মাঠঘাঠ পেরিয়ে, টিলার সারি ছাড়িয়ে, হাঁটতে হাঁটতেই চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছিলাম হাতির পদচিহ্নের খোঁজে।
পায়ের কয়েকটা ছাপ তো ভাতের থালার চেয়েও বড়ো, রীতিমতো গর্ত হয়ে গেছে নরম মাটিতে। পুরোনো ছাপগুলি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে বসেছে। এই ছাপগুলির মালিক যে ঠিক কী কী করেছিল সেটা বাকিদের থেকে জানতে পারলাম: খানিক দুলকি চালে হাঁটা, পেটপুরে খাওয়া, যত্রতত্র মলত্যাগ। ও হ্যাঁ, এসব ছাড়াও আরেকটি জিনিস আছে, খেলাচ্ছলে সে হাতি যা যা উপড়ে ফেলেছে তার ধ্বংসাবশেষ: গ্র্যানাইটের খুঁটি, তারের বেড়া, গাছপালা, ফটক...
হাতির সঙ্গে যদি দূর-দূরান্তের সম্বন্ধ থেকে থাকে, এই ভেবে আমি তেমন কিছু দেখলেই থমকে গিয়ে ছবি তুলছিলাম। পদচিহ্নের একখান ছবি আমার সম্পাদককে পাঠাতেই তিনি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "খোদ হাতির দেখা পেয়েছিলেন বুঝি ওটার সঙ্গে?" আমার একটাই আর্তি, এ হেন আশা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
কারণ, যা শুনলাম, কৃষ্ণগিরি জেলার গঙ্গানাহল্লি জনপদে হাতির দর্শন পেলেও সেই মূর্তিমান যে আপনার মাথায় শুঁড় ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করে কলা চাইবে, এমন আশা করাটাও বোকামি। হয়তো বা মন্দিরের পালিত হাতিরা এসব করে, কিন্তু এরা তো তাদের জংলি তুতো-ভাইবোন। বেশিরভাগ সময়ই খিদের জ্বালায় ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়।
২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তামিলনাড়ুর কৃষ্ণগিরি জেলার মাড়োয়া (রাগি) চাষিদের সঙ্গে মোলাকাত করতে গিয়ে বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই পা রেখেছিলাম হাতির রাস্তায়। ভেবেছিলাম যে আলোচনাগুলো বুঝি কেবলই চাষের অর্থনীতি ঘিরে হবে। খানিকটা তা ছিল ঠিকই, তবে খামারের পর খামার ঘুরে মূলত যে কথাটা কানে এসেছিল বারংবার, তা ছিল: হাতির অত্যাচারের ফলে চাষিরা কেবল বাড়ির লোকের পেট ভরানোর মতো রাগি (ফিংগার মিলেট) চাষ করছেন। তলানিতে ঠেকা দাম (কিলো-পিছু ৩৫-৩৭ টাকা পেলে অন্তত চাষের খরচটা উঠত, কিন্তু প্রতি কিলো ২৫-২৭ টাকার বেশি মেলে না), জলবায়ুর পরিবর্তন, এবং ভয়াবহ অতিবৃষ্টি, সবমিলিয়ে নাকানি-চোবানি খাচ্ছেন কৃষকের দল। এর সঙ্গে রয়েছে হাতির শুঁড় ও গজদন্ত, উপমার কাঁঠালটি তারা চাষির মাথায় ভেঙে খাচ্ছে বটে, তবে ভাঙছে কেবল অসহায় সে চাষির পিঠ।
"হাতিদের তো আর কেরামতির কোনও খামতি নেই, তারগুলো কেমনভাবে চেপে ধরে বেড়া টপকাতে হয়, এটা বেশ ভালভাবেই রপ্ত করেছে ওরা। গাছ ফেলে কেমন করে বিদ্যুতের বেড়া শর্ট-সার্কিট করতে হয়, ব্যাটারা সেটাও জানে," বুঝিয়ে বললেন আনন্দরামু রেড্ডি, "আর দলে বাকি যে হাতিগুলো রয়েছে, সারাটাক্ষণ চোখে চোখে রাখে ওদের।" দেঙ্কানিকোট্টাই তালুকের ভদ্র পালায়ম গ্রামের মানুষ তিনি, পেশায় কৃষক, ডাকনাম আনন্দ। মেলাগিরি সংরক্ষিত অরণ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলেন আমাদের। এটি কাবেরী উত্তর অভয়ারণ্যের একটি অংশবিশেষ।


















