ফিরে আসা পুলিশ পল্টনকে মোকাবিলা করতে হবে একদল নাছোড়বান্দা মানুষের যাঁরা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ ও ইস্পাতের সমন্বিত কারখানা এবং ক্যাপটিভ বন্দরের জন্য রাজ্য সরকার কর্তৃক কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় কোমর বেঁধে নেমেছেন। এই প্রকল্পের অধীনে ৬০০ মিলিয়ন টন আকরিক লোহা খনন হবে।
পানের বরজ
ওড়িশার অপেক্ষাকৃত উন্নত কৃষিপ্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে পরিগণিত হন এখানকার মানুষ। পানের বরজ-নির্ভর অর্থনীতি তাঁদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। সরকারি হিসেব অনুযায়ী প্রকল্প অঞ্চলে ১,৮০০টি পানের বরজ রয়েছে। এখানকার পানচাষিদের হিসেবে এই সংখ্যাটি ২,৫০০। তার মধ্যে প্রায় এক হাজার বরজ আছে ঢিংকিয়া ও গোবিন্দপুর জুড়ে। পান বরজে দৈনিক মজুরির হার ২০০ টাকা বা তার বেশি, সঙ্গে একবেলার ভরপেট খাবার। রাজ্যের কৃষিক্ষেত্রে মজুরির এইটিই সর্বোচ্চ হার যা ভুবনেশ্বরের শ্রমিকদের তুলনায় খানিক বেশি এবং ওড়িশার মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ যোজনার (এমএনআরইজিএস) অধীনে প্রদত্ত মজুরির হারের প্রায় দ্বিগুণ। পানের বরজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাজের জন্য একবেলার খাবার-সহ অর্জিত টাকার পরিমাণ দৈনিক ৪৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এক একরের মাত্র দশমাংশ জুড়ে থাকা একটি ছোটো পানের বরজ বছরে ৫৪০টি বা তারও বেশি শ্রমদিবসের সংস্থান করতে পারে। এবং এটি ৬০০ দিন ব্যাপী পারিবারিক শ্রমকালের বাইরে। ভূমিহীন মজুরদের অনেকে আবার জেলে হিসাবে মাছ ধরে আরও খানিক উপার্জন করে থাকেন। জটাধারীতে পসকোর ক্যাপটিভ বন্দর তৈরি হলে আয়ের সেই উৎসটিও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা কর্মসংস্থানের বার্তা বয়ে আসা প্রকল্পগুলির দাবিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে সাফ দেখিয়ে দেন যে এখানে না আছে শ্রমিকের যোগান, আর না আছে কর্মসংস্থানের তেমন কোনও সামগ্রিক চাহিদা। শ্রেণি নির্বিশেষে, মায় ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত কেউই এমন একটি ধ্বংসাত্মক প্রকল্প ও তার সামান্য ক্ষতিপূরণের জন্য নিজেদের জীবিকা খোয়াতে রাজি নন।
মামলার প্যাঁচ ও পরোয়ানা
পসকোর বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির দরুণ এই আপাত শান্ত অবস্থার আড়ালে সারাক্ষণ একটি বৃহত্তর চাপানউতোর চলতে থাকে। বিপুল সংখ্যক মানুষের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে — অগণিত পরোয়ানা জারি করা হয়েছে — অনেকেই পাঁচ বছর অবধি গ্রামের বাইরেই যেতে পারেননি। পুলিশের হাত থেকে ঢিংকিয়া এবং গোবিন্দপুরকে বাঁচাতে গড়ে ওঠা "মানব প্রাচীর"-এ সামিল বিক্ষোভকারীদের কথায়, "অনেকেই অন্য গ্রামে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বিয়েতে যোগ দিতে পারে না। অসুস্থ ভাইবোন বা পিতামাতার সঙ্গে দেখা করতে পারে না।" স্বভাবতই, এমন সব ঘটনায় তাঁদের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার অনুভূতি চাগাড় দিয়ে উঠছে।
অভয় সাহুর বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা রয়েছে যেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় তিনি ১০ মাস চৌদ্বার জেলে কাটিয়েছেন। তিনি বললেন, "পসকোর বিরোধ করার জন্য সব মিলিয়ে, এখানে এক হাজারেরও বেশি লোকের বিরুদ্ধে ১৭৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।" ওড়িশা-সহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে সামিল প্রতিবাদী মানুষজনকে অপরাধী ঠাওরানো এখন দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাত্র একশো কিলোমিটার দূরে কলিঙ্গনগরে রবি জারিকা থাকেন, তিনি টাটা ইস্পাত কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আদিবাসী সমাজের প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। "বছরের পর বছর আমি আমার গ্রাম চান্দিয়া ছেড়ে যেতে পারিনি। পুলিশ আমার বিরুদ্ধে প্রতিটি ধারায় মোট ৭২টি মামলা দায়ের করে রেখেছে।"
জগৎসিংপুর জেলার পুলিশ সুপার এস দেবদত্ত সিং অবশ্য পিপিএসএস-এর এই পরিসংখ্যাঙ্কে "ডাঁহা মিথ্যা" বলে পালটা আক্রমণ করেছেন। তিনি দিল্লি থেকে ফোনে আমাদের বলেছেন, "২০০-৩০০ জন যারা ঝামেলা পাকিয়ে ছিল, তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বরং পিপিএসএস-এর হাতে হয়রানির শিকার হওয়া মানুষেরা মামলা দায়ের করেছে, এর মধ্যে সেই ৫২টি পরিবারও ছিল যাদের জোর করে তাড়ানো হয়েছে। এবং যদি নির্দোষ লোকেরা বাইরে বেরোলে গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকে, তবে তারা নির্ঘাৎ পিপিএসএস দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে।"
২০০৫ সমঝোতাপত্র (এমওইউ)
ওদিকে ঢিংকিয়াতে, বর্তমান আপাত শান্ত পরিস্থিতির বিষয়ে সাহুর পর্যবেক্ষণ ঠিক বলেই মনে হয়। জোরদার বৃষ্টির কারণে মাটিতে চলা যুদ্ধ খানিক ধীরগতি হলেও রাজনৈতিক পরিসরে নাস্তানাবুদ হওয়াটাই আসল কারণ। সাম্প্রতিকতম উদাহরণটি হল জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন রাজ্যকে প্রকল্প এলাকায় "শিশুদের শিক্ষার জন্য নির্ধারিত বিদ্যালয়গুলিতে আশ্রয় নেওয়া পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করতে" বলেছে। পরিস্থিতির সমঝদার সমালোচকেরা বলছেন, সরকার এমন একটি প্রকল্পের জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করছে, যেটির সমঝোতাপত্রের (এমওইউ) মেয়াদ এক বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। ২০০৫ সালে রাজ্য ও কর্পোরেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতাপত্রে বাজার মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে পসকো সংস্থার হাতে এই খনিজ ভাণ্ডার তুলে দিয়েছে। শীর্ষস্থানীয় সরকারি সূত্রগুলি বলছে "১৫ দিনের মধ্যে পুনর্নবীকরণের সম্ভাবনা রয়েছে।" কিন্তু সমঝোতাপত্র না থাকাটা রাজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের জন্য ৪,০০৪ একর জমি অধিগ্রহণ করায় কোনও বাধাই সৃষ্টি করতে পারেনি, যে জমির প্রায় অর্ধেকটাই আছে ঢিংকিয়া ও গোবিন্দপুর গ্রামে।