একটা জোর কড়কড় শব্দে শ্রীনগরের হারওয়ান মহল্লার নিঝুম গলিটা ধড়ফড়িয়ে উঠল যেন। আসলে, মস্ত আখরোট গাছটা (জুগলান্স রেজিয়া) থেকে ফল পাড়ছেন মহম্মদ আফজল আর সাজিদ খান, আর শক্ত খোলায় ঢাকা বাদামগুলো আশেপাশের বাড়িঘরের ধাতব চালে পড়ে অমন বিদঘুটে শব্দ হচ্ছে।
গাছটা লম্বায় একশো ফুট, মাথায় আন্দাজ দশতলা বাড়ির সমান। সেখান থেকে আখরোট পাড়ায় বিপদের ভয় তো ষোলো আনা। সুতরাং যাঁরা কাজটা করেন সকলেই এই বিদ্যেয় বিশেষরকম দড়, তাঁদের ডাকা হয় ছানন ওল (আখরোট পাড়ার লোক) বলে। গত ছ'বছর ধরে আখরোট পাড়ার কাজ করছেন জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা মহম্মদ আফজল। রাজ্যে তফসিলি জনজাতি হিসেবে নিবন্ধিত বাকরওয়াল জনগোষ্ঠীর এই যুবক প্রত্যেক মরসুমে একাজ করতে কাশ্মীর পাড়ি দেন। "ডর তো লাগেই," বলেন তিনি, "কী উঁচু উঁচু গাছ সব।" আখরোট পেড়ে আনা ছাড়াও, অক্টোবর আর নভেম্বর মাসে আপেল বাঁধাছাঁদা কিংবা গাছ কাটার কাজ করে দিনপিছু ৫০০-৭০০ টাকা হাতে আসে তাঁর। যেসব বাগানে এই কাজ পড়ে তার কাছেই অস্থায়ী ছাউনি খাটিয়ে ওই সময়টায় থেকে যান আফজল ও আর সব আখরোট পাড়ার লোকেরা।
অগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে অর্থাৎ আখরোটের মরসুম জুড়ে আফজলের দিন শুরু হয় সকাল সাতটায়, শেষ হতে সেই সন্ধে ছ'টা। একেকদিনে চার-পাঁচটা গাছ সেরে নেন তিনি, তবে এই সংখ্যা নির্ভর করে গাছের উচ্চতার উপর। তরতরিয়ে বেয়ে উঠে, উইলো বা আর কোনও শক্তপোক্ত কাঠের লম্বা ডান্ডা দিয়ে বাড়ি মারেন ওপর দিকের ডালগুলোয়।
আখরোট পাড়া যে চাট্টিখানি কথা নয়, ভালোই টের পান আফজল। "খুব ঝুঁকির কাজ," সাফ অভিমত তাঁর, "গাছের ওপর টাল সামলে দাঁড়িয়ে, অমন একটা পাঁচ কেজির লাঠি হাতে আখরোটগুলোয় জোরসে বাড়ি মারতে গেলে খুব চটপটে হতে হয়।"
কিছু কিছু আখরোট গাছ, বিশেষ করে বুদগামের গাছগুলো, লম্বায় ১৫০ ফুটও হয়। "বর্ষার সময় আমরা গাছ বাইতে চাই না, গাছের গা বড্ড পিছল হয়ে যায় তো তখন," এটুকু সাবধান হতেই হয় আফজলদের। "বরাতজোরে বিপদে-আপদে পড়িনি কখনও।"
কিন্তু তাঁর জন্যে বাড়ির লোকের চিন্তার শেষ নেই। "আম্মি মোটেই চায় না আমি একাজ করি, আমাদের গাঁয়ের অনেকেই আখরোট গাছ থেকে পড়ে মারা গিয়েছে কিনা," বেশ বোঝেন আফজল।














