মুম্বাইয়ের একটি ব্যাংকের কাউন্টার। ফাঁকাজায়গাটিতে কি ট্র্যাক্টর এর একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ কোনো এককালে ছিল না?
সমকালীন আরেকটি ঘটনাও খুব উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটি ঘটে পূর্বোক্ত স্থানের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার দূরে ঔরাঙ্গাবাদ শহরে।২০১০ সালে প্রায় হঠাৎ করেই এই শহরটি বিশ্ববিনিয়োগ মানচিত্রে পদার্পন করে। কারণটা ঠিক কি ছিল? জানা যায়, ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে এক দিনে প্রায় দেড়শটি মার্সিডিজ বেঞ্জ (যার দাম প্রায় ৩০-৭০ লাখের মধ্যে) বিক্রি হয়েছিল এক ধাক্কায়। এরই দৌলতে ঔরাঙ্গাবাদ বিশ্ববিনিয়োগ মানচিত্রে জায়গা করে নেয়। এমনকি উইলফ্রেড আলবার, মার্সিডিজ বেঞ্জ-এর ভারত শাখার পরিচালন- অধিকর্তা এই টিয়ার ২ এবং টিয়ার ৩ (২য় এবং ৩য় শ্রেণীর শহর) শহরগুলির অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কুর্নিশ জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই আপাত অর্থনৈতিক “অগ্রগতির”- র পেছনে হাত ছিল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া –র তৎকালীন চেয়ারম্যানের। এই বড়কর্তার আদেশে ‘এস বি আই ঔরাঙ্গাবাদ’ বেঞ্জ ক্রেতাদের ৭ শতাংশ সুদের হারে ঋণ দেয়, তার মানে হিসেব করে দেখা যায় যে মোট ৬৫ কোটি টাকার (১ দিনে ১৫০ টি বেঞ্জ বিক্রি হওার সামগ্রীক ব্যবসা) প্রায় দুয়ের তিন ভাগ শুধু ঋণ ই দেওয়া হয়েছিল, এবং এই ভাবেই বিশ্ববিনিয়োগ মানচিত্রে পদার্পন করেছিল ঔরাঙ্গাবাদ।
অথচ, একই পরিবহন ঋণের আওতায়, হিরাবাঈ এবং তাঁর মত আরো অনেকে সে সময়ে শতকরা ১৫.৯ টাকা সুদে ঋণশোধ করছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, বেঞ্জ ঋণের গ্রাহকরা সবাই ছিলেন এলাহাবাদের অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষ। কেউ শিল্পপতি তো কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার, কেউ আবার ঔরঙ্গাবাদের একজন বর্তমান বিধায়ক।দুই ক্ষেত্রের ঋণগ্রাহকদের মধ্যেকার আর্থিক বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। একদিকে দরিদ্র বানজারারা ট্র্যাক্টর ঋণে সুদ দিচ্ছিলেন ১৫.৯ শতাংশ যা আভিজাত্যপূর্ণ মার্সিডিজ বেঞ্জের জন্য ধার্য সুদের প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্ববিনিয়োগ মানচিত্রে মার্সিডিজ বেঞ্জের বিক্রীর সংখ্যা ঔরাঙ্গাবাদ তথা ভারতকে যে কৌলীন্য দিতে পারে তা তো আর ট্র্যাক্টর পারেনা। তাই বোধহয় এই বৈষম্য। বেঞ্জ ক্রেতাদের মধ্যে দলিত বা আদিবাসীর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। অপরদিকে ট্র্যাক্টর ঋণগ্রাহক দের মধ্যে দলিত বা আদিবাসীর সংখ্যাই বেশী।
আমরা যখন এই ট্র্যাক্টর ঋণ সংক্রান্ত ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিলাম,তখন এক ঋণগ্রাহকের খোঁজ পাই যার নাম বসন্ত দলপত রাঠোর। ইনি ট্র্যাক্টর ঋণ এর নামে ৭.৫ লাখ টাকা শোধ দিয়েছেন। আরেকজন - নাম অমর সিং রাঠোর। ইনিও বানজারা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংকের কাছে তার ঋণ রয়েছে প্রায় ১১.১৪ লাখ টাকা এবং এখনো তিনি একটি কিস্তিও দিয়ে উঠতে পারেননি। ব্যাঙ্ক থেকে ঠিকানা নিয়ে খোঁজ করতে গেলে ওই এলাকার মানুষরা আমাদের ব্যাংকের লোক ভেবে বসেন। ফলতঃ, তাঁরা অস্বীকার করেন যে অমর সিং নামে সেখানে আদৌ কেউ থাকেন। অনেক চেষ্টার পর আমরা এই অমর সিং-এর বাড়ি খুঁজে বের করি। যা দেখি তাতে অনেক অঙ্ক কষলেও এই বাড়ির আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় শূন্য এবং বলাই বাহুল্য সেখানে কোনো ট্র্যাক্টর ছিল না। অনেকসময় দেখা যায় অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা গরীব মানুষদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তাদের নামে ঋণ নিয়েছেন। এরকম কিছুই হয়তো ঘটে থাকবে এক্ষেত্রেও। জানা গেছে শুধু কন্নড়-এই ধরনের একাউন্ট-এর সংখ্যা ৪৫ টির বেশী। বাকি ব্লক ও ব্যাঙ্কে খোঁজ নিলে এধরনের উদাহরণের অভাব হবেনা। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলি কি ব্যবস্থা নেয় ?
তুলজাপুরকর জানিয়েছেন, " এসব ক্ষেত্রে একাউন্ট গুলি চালুই থাকে। হিসেব করলে এই ফেরত না পাওয়া টাকার পরিমাণ কোটি ছড়িয়ে যাবে। বাইরে থেকে দেখলে পরিশোধিত ঋণের টাকার পরিমাণ আসল ঋণের দ্বিগুণ হলেও যথাযথ মূল্যায়ণ নেতিবাচক কথাই বলে।" আবার অনেক সময় ক্রেতারা দালাল এবং গাড়ি বিক্রেতাদের মাঝে পড়ে প্রতারিত হন। যেমন ব্যাঙ্ক থেকে এই ট্র্যাক্টর ঋণের খাতে যে টাকা দেওয়া হয় তা ট্রাক্টরের সাথে ট্রলি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক যন্ত্র কেনার জন্য। কিন্তু ক্রেতারা শুধু ট্রাক্টরটিই হাতে পান। বাকি টাকা দালাল ও বিক্রেতার পকেটস্থ হয়।
যদিও মার্সিডিজ বেঞ্জের ক্ষেত্রে দেওয়া ঋণ শোধ না করতে পারার ঘটনাও যে একদম নেই তা নয়। মার্সিডিজ বেঞ্জের ক্ষেত্রে যে ঋণ দেওয়া হয়েছিল তার সুদের হার ছিল নগণ্য। যার সুযোগ নিয়ে সেই অঞ্চলের ধনীরা এই দামি গাড়ি গুলি কেনেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে গাড়িগুলি কেনার পর থেকে এখনো অবধি দুই থেকে তিনবার বিক্রি হয়ে গেছে। অনেকেই আবার সহজ ঋণ এবং কম দামের সুযোগ নিয়ে, পরে দাম বাড়লে, আবার এক-ই গাড়ি বিক্রি করে মোটা মুনাফা রেখেছেন।
পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে দেখা যায় ২০০৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্তভারতে ট্র্যাক্টর বিক্রির পরিমাণ তিনগুণ বেড়েছে এবং সাথে সাথে বেড়েছে ট্র্যাক্টর উৎপাদনের সংখ্যাও। শুধুমাত্র ২০১৩ সালে ৬,১৯,০০০ টি ট্র্যাক্টর উৎপাদন হয়েছে। যা সারা বিশ্বের উৎপাদনের নিরিখে প্রায় এক তৃতীয়াংশ। অনেকেই এই ট্র্যাক্টর উৎপাদন ও তার বিক্রিকে গ্রামোন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে বা ভারতের গ্রামোন্নয়নের ব্যারোমিটার হিসেবে পরিগণিত করেন। অবশ্যই কিছু মানুষের আর্থিক সুসঙ্গতি এই বৃদ্ধির পেছনে মদত দিয়েছে। তবে এই আপাত উন্নয়নের পারদ বেড়ে ওঠা-র মূল কারণ হল যেনতেন প্রকারে লোণ-স্কিম বিক্রি করা; এটা না দেখে যে লোণ-গ্রাহকের শোধ করার ক্ষমতা আদৌ আছে কিনা। ঋণে- ডুবে- যাওয়া উন্নয়ন তাৎক্ষণিক সমৃদ্ধির বিজ্ঞাপন হলেও তা আখেরে অতি বিপজ্জনক। এদেশের “আর্থসামাজিক এবং তফশিলি-ভুক্ত জাতি” পরিসংখ্যান বলে সর্বাধিক উপার্জনকারী সদস্য যার মাসিক ১০,০০০ টাকা আয়, গ্রামাঞ্চলে এরকম বাড়ীর সংখ্যা ৮ শতাংশের ও কম। আর যেসব ঘরে ট্র্যাক্টর আছে তার সংখ্যা আবার এই ৮ শতাংশের ও নিচে। তাও কিছু কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে ট্র্যাক্টর বিক্রির হার দেখে ভারতীয় গ্রামীণ অবস্থার নাড়ী বোঝা যায়! ফলে এখন ঔরাঙ্গাবাদের ডিলাররা যখন বলছেন যে সামগ্রিক ট্র্যাক্টর বিক্রির হার ৫০ শতাংশ কমেছে তখন এই অর্থনীতিবিদ – রাই আবার গেল গেল রব তুলছেন।
একথা অনস্বীকার্য যে মার্সিডিজ বেঞ্জ একটি বিলাসদ্রব্য, অন্যদিকে ট্র্যাক্টর একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্র। কিন্তু ২০০৪-১৪ এই পরিসরে, দ্রুত গ্রামীণ বিকাশের চিহ্ন হিসেবে ঢালাও ঋণ দিয়ে ট্র্যাক্টর বিক্রির ঘটনা, আর, এক দিনে ১৫০ টি মার্সিডিজ বিক্রী করে পৃথিবীর মানচিত্রে ঔরাঙ্গাবাদের নাম বিশেষভাবে চিহ্নিত করার ঘটনা -- এ দুইই সমান অর্থহীন। মাথাপিছু বাৎসরিক ৬৪,৩৩০ টাকা আয়ের হিসেবে মারাঠওড়া এখনো মহারাষ্ট্রের যেকোনো অঞ্চলের থেকে পিছিয়ে। মহারাষ্ট্রের বাকি জায়গার তুলনায় এই আয় ৪০ শতাংশ কম আর মুম্বাইয়ের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম।
ইতিমধ্যে আরও এক নতুন রকম দেউলিয়া অবস্থার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। খননকার্যে ব্যৱহৃত যন্ত্র কেনারও একটা প্রবণতা লক্ষ্যকরা গেছে এবং মহারাষ্ট্র সরকারও এই যন্ত্র ব্যবহারের পক্ষে পরোক্ষ মদত দিচ্ছে।
ঔরাঙ্গাবাদ জেলার খুলতাবাদ অঞ্চলের কন্মট্রাক্টর হাজি আকবর বেগ যিনি এই অঞ্চলে মিউনিসিপাল কাউন্সিলের প্রাক্তন সচিব ও ছিলেন, জানালেন যে, "অগণিত মানুষ প্রচুর টাকা হারিয়ে দেউলিয়া হতে চলেছে। আমারএই ছোট্ট শহরে যেখানে সর্বসাকুল্যে ১৯,০০০ বাসিন্দা, সেখানেই অন্ততঃ ৩০টি জে. সি. বি.(জে সি বাম্ফোর্ড এক্সকাভেটর বা জে সি বাম্ফোর্ড খনন যন্ত্র) আছে। বাকি রাজ্য জুড়ে আরও এরকমকত আছে কে জানে। যেহেতু, এগুলি 'জলযুক্ত শিবর অভিযান যোজনা' (জল সংরক্ষণ যোজনা)- র মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তাই প্রচুর মানুষ লোভে পড়ে ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং সংস্থা থেকে প্রচুর টাকার ঋণ নেন এবং জে. সি. বি. ক্রয় করেন যেগুলির এক একটির দাম ২৯লক্ষ টাকা। আমিই প্রথম এখানে জে. সি. বি. কিনি। কিন্তু আমি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ না নিয়ে আমার আগেকার প্রচুর যন্ত্রপাতি বিক্রি করে ও পরিবারের সদস্যদের থেকে ধার করে এই টাকার জোগাড় করেছিলাম। ঋণের কিস্তিএবং উচ্চ পরিচর্যার খরচের পরও হাতে কিছু টাকা রাখতে হলে মাসে প্রায় ১ লক্ষ টাকা উপার্জন দরকার। সেটা এই সময়ে হয়তো কিছুটা সম্ভব। কিন্তু বর্ষা শুরু হলে সেটা সম্ভব না। ৩০ টা তো দূরের কথা, শহরের ৩টি জে.সি.বি.ও ভালোভাবে কাজে লাগবে না তখন। তখন কি হবে? খেতখামারীর সাথে কোনোভাবে যুক্ত না থাকা লোকেরাও পক্লেন নামে আরেকটি কোম্পানি – র এক্সকাভেটর এর জন্য টাকা ঢালছেন যা অনেকসময়ই জে.সি.বি. এর দ্বিগুণ খরচ - সাপেক্ষ।আমার ধারনা কিছু মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এ চুক্তি পাবেন। হয়তো ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন টিকে থাকতে পারবেন। বাকিরা দেউলিয়া হয়ে যাবেন।"