ইতিমধ্যে তাঁর মেয়ে আশা শাড়ির গাঁটরি খুলতে আরম্ভ করে দিয়েছে। তেরো বছরের মেয়ের দিকে ইঙ্গিত করে শান্তি বললেন তাঁরা দুজন একজোট হয়ে কাজ করেন। আশাকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছে, কারণ সুরাট পৌরসভার ওড়িয়া মাধ্যম স্কুলে কেবল ক্লাস এইট অবধি পড়ানো হয়; বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করানোর সাধ্য তার বাবা-মায়ের নেই। মা-মেয়ে মিলে অপেক্ষাকৃত দামি শাড়ি যেইগুলোতে সুক্ষ্ম কাজ বেশি, সেইসব শাড়ির আলগা সুতো ছাড়িয়ে শাড়িপিছু পাঁচ থেকে দশ টাকা রোজগার করেন। তাই ভুলত্রুটির দায় আরও বেশি। শান্তি জানান, “আমাদের ঘরে নিচু ছাদ আর আলো কম, এই কারণে ভিতরে কাজ করাটা খুব সমস্যাজনক। আমরা বাইরে উঁচুতে শাড়ি টাঙিয়ে প্রায় গোটা দিনটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করি। শাড়িতে কোনও দাগ লাগলে, আমাদেরই মজুরি থেকে কাটা যাবে।”
বস্ত্রশিল্পে কর্মরত মহিলারা অত্যন্ত প্রান্তিক একটি গোষ্ঠী এবং সরকারি নথিপত্রে তাঁদের অস্তিত্ব অদৃশ্যপ্রায় হওয়ায় কতজন বাড়ি বসে কর্মরত নারী এই কাজে যুক্ত, তার কোনও পরিষ্কার হিসাব নেই। আজীবিকা ব্যুরো হল একটি বেসরকারি সংস্থা যেটি পশ্চিম ভারতে কর্মরত ওড়িয়া অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করে। সংস্থার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সঞ্জয় প্যাটেলের বক্তব্য, “এঁদের কারও কাছেই লিখিত চুক্তি নেই, ঠিকাদারের নামও জানেননা এঁনারা। অনেকক্ষেত্রেই এঁদের শ্রমকে এঁদের পরিবারের মানুষেরাই কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেন না, এমনকি এঁরা নিজেরাও দেন না, কাজটা যেহেতু বাড়ি বসে করা হয়। সন্তানদেরও এই কাজে জুড়ে নেওয়া হয় প্রত্যেকদিনের ধার্য শাড়িপ্রতি টাকার লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাগিদে। এইজন্যে তাঁরা মালিকপক্ষের সঙ্গে মজুরি নিয়ে কোনও আলোচনাও করেন না।”
গুজরাট ন্যূনতম মজুরি আইন অনুযায়ী (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৯, ছয় মাস অন্তর মজুরির পুনর্মূল্যায়ন করা হয় মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে) অদক্ষ শ্রমিক, যাঁরা রেডিমেড পোশাক বা তার আনুষাঙ্গিক উপাদান উৎপাদন এবং দর্জি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, আট ঘণ্টা কাজের জন্য তাঁদের প্রাপ্য তিনশো পনেরো টাকা। কিন্তু রেনুকা, শান্তি বা ওড়িশার অন্যান্য মহিলারা যাঁরা এই কাজ বাড়ি থেকে করেন, তাঁদের শাড়িপিছু টাকা দেওয়া হয় ন্যূনতম মজুরির থেকে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কম হারে। যে মহিলারা একই সুতো কাটার কাজ কারখানায় বসে করেন, তাঁরা মাসে গড় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা রোজগার করেন এবং তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তামূলক সুবিধা যেমন অতিরিক্ত কাজের জন্য বাড়তি মজুরি বা ওভারটাইম, কর্মীবিমার অধিকার লাভ করেন। অন্যদিকে বাড়িতে কর্মরত কর্মীরা তিন হাজার টাকার বেশি রোজগার করে উঠতেই পারেন না, উপরন্তু কাজ সংক্রান্ত খরচ তাঁরা নিজেরাই বহন করেন।
“দশ বছর আগেও, আমি শাড়ি পিছু দুটাকা করে পেতাম। ঠিকাদারের সঙ্গে দর করতে গেলে সে পাল্টা বলত যে আমি বাড়ি থেকে কাজ করি, আর এই কাজের জন্য নাকি কোনও দক্ষতা লাগে না। কিন্তু বিদ্যুতের বিল এবং বাড়িভাড়ার টাকা তো আমাকেই দিতে হয়,” অভিযোগের সুরে প্রশ্ন তুললেন তিরিশ বছরের গীতা সমল গোলিয়া, তাঁর স্বামী রাজেশ পাওয়ারলুম কর্মী। তাঁরা মিনা নগর থেকে চার কিলোমিটার দুরে বিশ্রাম নগরে থাকেন।