২০০৯-১০ সালের পর থেকে মিনাখাঁ-সন্দেশখালি ব্লকের বিভিন্ন গ্রামের মোট ৩৪ জন শ্রমিক সিলিকোসিসের প্রকোপে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। এঁরা সবাই র্যামিং মাস কারখানায় কাজ করেছেন – নয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময়কালে।
সিলিকায় ভরা বায়ুতে শ্রমিকরা যখন শ্বাস নেন, ওই সিলিকার ধুলো গিয়ে জমা হতে থাকে ফুসফুসের অ্যালভিওলার স্যাক বা বায়ুথলিতে, এবং ফুসফুসকে আঁটো করে দিতে থাকে। সিলিকোসিসের প্রথম উপসর্গ হল কাশি এবং হাঁপ ধরা, তারপর ওজন কমে যাওয়া এবং গায়ের রং কালো হয়ে যাওয়া। ক্রমে ক্রমে শুরু হয় বুকে ব্যথা এবং শারীরিক ক্লান্তি। শেষ পর্যায়ে এসে রোগীকে সারাক্ষণ অক্সিজেন দিতে হয়। সিলিকোসিস রোগীদের মৃত্যু সাধারণত হয় অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে হৃদ্যন্ত্র বিকল হয়ে গিয়ে।
সিলিকোসিস এমন এক ক্রমবর্ধমান পেশাঘটিত রোগ যা সারানোও যায় না, কমানোও যায় না। এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের নিউমোকোনিওসিস বা শ্বাসবাহী পদার্থকণা-ঘটিত রোগ। পেশাঘটিত রোগ বিশেষজ্ঞ ড. কুণাল কুমার দত্ত জানাচ্ছেন, “সিলিকোসিস রোগীদের যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি অন্যান্যদের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি।” এই রোগকে সিলিকো-টিউবারকিউলোসিস বা সিলিকোটিক টিবি বলা হয়।
কিন্তু গত দুই দশকে কাজের চাহিদা এতই বেড়েছে যে এই বিপজ্জনক ক্ষেত্রেও পরিযায়ী শ্রমিকদের আগমন বিরামহীন। ২০০০ সালে গোয়ালদহ গ্রামের ৩০-৩৫ জন মজুর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে কুলটির একটি র্যামিং মাস কারখানায় কাজ করতে গেছিলেন। তার বছর দুয়েক পর মিনাখাঁ ব্লকের গোয়ালদহ, দেবীতলা, খড়িবাড়িয়া, আর জয়গ্রাম গ্রামের দারিদ্রসীমার নিচে থাকা বহু চাষি বারাসতের দত্তপুকুর এলাকার একটি কারখানায় কাজ করতে যান। ২০০৫-২০০৬ সালে সন্দেশখালি ব্লক ১ আর ২-এর সুন্দরীখালি, সরবেড়িয়া, বাতিদহ, আগরহাটি, জেলিয়াখালি, রাজবাড়ি আর ঝুপখালি গ্রাম থেকে আবারও বেরিয়ে যান চাষির দল। এই একই সময় জামুরিয়ার একটি র্যামিং মাস কারখানায় কাজ করতে যান এই ব্লকের আরও কিছু শ্রমিক।
“বল মিল [একধরনের পেষাই যন্ত্র] দিয়ে কোয়ার্জাইট পাথর থেকে মিহি গুঁড়ো তৈরি করতাম, ক্রাশার মেশিন দিয়ে সুজি, চিনি এইসব খাদ্যশস্য গুঁড়ানোর কাজ করতাম,” জানাচ্ছেন ঝুপখালির আর এক বাসিন্দা অময় সর্দার। “এত ধুলো হত যে এক হাত দূরে দেখা যেত না। সারা গায়ে ধুলো জমত,” যোগ করেন তিনি। প্রায় দুই বছর সেখানে কাজ করার পর ২০২২ সালের নভেম্বরে সিলিকোসিস ধরা পড়ে তাঁর। ভারি জিনিসপত্র তোলার কাজ আর করতে পারেন না। “সংসার টানতে কাজ নিয়েছিলাম। রোগে ধরে নিল,” বলছেন অময়।
২০০৯ সালে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আয়লা সুন্দরবনের চাষযোগ্য জমি তছনছ করে যাওয়ার পর আরও বাড়ে অভিগমনের ঝোঁক। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজ্য কিংবা দেশের অন্যত্র কাজ করতে যেতে উন্মুখ হয়ে ওঠে।