PHOTO • Purusottam Thakur

আভূজ মারিয়া মহিলারা ওরছার সাপ্তাহিক হাটে আসছেন

পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরা কষ্টকর। এক রাত ভাতবেদাতে কাটিয়ে পরের দিন সকালে রওনা হয়ে পাহাড়ের ওপর ছোট্ট রাজনাইরি জনপদে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যায়। হাট সেরে তাঁদের গ্রামে ফিরতে গোটা দুটো দিন লাগে, একইভাবে ওরছার সাপ্তাহিক বাজারে আসতে হলেও তাঁদের চড়াই-উতরাই পথে  দুদিন ধরে পায়ে হাঁটতে হয়।

PHOTO • Purusottam Thakur

টানা দুই দিন হেঁটে ঘরে ফেরার জন্য প্রস্তুতি

ফলে এই অবধি পৌঁছতে মধ্য ভারতের ছত্তিসগড় রাজ্যের জঙ্গলাকীর্ণ নারায়ণপুর জেলার ধূলিধূসরিত মাটির রাস্তায় পায়ে হেঁটে আভুজ মারিয়া তফশিলি জনজাতির মহিলাদের ৪০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আসতে হয়। ৪,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে তাঁদের আবাসভূমি আভূজমাধ মূলত মাওবাদী গেরিলা আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই কারণবশত এলাকার মানুষের মনের ভেতর সন্দেহ আর ভয় এমনভাবে গেঁথে আছে যে আমরা তাঁদের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য উদ্ঘাটন করা থেকে বিরত থেকেছি।

PHOTO • Purusottam Thakur

রংবেরঙের পোশাকের মেলা; মাথায় ভারি বোঝা চাপিয়ে পথ চলায় সবিশেষ পারদর্শী মহিলারা

শুরুর দিকে আমরা ওরছার সাপ্তাহিক জমজমাটি হাটের ভেতর বেশ কয়েকজন মহিলার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। পরনে তাঁদের অনন্য পোশাক - গামছার মতো কাপড়  ব্লাউজের ওপর জড়িয়ে রাখা আর লুঙ্গির মতো কাপড় পেঁচিয়ে পরা। রূপো অথবা সাদা ঘাতুর গয়না পরেছিলেন তাঁরা। অনেকেই আবার গায়ে থলের মতো করে বাঁধা কাপড়ে বাচ্চাও নিয়েছেন। বেশিরভাগ পুরুষের গায়ে শার্ট আর কোমরে বাঁধা লুঙ্গি। আর যাঁরা জামা-প্যান্ট পরে আছেন তাঁরা হয় এখানকার কোনও সরকারি চাকুরে, নয়ত বা বহিরাগত, ব্যবসায়ী বা সাদা পোশাকে টহলদারি করা নিরাপত্তাকর্মী।

PHOTO • Purusottam Thakur

অভূজ মারিয়া মহিলারা গায়ে থলের মতো করে বাঁধা কাপড়ে বাচ্চাও বহন করেন বেশিরভাগ পুরুষের গায়ে শার্ট আর লুঙ্গি

মহিলারা আমাদের সঙ্গে প্রথমে খুব দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় কথা বলছিলেন গোণ্ডী ভাষায়। দুজন গোণ্ড তফশিলি জনজাতির ছেলে, যারা আমদের সঙ্গ দিয়ে চলেছে, তাঁরা সাহায্য করছিলেন হিন্দি তর্জমার মাধ্যমে কথপোকথন এগিয়ে নিয়ে যেতে। মহিলারা জানালেন যে তাঁদের ঘরের কাছের বন থেকে পাওয়া বাঁশের ঝাঁটা, চারোলির দানা, তেঁতুল, বিভিন্ন রকমের স্থানীয় কলা, টমেটো ইত্যাদি জিনিস এই হাটে এনে বিক্রি করে থাকেন - সবই পরিমাণে অল্প।

PHOTO • Purusottam Thakur

গায়ের সঙ্গে বাঁধা থলেয় এবং সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে আভূজ মারিয়া মা অল্প কিছু জিনিসপত্র বেচতে এসেছেন

এঁরা সঙ্গে করে রেশমগুটিও এনেছেন বিক্রি করতে। আভুজমাধে প্রচুর পরিমাণে রেশমগুটি পাওয়া যায়; ছত্তিসগড়ের উত্তর দিকের সমতল অঞ্চলে বিলাসপুর, রায়গড় বা কোরবাতে যে বিখ্যাত কোসা সিল্কের শাড়ি তৈরি হয় তার কাঁচামাল হিসেবে এই গুটি ব্যবহার করা হয়।

এসব বেচে মহিলারা সাকুল্যে যে ৫০ টাকা মতো উপার্জন করেন তাই দিয়ে তাঁরা তেল, সাবান, লঙ্কা, নুন, আলু, পেঁয়াজ আর অন্যান্য দকারি জিনিসপত্র কেনেন। বিক্রি করতে নিয়ে আসা জিনিসের মতোই, এসব জিনিসও তাঁরা অল্প পরিমাণে কেনেন যাতে তাঁদের সাধারণ থলেয় সবটুকু ধরে যায়।

ওরছার এই হাটে শুধু মরশুমের সবুজ শাকপাতা, বুনোফল, মূল-কন্দই আসে না, এখানে সস্তার মোবাইল হ্যান্ডসেট, সৌর ল্যাম্প, ব্যাটারি চালিত আলো, টেবিল ল্যাম্প, সার্চ লাইট এবং মাঝেসাঝে মিনি-ইনভার্টারও বিক্রি হয়। তার কারণ মাধের বহু গ্রামেই এখনও বিদ্যুৎ এসে পৌঁছায়নি।

PHOTO • Purusottam Thakur

নগ্ন পায়ে আসা খুচরো বিক্রতারা হাট ঘুরে দেখে নিচ্ছেন এই বিবিধ জিনিসপত্রের মধ্যে তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিস কী কী এসেছে

ওই অঞ্চলের এক স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে জানা গেল যে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলিতে সেলুলার নেটওয়ার্ক না থাকা সত্ত্বেও আদিবাসীরা মোবাইল কেনেন গান শুনতে, ছবি তুলতে অথবা ভিডিও বানাতে আর টর্চ লাইট হিসেবে ব্যবহার করতে।

আভূজমাধ - যার অর্থ অজানা বা রহস্যময় পাহাড় - পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের গডচিরোলি জেলা, দক্ষিণে ছত্তিসগড়ের বীজাপুর জেলা আর পূর্ব দিকে বস্তার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চল ভারতের বিভিন্ন গোষ্ঠীর আদিবাসীদের আবাসভূমি, এদের মধ্যে আছেন গোণ্ড, মুরিয়া, আভুজ মারিয়া, হালবা প্রমুখ। সরকারি ও বেসরকারি হিসেব মোতাবেক আভূজ মারিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

ঝরনা আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি এলাকা এটা, মানুষজন খুব আন্তরিক এবং অতিথিপরায়ণ। কিন্তু এই প্রকৃতির নিবিড়তায় ঢেকে থাকা স্থানে বাস করা আর যাতায়াত করা কিন্ত খুব অনায়াস নয়। শুভজিৎ বাগচী, বিবিসির বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে যিনি বার কয়েক আভূজমাধ গিয়েছেন, তিনি জানাচ্ছেন, “চার মাস এই এলাকা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে বৃষ্টির জন্য। আর কত জন যে এই সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপে মারা যান তার কোনও হিসেব আমরা জানি না ... আর সারা বছর ঘরে ঘরে ম্যালেরিয়া লেগেই আছে। আমি কোনও চালু স্কুল দেখিনি যেখানে শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন; কোনও স্বাস্থ্য পরিষেবা নেই, কখনসখনও প্রাথমিক চিকিৎসা যা হয় তা ওই মাওবাদী মোবাইল স্কোয়াড আর এলাকার হাতুড়ে ডাক্তার দিয়েই।”

PHOTO • Purusottam Thakur

মহিলারা হাটে মূলত হাতুড়ে ডাক্তারদের কাছেই সন্তানদের চিকিৎসা করাতে বাধ্য হন

বাগচী জানালেন, “বিশেষত প্রত্যন্ত প্রান্তিক এলাকাতে পুলিশি কার্যকলাপের জন্য প্রত্যেকেই ভয়েভয়ে দিন কাটান। বড়োই সুন্দর, মনোরম হিসেবে গ্রামগুলির বর্ণনা কেবলমাত্র নৃতাত্ত্বিকদের পুরোনো ডায়রিতেই পাওয়া যাবে, বাস্তবে তেমনটা আদৌ নয়।”

আভূজমাধের রাস্তা শেষ হয়েছে ওরছা এসে। এলাকার স্থানীয় মানুষেরা প্রায়শই ৭০ কিলোমিটার হেঁটে তবে হাটে পৌঁছাতে পারেন। এই বিশাল অঞ্চলের বাজার বলতে একমাত্র এই হাট। এমনকি আদিবাসী মানুষদের এই হাটে এসেই জনসাধারণের জন্য বণ্টন করা রেশনের জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হয় আর স্কুল পড়ুয়া বাচ্চারাও তাদের মিড ডে মিলের চাল-ডাল নিতে আসে এখানে।

PHOTO • Purusottam Thakur

এই বিশাল অঞ্চল জুড়ে বসা একটিমাত্র হাটের পথে মাথায় ভারি বোঝা নিয়ে সার বেঁধে এগিয়ে চলেছেন মানুষজন

এককালে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বেচ্ছাকর্মীদের এই অঞ্চলে চলাফেরার কিছু স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু সরকার থেকে এখন তাঁদেরকেও আদিবাসীদের মধ্যে দানাশস্য বিতরণে বিরত করা হয়েছে।

এই বাজারে আসা বেশিরভাগ শিশুকে দেখেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত বলে মনে হয়। আমরা দেখলাম আঞ্চলিক আদিবাসী আশ্রমের বালিকারা এই হাট থেকে শাকসবজি কিনতে এসেছে। ইউনিসেফের স্বেচ্ছাকর্মীদের দেখা গেল শিশুদের সঙ্গে যারা আভূজধামের প্রত্যন্ত জনপদগুলি থেকে তাদের মা-বাবাদের সঙ্গে এসেছে। মহিলারাও, বিশেষত মায়েরাও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। ইউনিসেফের কর্মীরা জানালেন এই হাটটা আছে বলেই সপ্তাহে অন্তত একটা দিন তাঁরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করবার সুযোগ পান, নচেৎ গ্রামে প্রবেশ করা অসম্ভব ব্যাপার।

PHOTO • Purusottam Thakur

শিশুটি ভাজাভুজি আর মিষ্টির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বায়না করলেও তার মা সেটা মোটেই গ্রাহ্য করছেন না

ওরছা হাটের আরও একটা আকর্ষণ আছে: হাঁড়িয়া ( লোণ্ডা ), সুলফি, তাড়ি, মহুয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মদ বিক্রি হয় হাটের একটা নির্দিষ্ট জায়গায়, তার নাম লোণ্ডা-বাজার।

দিনের শেষে এই হাটে বসেই সবাই মদ খেতে খেতে জিরিয়ে নেন। এখানে অল্পবয়সী আর বয়োজ্যেষ্ঠ - সবাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে পানীয় সেবন করেন আর নিজেদের সুখ-দঃখের কথা আদান-প্রদান করেন।

PHOTO • Purusottam Thakur

দিনের শেষে এই হাটই হয়ে হয়ে ওঠে গ্রামবাসীদের কিছুটা আমোদ-আহ্লাদের ক্ষেত্র

আমার মতো সাংবাদিকেরা এই হাট থেকেই অনেক কিছু জানতে পারেন , যা এখানকার গ্রামগুলোতে ঘুরে ঘুরে জানা সম্ভব নয় – জানতে পারি চাষ তথা ফসলের হালচাল, আমদানি করা পণ্যের কথা; মানুষের ক্রয়-বিক্রয়, বিনিময় এবং সর্বোপরি বেঁচে থাকার মতো নানান ভূমিকায় নিরন্তর সংগ্রামের কথা।

অনুবাদ : শৌভিক পান্তি

Shouvik Panti is from Dhanyakuria, a small town in North 24 Pargana, West Bengal. He is now based in Kolkata. He has a master’s degree in Bangla literature and specialises in digital humanities. He loves searching for timeworn, dusty and priceless books in Kolkata’s famous College Street book stalls.

Purusottam Thakur

Purusottam Thakur is a 2015 PARI Fellow. He is a journalist and documentary filmmaker. At present, he is working with the Azim Premji Foundation and writing stories for social change.

Other stories by Purusottam Thakur