রিজওয়ানা হাজির মুখের দিকে তাকালে প্রথমেই মন কেড়ে নেবে তাঁর ছলছলে ডাগর বাদামি চোখদুটি। মাথায় জড়ানো ওড়নার নিচে চুলগুলি পরিপাটি করে গুছিয়ে, চোখ কচলে মুছে নিয়ে ফিসফিস করে গোপনে জানিয়ে দিলেন যে রোদচশমা কেবল পুরুষরাই পরতে পারেন।
“আমার বর পরে তো,” পাশেই নুনের দানায় ভরা মাঠে আঁকশি টেনে চলা তাঁর শোহর শরিককে দেখিয়ে বললেন তিনি। শরিকের দুই চোখ কালো চশমায় ঢাকা।
“আপনি পরেন না কেন?” যেন একটা খুব অদ্ভুত এবং অসম্ভব কথা শুনলেন এমন ভাব করে খোলা গলায় হেসে উঠলেন তিনি। “এখানে কত গুরুজনেরা আছেন। কী বলবেন সবাই? আমাদের সমাজে মেয়েরা রোদচশমা পরে না,” আলতো করে হাত নাড়িয়ে প্রশ্নটা যেন উড়িয়েই দিলেন তিনি। আবারও একবার নিজের ছলছলে চোখ মুছে নিয়ে স্বভাবসিদ্ধ লাজুক ভঙ্গিতে নরম স্বরে বললেন, “বুঝলেন তো, আমি মানুষটা না একটু মুখচোরা।”
রিজওয়ানার চোখদুটোয় থেকে থেকে জলে ভরে আসে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। লবণভাটির নোনা হাওয়ায় ধুলো আর নুনের গুঁড়ো নিয়ে এসে চোখে জমা করতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ সেই হাওয়ায় কাজ করতে করতে চোখের জল শুকিয়ে গিয়ে এভাবেই ভুগছেন অনেকে। গুজরাটের নুনের জমিতে কর্মরত শ্রমিক “আগারিয়ারা” এই অসুস্থতাতেই ভোগেন সব থেকে বেশি। কচ্ছের লিটল্ রণে প্রায় ৫০০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এইসব নুনচাষের জমিকে স্থানীয় ভাষায় “আগার” বলা হয়, আর যাঁরা সেখানে মজুরি খাটেন তাঁরা হলেন আগারিয়া। রণ আদতে বাটির মতো গোলাকার নিচু জমি। বর্ষার সময় পুরো রণ জলে ভরে গেলেও, শীত আর গ্রীষ্মে থাকে একেবারে খটখটে।
মরুভূমি থেকে জলাভূমিতে পরিবর্তনের কারণে রণের এই আশ্চর্য প্রকৃতি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। বর্ষাকালে ফ্লেমিংগো বা পেলিক্যানের মতো পরিযায়ী পাখির দল এখানে এসে বাসা বাঁধে। সারাটা বছর এখানে দলে দলে চরে কৃষ্ণসার হরিণ, এন্টিলোপ আর বুনো শুয়োর। বন্যপ্রাণীদের আসা যাওয়া দেখে কোন বছরে কেমন আবহাওয়া হতে চলেছে তা ধারণা করে নেওয়া যায়। হয়তো সেখান থেকেই “কচ্ছমা কালে সু আভসে এ আজেজ দেখায়” [কচ্ছের মাটিতে আজ দাঁড়িয়েই আগামীকালের দেখা মেলে] এই স্থানীয় প্রবাদবাক্যটির সৃষ্টি।
রণের জল শুকিয়ে যেতেই ভূগর্ভস্থ নোনা জল থেকে নুন বানানোর কাজে লেগে পড়েন আগারিয়ারা। তাঁবু খাটিয়ে, অস্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ করে সেখানে বছরের আট মাস কাজ করেন তাঁরা। ভারতে উৎপাদিত মোট নুনের ৭৫% তাঁরাই তৈরি করেন।
সোজা লাইনে খোপ খোপ দাগ কাটা মাটিই আদতে রণের দুনিয়া। সাদা নুনের জাফরি, সৌরবিদ্যুতের চৌকো প্যানেল - আয়তাকার বা বর্গাকার একটানা এই সব নকশা নুনভাটির জীবনের কাঠিণ্যকেই ব্যক্ত করে। সকাল ১০টায় রণের ওপর ধকধক করতে থাকা সূর্য যেন লাভা ওগরায়, নুনভরা জমির অসহ্য সাদা আভায় সব যেন ঝলসে যায়। যত দূর চোখ যায় সাদা নুনের আস্তরণে মোড়া মাটি, আর ধবল আলোয় ঝলসানো আকাশ - যেন এক অন্য জগত। এই হিংস্র শুভ্রতায় চোখ মেলে তাকানো দায়। সবখান থেকে জল শুষে নেয় এখানকার তীব্র দাবদাহ। ঠোঁট ফাটে, গলা জ্বলে, চোখে সারাক্ষণ জল কাটে, পায়ের নিচের শুকনো মাটির মতোই গোড়ালিগুলোও ফেটে চৌচির হয়ে যায়, সেই ফাটলের গভীর থেকে উঠে এসে তীব্র যন্ত্রণা মিশে যায় নোনা হাওয়ায়।














