“এখন সময় সকাল এগারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট, কাজেই এর পরে গতিবেগ সংক্রান্ত খবর,” কাদাল ওসাই রেডিও স্টেশনে ঘোষণা করলেন এ যশবন্ত। “গত এক সপ্তাহ ধরে, অথবা, এক মাসও বলা যেতে পারে, কচান কাথু [দক্ষিণ বায়ু] খুব জোরালো ছিল। সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৪০—৬০ কিলোমিটার। আজ, যেন জেলেদের সাহায্য করতেই, সেই গতিবেগ নেমে এসেছে ১৫-এ” [কিমি প্রতি ঘন্টা]।

তামিলনাড়ুর রামনাথপুরম জেলার পাম্বান দ্বীপের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এ খুবই খুশির খবর। “এর মানে হল, ওরা নিশ্চিন্তে সমুদ্রে যেতে পারবে,” বুঝিয়ে বললেন যশবন্ত, যিনি নিজেও জেলে। সেই সঙ্গে কাদাল ওসাই [সমুদ্রের শব্দ] রেডিও স্টেশনে তিনি রেডিও জকি। এটি এখানকার মানুষদের জন্য একটি আঞ্চলিক রেডিও স্টেশন।

রক্তদান নিয়ে একটি বিশেষ ঘোষণা করার আগে আবহাওয়ার খবর জানিয়ে শেষ করলেন যশবন্ত, “বাইরে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভালো করে জল খান, রোদে বেরোবেন না।” 

এই সতর্কবাণী কিন্তু আবশ্যক। ১৯৯৬ সালে, যে বছর যশবন্তের জন্ম, সেই সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি গরমের দিন দেখে পাম্বান। সে সময়ে, এই দ্বীপে, ধরে নেওয়া যেত যে বছরে অন্তত ১৬২ দিন তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়ায় ছোঁবে অথবা পেরোবে। যশবন্তের বাবা অ্যাণ্টনি স্যামি ভাস এখনও পেশাদার জেলে। তাঁর জন্মের বছর, ১৯৭৩ সালে, এই সংখ্যা ছিল বছরে ১২৫। এই বছরের জুলাই মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমস জলবায়ু এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন সংক্রান্ত একটি অনলাইন ইন্টার‍্যাক্টিভ টুল প্রকাশ করেছিল। এটির সাহায্যে হিসেব করে দেখা যাচ্ছে যে এখন এই গরমের দিনের সংখ্যা বছরে অন্তত ১৮০।  

তাই যশবন্ত এবং তাঁর সহকর্মীরা যে শুধু আবহাওয়ার হালচাল বোঝার চেষ্টা করছেন তা নয়, তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন জলবায়ুর বৃহত্তর সমস্যাগুলিকেও। যশবন্তের বাবা, অন্যান্য জেলে, বলা যেতে পারে এই দ্বীপের দুটি প্রধান শহর পাম্বান আর রামেশ্বরম মিলিয়ে প্রায় ৮৩,০০০ লোক পরিবর্তনের হালহদিশ বোঝার জন্য এঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

PHOTO • A. Yashwanth
PHOTO • Kadal Osai

রেডিও জকি যশবন্ত এবং তাঁর বাবা অ্যান্টনি স্যামি, সঙ্গে তাঁদের নৌকা; [ডানদিকে] ‘আগে আমরা বেরোনোর সময় আবহাওয়া আর হাওয়ার দিক হিসেব করতাম। এখন আমাদের কোনও হিসেবই আর মেলে না’

“আমি দশ বছর বয়স থেকে মাছ ধরছি,” বললেন অ্যান্টনি স্যামি। “[সেই সময়ের তুলনায়] এখন সমুদ্র অনেক পাল্টে গেছে। আগে আমরা বেরোনোর সময় আবহাওয়া আর হাওয়ার দিক হিসেব করতাম। এখন আমাদের কোনও হিসেবই আর মেলে না। সব কিছু এতটাই পাল্টে গেছে যে আমাদের জ্ঞান তার সঙ্গে পেরে ওঠে না। এখন আগের থেকে অনেক বেশি গরম। আগে সমুদ্রে যাওয়ার সময় এত গরম থাকত না। এখন গরমের কারণে আমাদের কাজ আরও কঠিন হয়ে গেছে।”

স্যামি যে উত্তাল সমদ্রের কথা বলছেন, তা কখনও কখনও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। যেমন এই বছরের জুলাই মাসের চার তারিখেই যশবন্ত – যিনি সুযোগ পেলেই তাঁর বাবার নৌকোয় মাছ ধরতে যান – রাত নটার পর এসে জানালেন যে চার জন সমুদ্রে দিকভ্রষ্ট হয়েছেন। কাদাল ওসাই তখন বন্ধ ছিল; সকাল সাতটা থেকে সন্ধে ছটা পর্যন্ত স্টেশনটি খোলা থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একজন রেডিও জকি বিপদগ্রস্ত জেলেদের লক্ষ্য করে একটি ঘোষণা করলেন। “বন্ধ হয়ে গেলেও এখানে একজন রেডিও জকি সব সময় থাকেন,” জানালেন স্টেশনের প্রধান গায়ত্রী উসমান। বাকি কর্মীরাও কাছাকাছি থাকেন। “তাই আপৎকালে আমরা সম্প্রচার করতে পারি।” সেইদিন কাদাল ওসাইয়ের কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পুলিশ, কোস্ট গার্ড, সাধারণ মানুষ, এবং জেলেদের সতর্ক করতে পেরেছিলেন।

অনিদ্র দুই রাত কেটে যাওয়ার পর, শুধুমাত্র দুজনকে উদ্ধার করা গেল। “প্রায় ভেঙে যাওয়া ভাল্লাম [দিশি নৌকো] আঁকড়ে ধরেছিলেন ওঁরা। অন্য দুজন মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন - হাতের যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে,” জানালেন গায়ত্রী। হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে দুই কমরেডকে তাঁরা বলেন যেন তাঁদের ভালোবাসা পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের পরিবারের কাছে, যেন পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে বলা হয়, আর ধরে থাকা সম্ভব ছিল না। জুলাই মাসের দশ তারিখ তাঁদের নিষ্প্রাণ শরীর সমুদ্রের তীরে ভেসে ওঠে।

৫৪ বছর বয়সী এ কে সেসুরাজ, বা ‘ক্যাপ্টেন সেসুরাজ’, যিনি তাঁর নৌকোর নাম থেকে এই উপাধি পেয়েছেন, তিনি বেশ চিন্তার সঙ্গেই বললেন, “আগের মতো আর কিছু নেই।” উনি যখন প্রথম নয় বছর বয়সে সমুদ্রে যাওয়া শুরু করেন, তখন সমুদ্র “অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল...”, জোরের সঙ্গে জানালেন তিনি। “আগে আমরা বুঝতে পারতাম আবহাওয়া কেমন হবে, বা কতটা পরিমাণ মাছ ধরা যাবে। এখন দুটোই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।” 

ক্যাপ্টেন রাজ’ অম্বা গানটি পরিবেশন করছেন

এ কে সেসুরাজ বা ‘ক্যাপ্টেন সেসুরাজ’ বেশ চিন্তার সঙ্গেই বললেন, “আগের মতো আর কিছু নেই।” জোরের সঙ্গে জানালেন তিনি, ‘আগে সমুদ্র অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল... আমরা বুঝতে পারতাম আবহাওয়া কেমন হবে, বা কতটা পরিমাণ মাছ ধরা যাবে। এখন দুটোই অনিশ্চিত হয়ে গেছে’

এইসব পরিবর্তনে খানিকটা যেন হতভম্ব বলেই মনে হয় রাজকে। কিন্তু কাদাল ওসাই-এর কাছে তাঁর জন্য কিছু উত্তর রয়েছে, যদিও সেই উত্তরগুলি আংশিক হতে পারে। নেসাক্কারাঙ্গাল নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ২০১৬ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ এই রেডিও স্টেশনটি শুরু করার পর থেকে নিয়মিতভাবে সমুদ্র, আবহাওয়ার হালচাল, এবং জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে বহু সংখ্যক অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছে।

“কাদাল ওসাই-এর একটি দৈনিক অনুষ্ঠান আছে যার নাম সামুথিরাম পাঝাগু (সমুদ্রকে জানো),” বললেন গায়ত্রী। “এর লক্ষ্য হল সমুদ্রকে বাঁচানো, আমরা জানি যে বৃহত্তর সমস্যাগুলি এখানকার মানুষদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। সামুথিরাম পাঝাগু’র মাধ্যমে আমরা জলবায়ুর পরিবর্তন-বিষয়ক কথাবার্তা চালিয়ে যেতে চাই। যে সমস্ত প্রক্রিয়ার ফলে সমুদ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় [ট্রলারগুলোর অতিরিক্ত মাছ ধরা, পেট্রোল এবং ডিজেলের ফলে জলদূষণ], সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি। এগুলি কেমনভাবে বন্ধ করা যায় সেই বিষয়েও আলোচনা করা হয়। অনেকে আমাদের ফোন করে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। অনেকে নিজেদের ভুল স্বীকার করেন। প্রতিশ্রুতি দেন যে আর কখনও সেই ভুল করবেন না।”

চেন্নাইয়ের এম এস স্বামীনাথন ফাউন্ডেশনের (এম এস এস আর এফ) যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ক্রিস্টি লীমা জানাচ্ছেন, “শুরু হওয়ার সময় থেকেই কাদাল ওসাই-এর সদস্যরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।” এই ফাউন্ডেশনটি রেডিও স্টেশনটিকে সাহায্য করে। “আমাদের বিশেষজ্ঞদের ওঁরা ওঁদের অনুষ্ঠানে নিয়ে যান। কিন্তু মে মাস থেকে আমরা একসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছি। এই কাজ কাদাল ওসাই-এর মাধ্যমে করাটাই সহজ কারণ আঞ্চলিক স্টেশন হিসেবে পাম্বানে তাঁদের একটা জনপ্রিয়তা আছে।”

মে এবং জুন মাস মিলিয়ে কাদাল ওসাই জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চারটি বিশেষ অনুষ্ঠান করেছে ‘কাদাল ওরু অথিসয়ম, অথাই কাপথু নম অভসিয়ম’ (সমুদ্র একটি বিস্ময়, আমাদের তাকে রক্ষা করতে হবে) – এই নামে। এম এস এস আর এফ-এ যাঁরা উপকূলীয় ব্যবস্থা গবেষণা দলের বিশেষজ্ঞ, তাঁরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছেন ভি সেলভাম, যিনি এই গবেষণা দলটির প্রধান। সেলভাম বলছেন, “জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এই জাতীয় অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এমনিতে এই বিষয়ে কথা হলে তা হয় উচ্চ স্তরে অথবা একেবারেই বিশেষজ্ঞদের জন্য। একেবারে বুনিয়াদি স্তর থেকে এই বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন, বিশেষত তাঁদের মধ্যে যাঁরা এই পরিবর্তনের দৈনন্দিন ভুক্তভোগী।” 

PHOTO • Kavitha Muralidharan
PHOTO • Kadal Osai

বাঁদিকে: পাম্বানের যে রাস্তায় কদাল ওসাই-এর অফিস সেখানে পুরোদমে মাছ কেনা-বেচা চলে; ডানদিকে: ডি রেডিমার এই স্টেশানের ১১ জন কর্মচারীর মধ্যে একজন যিনি এখনও সমুদ্রে যান

মে মাসের ১০ তারিখের অনুষ্ঠান থেকে পাম্বানের মানুষ তাঁদের দ্বীপের একটি বড়সড় পরিবর্তনকে আরও ভালো করে বুঝতে পেরেছেন। দুই দশক আগে অবধি অন্তত ১০০টি পরিবার ২০৬৫ মিটার লম্বা পাম্বান ব্রিজের কাছাকাছি থাকত। এই সেতু ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে রামেশ্বরমকে যুক্ত করে। সাগরাঙ্ক বেড়ে যাওয়ার ফলে তাঁদের ওখান থেকে সরে এসে অন্যত্র বসতি স্থাপন করতে হয়। এই বিশেষ সম্প্রচারটিতে সেলভাম শ্রোতাদের বোঝান জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে এই জাতীয় ঘটনাকে ত্বরান্বিত করে।

বিশেষজ্ঞ, জেলে, অথবা স্টেশনের সাংবাদিক – কেউই বিষয়টি অতিসরলীকরণের চেষ্টা করেন না। পরিবর্তনের একটিই কারণ অথবা পরিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে একটিই ঘটনাকে চিহ্নিত করার লোভকেও এঁরা সামলে নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা বেড়ে যাওয়ার পিছনে মানুষের ভূমিকার উল্লেখ করেন এঁরা। কাদাল ওসাই এখানকার মানুষদের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, নিয়ে যেতে চায় আবিষ্কারের যাত্রায়।

সেলভাম বলছেন, “পাম্বান একটি দ্বীপকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্র, ফলত কম সুরক্ষিত। কিন্তু বালির বাঁধ থাকার ফলে কয়েক ধরনের জলবায়ুর প্রভাবের হাত থেকে দ্বীপটি রক্ষা পায়। তাছাড়া শ্রীলঙ্কার উপকূলের কারণে সাইক্লোনের থেকে দ্বীপটি কিয়দংশে সুরক্ষিত থাকে।”

কিন্তু সামুদ্রিক সম্পদের ক্ষতি হয়েই চলেছে। জলবায়ু-জনিত কারণ ছাড়াও অন্যান্য কারণও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানাচ্ছেন সেলভাম। কম মাছ ধরা পড়ে কারণ মূলত ট্রলার থেকে মাত্রাতিরিক্ত মাছ ধরা হয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে মাছের ঝাঁক যে দিকে যাওয়ার কথা সেদিকে না গিয়ে অন্য অন্য দিকে চলে যায়। 

PHOTO • Kadal Osai
PHOTO • Kavitha Muralidharan

বাঁদিকে: এম সেইলাস তাঁর মতো ধীবর সম্প্রদায়ের মহিলাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন; ডানদিকে: স্টেশনের প্রধান গায়ত্রী উসমান এই সামাজিক মঞ্চটিকে একটি দিশা দিয়েছেন

মে মাসের ২৪ তারিখে সম্প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে ধীবর সম্প্রদায়ের মেয়ে এবং কাদাল ওসাই-এর রেডিও জকি বি মধুমিতা জানাচ্ছেন, “উরাল, সিরা, ভেলাকম্বন প্রজাতি...একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পাল সুরা, কালভেটি, কোম্বান সুরা-এর মতো কিছু প্রজাতি এখনও আছে, কিন্তু তারাও সংখ্যায় অনেক কমে গেছে। অদ্ভুত বিষয়, মাথি মাছ, যা আগে কেরালায় অনেক বেশি দেখা যেত, এখন আমাদের অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।”

একই অনুষ্ঠানে লীনা (পদবি জানা যায়নি) নামের এক বৃদ্ধা জানাচ্ছেন যে মানদাইকালুগু নামের এক ধরনের মাছ দুই দশক আগে এখানে প্রচুর পাওয়া যেত, কিন্তু এখন প্রায় দেখাই যায় না। উনি বলছেন যে তাঁদের প্রজন্ম এই মাছের মুখের ভেতর দিয়ে ডিম বের করে এনে সেই ডিম খেত। এই বিষয়টা আবার এম সেইলাসের মতো নতুন প্রজন্মের মেয়েরা বুঝতেই পারছেন না। এম সেইলাস নিজে ধীবর সম্প্রদায়েরই মেয়ে আর কাদাল ওসাইতে সর্বক্ষণের কর্মী। তাঁর কাজ সঞ্চালনা এবং তিনি প্রযোজকও বটে। তাঁর এম কম ডিগ্রি রয়েছে।

লীনা বলছেন, “১৯৮০ সাল অবধি আমরা কাট্টাই, সীলা, কোম্বান সুরা এবং এরকম অন্যান্য মাছ অনেক পেতাম। এখন আমরা ডিসকভারি চ্যানেলে সেইসব মাছ খুঁজি। আমার দাদু-ঠাকুমা [যাঁরা অযান্ত্রিক দিশি নৌকো ব্যবহার করতেন] বলতেন ইঞ্জিনের শব্দে মাছ পালিয়ে যায়। আর পেট্রোল বা ডিজেল জলকে বিষাক্ত করে আর মাছের স্বাদ বদলে দেয়।” সেই সময়ে, বলছেন লীনা, মেয়েরা সমুদ্রে নেমে পাড়ের কাছাকাছি জাল ফেলে মাছ ধরতেন। এখন আর পাড়ের কাছাকাছি মাছ পাওয়া যায় না বলে মহিলারাও খুব একটা সমুদ্রে যান না।

১৭ই মে তারিখের একটি অনুষ্ঠানে মাছ ধরার প্রথাগত উপায় এবং সাম্প্রতিক প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করে কীভাবে সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবন সংরক্ষণ সম্ভব এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে। “পাড়ের কাছাকাছি একটি খাঁচা বানিয়ে সেখানে মাছ চাষ করতে জেলেদের উৎসাহ দেওয়া হয়। সরকারও এই ‘খাঁচা সংস্কৃতি’-কে সমর্থন করছে কারণ সামুদ্রিক সম্পদের ক্ষতির বিষয়টির ওপর এর মাধ্যমে আলোকপাত করা যায়,” জানালেন গায়ত্রী। 

PHOTO • Kadal Osai

ধীবর সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুরণন

পাম্বানের জেলে অ্যান্টনি ইনিগো – বয়স ২৮ – চেষ্টা করে দেখতে খুবই আগ্রহী। “আগে ডুঙ্গোং [সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীবিশেষ] ধরা পড়লে আমরা আবার সমুদ্রে ছেড়ে দিতাম না। কিন্তু কাদাল ওসাই-এর একটা অনুষ্ঠান থেকে আমরা শিখেছি যে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষের কার্যকলাপের কারণে এরা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই আমরা আমাদের দামি জাল কেটেও এদের সমুদ্রে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। কচ্ছপদের ক্ষেত্রেও তাই।”

“কোনও বিশেষজ্ঞ যদি মাছের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন, আমাদের সঙ্গে জেলেরা যোগাযোগ করেন জানাতে যে কথাগুলো কতটা সত্যি,” বলছেন গায়ত্রী।

“মাছ উধাও হয়ে যাচ্ছিল বলে আমরা প্রকৃতি আর দেবতাদের দোষ দিতাম। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করেছি যে এটা প্রায় পুরোটাই আমাদের দোষ,” বলছেন সেইলাস। তাঁর মত কাদাল ওসাই-এর অন্য সমস্ত কর্মীরাই ধীবর সম্প্রদায়ভুক্ত। একমাত্র ব্যতিক্রম গায়ত্রী। গায়ত্রী পাশ-করা শব্দ প্রকৌশলী বা সাউন্ড ইজ্ঞিনিয়র যিনি দেড় বছর আগে এই রেডিও স্টেশনটিতে যোগ দিয়েছেন। গায়ত্রী আসার ফলে এই সামাজিক মঞ্চটি একটি পরিষ্কার দিশা এবং লক্ষ্য পেয়েছে।

কাদাল ওসাই-এর সাদামাটা অফিসটি পাম্বানের যে রাস্তায় সেখানে বেশিরভাগ দিনই মাছ কেনাবেচা চলে। নীল রং-এর সাইনবোর্ডে রেডিও স্টেশনের নামের তলায় লেখা আছে নামাথু মুন্নেত্রাথুক্কানা ভানোলি (আমাদের উন্নয়নের রেডিও)। স্টেশনের ভেতরে রয়েছে একটি উন্নতমানের রেকর্ডিং স্টুডিও। মহিলা, শিশু ও ধীবরদের জন্য আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান হয়। দুটি অনুষ্ঠানের মাঝে অম্বা গান বাজানো হয়। জেলেদের সমুদ্রযাত্রাই হল সেই গানগুলির বিষয়বস্তু। স্টেশনের ১১ জন কর্মচারীর মধ্যে শুধু যশবন্ত এবং ডি রেডিমার এখনও সমুদ্রে যান।

বেশ অনেক বছর আগে যশবন্তের পরিবার থুথুকুডি থেকে পাম্বানে চলে আসে। “ওখানে মাছ ধরায় খুব একটা লাভ ছিল না,” জানাচ্ছেন যশবন্ত। “আমার বাবা ওখানে ভালো মাছ ধরতে পেতেন না।” রামেশ্বরম ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু “যত সময় গেছে, এখানেও মাছ ধরা কঠিন হয়ে গেছে।” কাদাল ওসাই-এর কারণে উনি বুঝেছেন যে এই অবনতির কারণ “অন্যের করা ‘কালা জাদু’ নয়, বরং আমরাই এই পরিবেশের ওপর যে ‘কালা জাদু’ করি, এসব তারই ফল।”

লাভ নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করার বিষয়টি নিয়ে উনি বেশ চিন্তিত। “অনেক বৃদ্ধ মানুষ এখনও মনে করেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা যথেষ্ট মাছ ধরতে পারেননি বলেই তাঁরা দরিদ্র। লাভ বাড়াতে গিয়ে তাই তাঁরা সামুদ্রিক সম্পদকে অতিরিক্ত ব্যবহার করে ফেলছেন। আমরা, যাদের অল্প বয়স, তারা এখন এটা করার বিপদটা বুঝতে পেরে এই ‘কালা জাদু’-এর প্রভাবকে উল্টোবার চেষ্টা করছি।”

লাভ নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করার বিষয়টি নিয়ে উনি বেশ চিন্তিত। ‘অনেক বৃদ্ধ মানুষ এখনও মনে করেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা যথেষ্ট মাছ ধরতে পারেননি বলেই তাঁরা দরিদ্র। লাভ বাড়াতে গিয়ে তাই তাঁরা সামুদ্রিক সম্পদকে অতিরিক্ত ব্যবহার করে ফেলছেন’

ভিডিও দেখুন: আর জে যশবন্ত পাম্বানের উদ্দেশে আবহাওয়ার খবর পড়ছেন

তবুও, বৃহত্তর সম্প্রদায়ের প্রথাগত জ্ঞান এখনও শিক্ষার বড়ো উৎস। “বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় যেটা করেন,” জানাচ্ছেন মধুমিতা, “সেটা হল, এই জ্ঞানকে তাঁরা স্বীকৃতি দেন আর আমাদের মনে করিয়ে দেন কীভাবে আমরা এই জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি। আমাদের রেডিও স্টেশন এই প্রথাগত জ্ঞানকে সম্মান করে এবং এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে মানুষের সামনে আনার চেষ্টা করে। বদলে আমাদের সম্প্রদায় আমাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রচারিত বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগায়।”

পাম্বানের কান্ট্রি বোট্‌স ফিশেরমেন অ্যাসোসিয়েশানের সভাপতি এস পি রায়াপ্পান এই বিষয়ে সহমত। “আমরা সবসময়েই সামুদ্রিক প্রাণসম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং তার বিপদ নিয়ে কথা বলেছি। কাদাল ওসাই আরও জোরদার সচেতনতা তৈরি করতে পেরেছে। আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক সময় বিদেশি জাল কেটেও ডুঙ্গোং বা কচ্ছপদের বাঁচানোর চেষ্টা করে।” আর হয়তো একদিন, আশা করেন সেইলাস আর মধুমিতা, তাঁদের রেডিও স্টেশন মান্দাইকালুগুকে এই দ্বীপের জলে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে।  

বেশিরভাগ সামাজিক রেডিও স্টেশনের মতো এটির সম্প্রচারের সীমা ১৫ কিলোমিটার। কিন্তু পাম্বানের মানুষ কাদাল ওসাইকে সাদরে গ্রহণ করেছেন “এবং আমরা শ্রোতাদের থেকে দিনে দশটা করে চিঠি পাই,” জানাচ্ছেন গায়ত্রী। “আমরা যখন শুরু করেছিলাম তখন সবাই ভাবতেন আমরা কারা আর কী ধরনের ‘উন্নয়ন’-এর কথাই বা আমরা বলছি। এখন তাঁরা আমাদের উপর ভরসা করেন।”

শুধু পরিবেশের ওপরেই আর আস্থা রাখতে পারছেন না।

কভারচিত্র: পাম্বানে ৮ই জুন সংযুক্ত রাষ্ট্রের বিশ্ব মহাসমুদ্র দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে শিশুরা কাদাল ওসাই লেখা একটা বোর্ড ধরে আছে (ছবি: কাদাল ওসাই)

পারি-র জলবায়ু বিবর্তনের উপর দেশব্যাপী রিপোর্টিং সংক্রান্ত প্রকল্পটি ইউএনডিপি সমর্থিত একটি যৌথ উদ্যোগের অংশ যার লক্ষ্য জলবায়ুর বিবর্তনের প্রকৃত চিত্রটি দেশের সাধারণ মানুষের স্বর এবং অভিজ্ঞতায় বিবৃত করা। 

নিবন্ধটি পুনঃপ্রকাশ করতে চাইলে [email protected]  – এই ইমেল আইডিতে লিখুন এবং সঙ্গে সিসি করুন [email protected]  – এই আইডিতে।

বাংলা অনুবাদ: সর্বজয়া ভট্টাচার্য

সর্বজয়া ভট্টাচার্য ([email protected]) কলকাতার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন। কলকাতার ইতিহাস এবং ভ্রমণ কাহিনি বিষয়ে তাঁর আগ্রহ রয়েছে।

Kavitha Muralidharan

কবিতা মুরলীধরন চেন্নাই নিবাসী স্বতন্ত্র সাংবাদিক এবং অনুবাদক। তিনি ‘ইন্ডিয়া টুডে’ (তামিল) পত্রিকার পূর্বতন সম্পাদক, এবং তার আগে তিনি ‘দ্য হিন্দু’ (তামিল) সংবাদপত্রের রিপোর্টিং বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি পারি’র স্বেচ্ছাকর্মী।

Other stories by Kavitha Muralidharan