আট ভবঘুরের আমাদের দলটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বইগুলি উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। সবগুলিই প্রায় অমর সাহিত্যকীর্তি, কালজয়ী সাহিত্য তথা রাজনৈতিক বিষয়ের বই। রহস্য-গ্রন্থ, বাজারে চলতি বেস্টসেলার বা সস্তা-সাহিত্যের একটিও বই নেই। তামিল মহাকাব্য ‘সীলাপ্পাথিকারামের’ মালায়লাম অনুবাদ আছে। ভৈকম মহম্মদ বশীর, এম.টি. ভাসুদেভন নায়ার, কমলা দাস প্রমুখের রচনা আছে। এম. মুকুন্দন, ললিথাম্বিকা আন্থারজানম এবং অন্যান্য লেখকদের উপস্থিতি নজরে পড়ল। মহাত্মা গান্ধির রচনার পাশাপাশি থোপ্পিল বাসির বিখ্যাত “ইউ মেড মি এ কমিউনিস্ট”-এর মতো চরমপন্থী ভাবধারার বইও আছে।
“কিন্তু চিন্নাথাম্বী এইসব বইপত্র লোকে আদৌ পড়ে?” আমরা জানতে চাই, এতক্ষণে বাইরে এসে বসেছি আমরা। অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির মত মুথাভানরাও প্রভূত বঞ্চনার স্বীকার, তাঁদের মধ্যে স্কুলছুটের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অন্যান্য ভারতীয়দের সাপেক্ষে। উত্তর দিতে গিয়ে তিনি গ্রন্থাগারের রেজিস্টারখানি আগে বের করে আনেন। বই ধার নেওয়া তথা ফেরত দেওয়া সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য লিপিবদ্ধ আছে অনবদ্য এই খাতায়। এই ছোট্ট জনপদে মাত্র ২৫টি পরিবারের বাস, অথচ ২০১৩ সালে ৩৭টি বই ধার করা হয়েছে। হিসেব মতো এটা প্রায় ১৬০ খানি মোট বইয়ের এক চতুর্থাংশ, বই নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ আশাব্যঞ্জক অনুপাত। এককালীন ২৫ টাকা দিয়ে গ্রন্থাগারের সদস্যপদ গ্রহণ করা যায়, মাসে ২ টাকা করে প্রদেয়। প্রতিবার বই ধার নেওয়ার জন্য আলাদা করে আর অর্থ দিতে হয় না। চিনি ছাড়া কালো চা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। “লোকে পাহাড় থেকে আসে ক্লান্ত হয়ে।” শুধুমাত্র বিস্কুট, মিক্সচার বা চানাচুর এবং অন্যান্য খাবারের দাম দিতে হয়। মাঝেসাঝে, সাদামাটা ভোজনও অতিথির জুটে যেতে পারে বিনামূল্যেই।
বই ধার নেওয়া এবং জমা দেওয়ার তারিখ, দাতা এবং গ্রহিতার নাম ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য স্পষ্ট কতে রেজিস্টারে লিখে রাখা হয়েছে। ইল্লাঙ্গোর ‘সীলাপ্পাথিকারাম’ একাধিকবার ধার নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই এইবছর আরও অনেক বই ধার করা হয়েছে। প্রান্তিক আদিবাসী সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় এই নিরিবিলি জঙ্গলে অত্যন্ত উচ্চমানের সাহিত্যচর্চা চলছে। এই চিত্র দেখে মনে শান্তি আসে। আমার মনে হল, আমাদের মধ্যে অনেকেই তখন শহুরে বাতাবরণে কেমন করে মানুষের বই পড়ার অভ্যেস নষ্ট যাচ্ছে সেকথা ভাবছি।
আমাদের দল, যার অধিকাংশ সদস্যই লেখালেখি করেন, তাঁদের অহংবোধে আবারও একবার সজোরে ধাক্কা লাগল। আমাদের সঙ্গী, কেরালা প্রেস অ্যাকাডেমির সাংবাদিকতা বিভাগের তিন ছাত্রের একজন, বয়সে তরুণ বিষ্ণু এস. বইপত্রের মধ্যে একটা ভিন্নধর্মী ‘বই’ আবিষ্কার করলেন। হাতে লেখা বেশ কিছু পাতা সমেত একটা রুলটানা নোটবই। চিন্নাথাম্বীর আত্মজীবনী, যদিও এখনও বইটির নাম দেওয়া হয়নি। তিনি আমাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী যে বইটি খুব বেশি এগোয়নি। তবে কাজ চলছে। “চিন্নাথাম্বী, বই থেকে একটু কিছু অন্তত পড়ে শোনান।” খুব বড়ো বা জটিল কিছু নয়, এবং এখনও অসম্পূর্ণ, কিন্তু স্পষ্ট করে গুছিয়ে লেখা। তাঁর সামাজিক এবং রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষের কথা ধরা আছে এখানে। লেখা শুরু হচ্ছে মহাত্মা গান্ধির হত্যার ঘটনায়, তাঁর বয়স তখন সবে নয় বছর – এই ঘটনা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।