খতিমা শহরে কর্মরত, থারু সম্প্রদায়ভুক্ত ৪১ বছর বয়সী অনিল সিং রানা পেশায় আইনজীবী হলেও জমির অধিকারের বিষয়টি ঘিরে আইনি প্রক্রিয়ায় তেমন আস্থা রাখেন না। তাঁর কাছে জানা গেল, “এই ধরনের মামলা অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে, আমাদের মতো সম্প্রদায়গুলি দলিল দস্তাবেজ সংরক্ষণ করার ব্যাপারে তেমন চৌখস নয়। জমি হারানোর ব্যাপারটা অত সোজাসাপটা নয়। এতে অনেক স্তর, অনেক জটিলতা রয়েছে।”
উত্তরাখণ্ডের প্রায় ৪০টি গ্রামে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন গ্রাম-স্তরের সংগঠনের একটি যৌথ মঞ্চ, ভূমি অধিকার মঞ্চের (বিএএম) সঙ্গে বিগত দশকের সিংহভাগ জুড়ে কাজ করছেন রানা। ২০০৯ সালে, এই মঞ্চ প্রতিষ্ঠার দুবছর পরে, বিএএম রাজ্য সরকারকে ২০০৬ সালের তপশিলি জনজাতি এবং অন্যান্য পরম্পরাগত অরণ্যবাসী (অরণ্য অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান) আইন বলবৎ করার জন্য চাপ দেয়, এই আইন বনবাসী, বননির্ভর সম্প্রদায়গুলির ঐতিহ্যগত অধিকার সুরক্ষিত করে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আলাপ-আলোচনা – মঞ্চের এই কার্যকলাপের ফলে আদিবাসীদের জমির অধিকার সুনিশ্চিত করার লড়াইয়ে কিছুটা সাফল্য অর্জন করা গেছে।
২০১২ সালে কমলা এই মঞ্চের কাছেই উপস্থিত হয়েছিলেন।
“আমরা সহজ-সরল মানুষ। আমরা আদালতের ব্যাপার অত বুঝি না। সামাজিক চাপ অনেক বেশি ফলপ্রসূ,” তাঁর যুক্তি। বিএএম-এর সঙ্গে ফিল্ডকর্মী হিসেবে যুক্ত তাঁর ননদ মীনা দেবীর সহায়তায় কমলা তাঁর নিজের জমি ফেরত চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেন। “আমরা ওখানে গিয়ে তাদের [মহাজনদের] দোকানগুলিতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমার সঙ্গে কথা বলুন, কাগজপত্র দেখান - এইসব দাবি করলাম। আমরা গ্রাম থেকে আরও কয়েকজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
গত বছর তাঁর এই প্রত্যয়ের কাছে হার মেনে জনৈক মহাজন ৩.৫ একর জমি ফেরত দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানিয়েছেন, “যদি এদের সবাই [ঋণগ্রহীতা] এই কৌশল ব্যবহার করে, আমার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং আমার অধিকারে থাকা সমস্ত ভূসম্পত্তিই হাতছাড়া হয়ে যাবে।”
কমলার কনিষ্ঠ পুত্র, ২০ বছরের কেশব পারিবারিক জমির নথিপত্র খুঁজে বের করার জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় করার অভিপ্রায়ে কলেজের শিক্ষা মাঝপথেই ছেড়ে দিয়েছেন, নথিপত্র থাকলে চাপ তৈরি করতে সক্ষম হবেন তাঁরা। এখনও পর্যন্ত তাঁর শ্রেষ্ঠ সাফল্য এটাই যে তিনি বাবার স্বাক্ষর বহনকারী একটি ফাঁকা স্ট্যাম্প পেপার জনৈক মহাজনের কাছ থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।
মঙ্গোলার সংগ্রাম খুব কঠিন কারণ তাঁর লড়াই নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সম্পর্কচ্যূত ফুল বলছেন, “পারিবারিক ব্যাপার যখন ও বাড়ির বাইরের আর পাঁচজনের মধ্যে নিয়ে গিয়েছে, তখন আমিই বা কেন তার সঙ্গে মিটমাট করতে যাব?”
অন্য আরও অনেক মহিলার মতোই, মঙ্গোলাও জমির উপর নিজের চূড়ান্ত অধিকারকে আত্মস্থ করতে সক্ষম নন। এটা তাঁর কাছে কিছুতেই পরিষ্কার হয় না, তাঁর কথায়: “খুব কম লোকেই নিজের কন্যা সন্তানকে জমির ভাগ দেয়। তাদের মনোভাব হল – ঠিক আছে, না হয় একেও কিছু দেওয়া যাক, অবশ্যই তা বাড়ির পুরুষ সদস্যদের সম্মতিক্রমে। আমি নিশ্চিত নই এটাকেই অধিকার বলে কী না।” তবে, তিনি আরও বলেন, “জমি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য। আমরা জমির পুজো করি এবং এই জমির দ্বারাই আমরা পুষ্ট হই। এবং আমার মতো মহিলাদের জন্য, জমি রক্ষাকবচও বটে।”
কমলার মনের মধ্যে অবশ্য এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। লড়াই করে ছিনিয়ে নেওয়া জমিতে দাঁড়িয়ে তিনি যে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলেন, বহুবছর অন্যায়ভাবে জমির বিলিবন্দোবস্ত নীরবে ঘটতে দেখার পর সেই প্রত্যয় তাঁর ভেতরে জন্ম নিয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, “এই জমি আমার। আর আমি তা ফেরত নেবই। এটা আমার নিজের কাছে নিজের অঙ্গীকার। এই লড়াইয়ে যত দিন-ই লাগুক না কেন!”
প্রতিবেদক ভারতের দরিদ্র নাগরিকদের নিরাপদ জমি ও সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত এন/কোর ফাউন্ডেশন প্রদত্ত ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম পুরস্কার বিজয়ী।
অনুবাদ: স্মিতা খাটোর