বিদ্যাপতির এই রোগটির বিজ্ঞানসম্মত নাম ভিসেরাল লিশম্যানিয়াসিস (ভিএল) যা আসলে বেলেমাছির কামড়ে সৃষ্ট একটি বাহক-বাহিত ব্যাধি। বেলেমাছি আদতে একটি মশার এক তৃতীয়াংশ আকারের প্রাণী। অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, আর্দ্র স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, গাছগাছালির প্রাচুর্য আছে এমন পরিবেশে এই জীবাণুটি বিস্তার লাভ করে। রোগটির আক্রমণে মূলত অস্থিমজ্জা, প্লীহা এবং যকৃৎ ইত্যাদি প্রত্যঙ্গ ব্যাধিগ্রস্ত হয়, অনেকক্ষেত্রেই এর প্রভাবে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে ত্বকের ক্ষতগুলির মধ্যে দিয়েও রোগটি প্রকট হয়ে উঠতে পারে। ড্রাগস ফর নেগলেক্টেড ডিজিজেজ ইনিশিয়েটিভ (ডিএনডিআই) নামের একটি বিশ্বব্যাপী সংগঠনের সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, এশিয়ার ভিএল রোগাক্রান্তদের ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই এই ক্ষত বা বিকার দেখা যায়।
লোকহিতকর বেসরকারি সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস বলছে, “বিশ্ব জুড়ে পরজীবীঘটিত রোগগুলোর মধ্যে কালাজ্বর দ্বিতীয় মারণ ব্যাধি... ম্যালেরিয়ার পরেই তার স্থান।” বিগত কয়েক দশকে ভারতে কালাজ্বরের আধিক্য হ্রাস পেলেও, এই দেশ বেশ কয়েকবার কালাজ্বর ‘নির্মূল করার’ নির্দিষ্ট সময়সীমা পূর্ণ করতে অক্ষম হয়েছে - ২০১০, ২০১৫ এবং ২০১৭ সালে।
ভিএল-এর যথাযথ চিকিৎসা না হলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত, আর প্রাণঘাতক না হলেও কালাজ্বর-পরবর্তী চর্মরোগের (পোস্ট কালাজ্বর ডার্মাল লিশম্যানিয়াসিস, বা পিকেডিএল) প্রভাবে গভীর ক্ষতজনিত ভয়াবহ বিকৃতি ঘটে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ আসে সামাজিক কলঙ্ক, লজ্জা, এমনকি পরিত্যক্ত হওয়ার ঘটনাও – রোগের যে প্রভাবটা পড়েছিল বিদ্যাপতির উপর।
“শুরুতে আমার মুখ কালো হয়ে গেল, তারপর আমার থুতনি, তারপর গলা,” সারণে বাবা-মার বাড়িতে বসে বিদ্যাপতি বলছিলেন – রাজ্যের মধ্যে এই জেলাতেই সর্বাধিক কালাজ্বরের ঘটনা ঘটে।
তাঁর স্বামী রাজু ভগত, মরশুমি অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বেঙ্গালুরু শহরে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, বিদ্যাপতিকে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তাঁর পিতামাতার জবরদস্তি সত্ত্বেও স্ত্রীকে মোটেই পরিত্যাগ করবেন না। অথচ রাজু তাঁকে বেঙ্গালুরু নিয়ে যাননি, এমনকি বিহারে তাঁর পিতামাতার বাড়িতেও থাকতে দেননি। “কে তোমার দেখাশোনা করবে? সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বরং নিজের মায়ের কাছে গিয়ে থাকো” তিনি যুক্তি দেন। অথচ ছুটিতে বাড়ি এলেই তিনি বিদ্যাপতিকে ডেকে পাঠাতেন। এই সহবাসের ফলস্বরূপ বিদ্যা দুবার গর্ভধারণ করেন। প্রথমবার, মৃত পুত্রসন্তান প্রসব করেন। দ্বিতীয়বার যে শিশুকন্যাটি জন্মায় সে মাত্র কয়েক ঘন্টা বেঁচেছিল, তাঁর রোগের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সম্ভবত এমনটা ঘটেছিল।