“স্যার, খদ্দের এসেছে। একটু দেখে আসব? কানে ইয়ার ফোন আছে, স্যার, আপনার কথা শুনতে পাব।” নিজেকে আন-মিউট করে দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে মুজাফ্ফর তার মাস্টার মশাইয়ের অনুমতি চেয়ে নিল। কয়েকজন খদ্দের দাঁড়িয়ে আছেন বটে তার ঠ্যালাগাড়ির সামনে। সবজি কিনতে এসেছেন তাঁরা। “টাটকা, তাজা সবজি… সবজি…” বলে আরও একবার হেঁকে নিয়ে সে আবার নিজের স্মার্টফোনে চলতে থাকা বিজ্ঞানের ক্লাসঘরে ঢুকে পড়ল।
আজ ১৫ই জুন মুজাফ্ফর শেখের অনলাইন ক্লাসের প্রথম দিন। “সারাক্ষণই গাড়ির আওয়াজ, খদ্দেরদের দরাদরি শুনতে পাচ্ছি পেছনে। বুঝতে পারছি না কোনটায় মন দেব, - ক্লাসে, নাকি সবজি বেচায়,” বলল ১৪ বছর বয়সী, ক্লাস এইটের ছাত্র মুজাফ্ফর। তার ঠ্যালাগাড়িতে সাজানো বেগুন, বিট, শসা, বাঁধাকপি, আর আরও কিছু তরকারি। উত্তর মুম্বইয়ের মালাডের মালওয়ানি চত্বরে সে সকাল ১০টা থেকে বসে সবজি নিয়ে, এবং সেই সঙ্গে সে অনলাইনে ক্লাসেও ‘পড়ে'।
মুজাফ্ফর এক বন্ধুর কাছ থেকে রোজ কয়েক ঘণ্টার জন্যে তার ফোন ধার চেয়ে নিয়ে ক্লাস করে। তার নিজের স্মার্টফোন নেই। “এই একই সময়ে, আমার দাদা মুবারকেরও ক্লাস চলছে। সে তার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ক্লাস করে। বাবা কাজে গেছে। আমি তো আর দোকান বন্ধ করে দিতে পারি না। তিন মাস পরে এই সবে ১০ তারিখ থেকে কাজ শুরু করতে পেরেছি।”
ইসলাম, ছেলেটির বাবা, আরেকটি ঠ্যালাগাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন জানুয়ারি মাসে। পরিবারের খরচা বেড়েই যাচ্ছিল, তাই রোজগারের আরেকটা উপায় না হলে আর চলছিল না। ইসলামের বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। তিনি ট্রাক ড্রাইভারের খালাসি হিসাবে কাজ করতেন কিন্তু চাকরিটা ছেড়ে দিলেন কারণ রোজগার বড়ই কম ছিল (এই জুন মাসে অবশ্য আবার সেই চাকরিতে ফিরতে হয়েছে তাঁকে)। ছেলেটির মা, ৩৫ বছর বয়সী মোমিনা, চুলের ক্লিপ বানান আর সেই সঙ্গে টুকটাক ম্যাক্সি সেলাই করেন। সাতজনের এই পরিবারে আছে ২ বছরের হাসনাইন, ও দুই মেয়ে, ক্লাস সেভেনের ছাত্রী ১৩ বছরের ফারজানা এবং ১২ বছরের আফসানা, ক্লাস সিক্সের ছাত্রী।
কিন্তু এই ঠ্যালা কেনার পরে সবে দুই মাস হয়েছে কি হয়নি, মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে লকডাউন শুরু হয়ে গেল। সদ্য শুরু হওয়া ব্যবসার পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলতে হল। “আব্বাই তো ঠ্যালাটা নিয়ে বাজারে যেত।” সে আর তার ১৭ বছরের দাদা মুবারক সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা অবধি স্কুলে থাকত। স্কুল থেকে ফিরে দাদা আর ভাইয়ে মিলে বাবাকে সাহায্য করত সবজির দোকানে।











