অক্টোবর মাসের শেষ। মাঠে মাঠে পেকে উঠেছে এবছরের সবেধন ধানের ফসল, সেসব কেটে এনে সযত্নে ঘরে তোলার পালাও শুরু হয়ে গিয়েছে দেখতে দেখতে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার এই পার্কিডিহ গ্রামে আজ অনেকদিন পর নুন আনতে পান্তা ফুরোনো সাঁওতাল বাড়িগুলোয় সোনাবরণ শস্য আর ধরছে না যেন।
খেতখামারে কয়েকমাসের হাড়ভাঙা খাটুনির মরসুমটা পার করে এবার খানিক জিরোনোর ফুরসত পেয়েছেন পার্কিডিহ গাঁয়ের বাচ্চা-বুড়ো-মাঝবয়সি মিলে প্রায় জনা ৪০০ বাসিন্দা। ইতিমধ্যে শীতকাল কড়া নাড়ছে দরজায়। কাছেই ছোটোনাগপুর মালভূমির গজাবুরু পাহাড়ের বনেবাদাড়ে রং বদলাচ্ছে গাছেরা। জ্বালা ধরানো গরমটা তল্পিতল্পা গুটিয়ে উত্তরের শীতল হাওয়ার জায়গা করে দিচ্ছে ক্রমশ।
তবে বেশিদিন কিন্তু শুয়ে-বসে থাকলে চলবে না। পরবের পালা তো চলেই এল, নিজেদের পোষা জন্তুজানোয়ারগুলোকে এখন কৃতজ্ঞতা জানাবেন সাঁওতালরা। পৃথিবীর এই অঞ্চলে এখনও গবাদি পশুরাই কৃষিকাজের মেরুদণ্ড। ট্র্যাক্টর এখনও এই সাদামাটা 'গো-ধন'-দের জায়গা নিতে পারেনি।
ফসল-কাটা হলে পর উৎসবে মাতেন সাঁওতালরা, দীপাবলিও পরে এই সময়টায়। সাঁওতালদের পরবটির নাম গো-বাঁদনা (বাংলায় 'গো' মানে গরু আর 'বাঁদনা' অর্থাৎ বন্দনা)। আঁকাআঁকি, নাচ, গান, খেলাধুলো, খানাপিনা কিচ্ছুটি বাদ থাকে না এসময়।
কয়েকজন গ্রামবাসী ইতিমধ্যেই কাছের গজাবুরু আর ঢোলবুরু পাহাড়ে গিয়ে দেওয়াল রাঙানোর বিবিধ উপকরণ হিসেবে মাটি-পাথর জোগাড়ে লেগে পড়েছেন। কেউ কেউ আবার আরও দূরে পাড়ি দিয়েছেন ঘং লতার খোঁজে, বাড়ির উঠোনে কারুকাজ করার সাদা-রং বানাতে জরুরি উপকরণ এই লতা।
পার্কিডিহ গ্রামে একঘর কুম্ভকার পরিবার পলি মাটির নকশা নামে একরকম শিল্পকাজে বিশেষ পটু। গাঁয়ের বাকিদেরও এই শিল্পের জন্য আলাদা করে তৈরি-মাটি সরবরাহ করেন তাঁরা। পরিবারটি গো-বাঁদনা উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।
পরবের প্রস্তুতি হিসেবে গ্রামের সবকটা গরুকে সরোবরের জলে নাইয়ে-ধুইয়ে আনতে জঙ্গলে গেছেন গোয়ালারা। এত খাতির-যত্নে স্নান করতে পেয়ে চারপেয়েগুলোর ফুর্তিও কম হয় না। ওদিকে আবার কয়েকজন গ্রামবাসী নিজেদের লাঙ্গল আর চাষবাসের অন্যান্য যন্ত্রপাতি তড়িঘড়ি ধুয়ে আনছেন কাছেপিঠের পুকুরে।
৬৫ বছরের ভাগু মুদি একাধারে যেমন অভিজ্ঞ সংগীতশিল্পী, তেমনি চামড়ার কাজের ওস্তাদ। বাংলায় সাধারণত ডোম সম্প্রদায়ের লোকেরাই করেন একাজ। ভাগু মুদি নিজের ঢোল, মাদল (খালি হাতে তালে তালে বাজানো এই ঘাতবাদ্য সব সাঁওতাল ঘরেই থাকে) বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের চামড়ার পিঠগুলো নিজেই সারান। তাছাড়া, পার্কিডিহ গ্রামে অল্পবয়সিদের বাজনা শেখাতেও তাঁরই ডাক পড়ে। গো-বাঁদনার প্রথম রাতে ভাগু মুদির কাজ হল তাঁর দলের লোকেদের নিয়ে গ্রামের প্রতিটি গোয়ালে ঘুরে ঘুরে 'গো-জাগানিয়া' গান গেয়ে গবাদি পশুদের সারা রাত জাগিয়ে রাখা। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস এইসব গান তাঁদের পোষ্যদের রাতবিরেতে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মজুরি কাজে নিযুক্ত আত্মীয়-স্বজন এসময় নিজেদের গাঁ পার্কিডিহতে ফেরেন পরবে যোগ দেওয়ার জন্য। গাঁয়ের যে একটামাত্র পরিবার মহুল বা মহুয়া গাছের ফুল দিয়ে দেশি মদ তৈরি করতে পটু, তাঁদের আর নাওয়াখাওয়ার সময় নেই।
২০১৪ সালে যখন পার্কিডিহ যাই তখন এ অঞ্চলে মাওবাদী চরমপন্থার দাপট নিভু নিভু। আধাসামরিক বাহিনীও সরে গেছে অন্যত্র। সর্বোপরি সে বছর বৃষ্টিও হয়েছিল প্রচুর। এইটুকু শ্রীবৃদ্ধির জোরেই উৎসবের দ্বিতীয় রাতে স্কুলের মাঠে বায়না দিয়ে ছৌ-নাচের দল এনেছিলেন গ্রামবাসীরা।
গ্রামের মেয়েরা ঢেঁকিতে ধান কুটছেন এখন। স্থানীয় কারিগরদেরই হাতে গড়া এ যন্ত্রটি চাল গুঁড়োতে কাজে লাগে। এর থেকে পাওয়া চালের গুঁড়ো একাধারে রং আবার পরবের ভোজে উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার হয়। গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবার অন্ততপক্ষে ৪ কেজি চালগুঁড়োতে নিজেদের উঠোন সাজিয়ে স্বাগত জানায় সদ্য স্নান করিয়ে আনা গরুগুলোকে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ভারতের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতম জেলাগুলোর মধ্যেই পড়ে বটে, কিন্তু সারাবছরের দুঃখ-দুর্দশা ভুলে যাওয়ার ফুরসত করে দেয় এই পরবের সময়টুকু। ঘর সাজানোর জন্য খানিক বাড়তি শস্যের ব্যবহারও তাই এ উদযাপনেরই অঙ্গ।
গো-বাঁদনার তৃতীয় ও শেষ দিনে মজা-হইহুল্লোড়-খেলাধুলো বাঁধ মানে না। সব ধরনের আচার-অনুষ্ঠানেরই কেন্দ্রে থাকে গোষ্ঠীর লোকেদের পোষ্য বিশেষ করে গরুরা। নিজেদের গবাদি পশুগুলোর গায়ে চিত্রবিচিত্র করে তাদের পুজো করেন সব গ্রামবাসী, ধান দিয়ে মুকুট পরান মাথায়। গোয়ালঘরগুলোতেও নতুন রঙের প্রলেপ পড়ে।
কিন্তু মূল অনুষ্ঠান অর্থাৎ গরুখুঁটা নামে খেলাটা হয় সন্ধেবেলায় । গ্রামের ৩৫-৪০টা গরুকে দড়ি দিয়ে বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে দেওয়া হয়। বাজনদারদের দলের নেতা ভাগু মুদি প্রত্যেকটা পশুর সামনে গিয়ে ঢোল বাজিয়ে গান ধরেন। তাতে কয়েকটা গরু লাফালাফি জোড়ে, উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। লোকে হাততালি দেয়। এই করে আনুষ্ঠানিক ভাবে সুসম্পন্ন হয় সাঁওতালদের সাধের উৎসব।
সাঁওতালরা নিজেদের গরুগুলোকে চাষবাসের কাজে লাগান, খেতে বোনা ফসল গোলাজাত করতে তাদের জরুরি ভূমিকাটি স্মরণ করে চারপেয়ে এই পোষ্যদের আগলে রাখেন, ভক্তিভরে পুজো করেন। কিন্তু বর্তমান ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় যেমন পবিত্রতার দোহাই দিয়ে গরুকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছে, এখানে কিন্তু তেমনটা নয়। পশুগুলো বয়সের ভারে অথর্ব হয়ে পড়লে তাদের কেটে খেয়ে ফেলার ব্যাপারে মোটেই কোনও ছুঁৎমার্গ রাখেন না সাঁওতালেরা।














