝুটঝামেলা কোরো না।”
ইতিমধ্যে, হৌসাবাঈয়ের কমরেডরা থানা লুঠ করে সেখানে সাকুল্যে যে চারটি রাইফেল ছিল, তা তুলে নিয়েছেন; এইকারণেই তো তিনি, তাঁর জাল ‘স্বামী’ এবং ‘দাদা’ মিলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য আক্ষরিক অর্থেই এই মর্মান্তিক নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৪৭ সাল, তাঁর বয়স তখন ১৭, তিন বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে এবং তখন তিনি শিশুপুত্র সুভাষের জননী। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নানান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার জন্য হৌসাবাঈ ছোট্ট সুভাষকে তার এক মাসির কাছে রেখে আসতেন। আজ প্রায় ৭৪ বছর পরেও তিনি জাল স্বামীর উপর যারপরনাই বিরক্ত, এমন জোরে তিনি হৌসাবাঈকে পিটিয়েছিলেন যে তাঁদের কলহ একেবারে আসল ঠেকছিল! তাঁর বয়স এখন ৯১, মহারাষ্ট্রের সাংলী জেলার ভিটা গ্রামে বসে তিনি আমাদের গল্পটি বলছেন। “আমার চোখ আর কান এখন [এই বয়সে] একটা বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবুও আমি সবকিছু নিজের মুখেই তোমাদের বলব।”







