যে জমিটা বালাইয়া বেচতে চাইছিলেন সেটা ঠিক হাইওয়ের উপরে অবস্থিত, তাই এক একরের জন্য সহজেই ১৫ লক্ষ টাকার কাছাকাছি দাম পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাঁর, জানাচ্ছেন ধর্মারম গ্রামের বাসিন্দারা। এটা বাস্তবায়িত হলে একসঙ্গে তাঁর অনেকগুলো সমস্যার সমাধান হয়ে যেত: ভুট্টার ফলন না হওয়ার কারণে জমা হওয়া দেনা, সুদের জন্য মহাজনদের তাগাদা, আর অখিলার বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তাও।
কিন্তু বালাইয়ার সমস্ত পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যায় যেদিন সরকার ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করার ঘোষণা করে। তাঁর জমির সেই সম্ভাব্য ক্রেতা বেঁকে বসে। “বাবা প্রথমে শান্তই ছিলেন। কিন্তু তারপর নোট নিয়ে যা শুরু হল সেটা দেখে উনি বুঝতে পারেন, আর কেউই তাঁকে টাকা দেবে না [জমির জন্য]। তারপর থেকেই উনি হতাশায় ডুবে যান,” স্মৃতিচারণ করছিল অখিলা।
বালাইয়া তবুও হার মানেননি, তিনি ক্রেতার খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হল অনেকের জন্যই তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চিত পুঁজি রাতারাতি অচল হয়ে গেছিল ওই ঘটনায়। এই অঞ্চলে অনেকেরই একটা চালু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নেই।
নোটবন্দি ঘোষণার এক সপ্তাহ পর ১৬ নভেম্বর তারিখ আসে; ততদিনে বালাইয়া বুঝে গেছেন আগামী বেশ কিছুদিনের জন্য তাঁর জমি কেউ কিনতে পারবে না। সেদিন সকালে নিজের জমিতে গিয়ে ভুট্টার ফসল নষ্ট হওয়ার পর যে সয়াবিনের বীজ বুনেছিলেন সেগুলোর উপর কীটনাশক ছড়ান তিনি। সন্ধ্যায় দেবী মাইসাম্মাকে উৎসর্গ করে খেতে একটি মুরগি বলি দেন আর সেই মাংস বাড়ি নিয়ে আসেন রাতে খাওয়ার জন্য।
বালাইয়ার বাড়িতে মুরগি রান্না হয় শুধু পালা-পার্বণে, নয়তো শিরীষা যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে আসেন। মাংস সবসময় বালাইয়া নিজেই রাঁধতেন। গত বুধবার হয়তো ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ খাওয়াটুকু আনন্দময় হোক। এই যে এক সপ্তাহে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি রাতারাতি ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হল, হয়তো চেয়েছিলেন সেই সপ্তাহটাকে ভুলে থাকতে কিছুক্ষণের জন্য। মাংসের ঝোলে কীটনাশক মিশিয়ে দিয়েছিলেন বালাইয়া। পরিবারের আর কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। “উনি চাননি পরিবারের উপর এই বিরাট [আর্থিক] বোঝা এসে পড়ুক। তাই ঠিক করেছিলেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন,” বলছেন বালাইয়ার এক আত্মীয়।
রাতে খাওয়ার সময় একটাও কথা বলেননি বালাইয়া, শুধু তাঁর ১৯ বছরের ছেলে প্রশান্ত যখন জিজ্ঞেস করে ঝোল থেকে আসা আজব গন্ধটা নিয়ে প্রশ্ন করেন তখন ছাড়া। “সকাল থেকে সন্ধে [কীটনাশক] স্প্রে করেছি। তারই গন্ধ,” একসঙ্গে বসে তাঁদের শেষ খাওয়ার দিনটিতে বাবার বলা কথাগুলো মনে করছিল অখিলা।
পরিবারের ছয় জন সদস্যের মধ্যে চারজন সেদিন ওই মাংসের ঝোল খেয়েছিলেন — বালাইয়া, তাঁর স্ত্রী বালালক্ষ্মী, প্রশান্ত, যিনি এখন বি টেক পড়ছেন, আর বালাইয়ার ৭০ বছরের বাবা গালাইয়া। অখিলা ও তার ঠাকুমা মাংস না খাওয়ায় সেই কালান্তক নৈশভোজের হাত থেকে দুজনের প্রাণ রক্ষা পায়।