

Kolhapur, Maharashtra
|MON, FEB 09, 2026
গরুর গাড়ি আর তার কারিগরদের দিন ফুরালো হারোলিতে
পারি’র প্রতিবেদক সংকেত জৈন স্থির করেছেন সমগ্র ভারতবর্ষের অন্তত তিনশটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করবেন এবং একই সঙ্গে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত করবেন: গ্রামীণ জীবনের যে কোনও ঘটনা বা দৃশ্যকে ঘিরে একটি আলোকচিত্র তুলবেন এবং তারপর সেই আলোকচিত্রটিকে একটি স্কেচে রূপান্তরিত করবেন। পারির এই সিরিজের এটি অষ্টম প্রয়াস। স্লাইডারটি কোনও একটি দিকে টানলে আলোকচিত্রটি অথবা স্কেচটি সম্পূর্ণ দেখতে পাওয়া যাবে
Author
Editor
Translator
পারি’র প্রতিবেদক সংকেত জৈন স্থির করেছেন সমগ্র ভারতবর্ষের অন্তত তিনশটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করবেন এবং একই সঙ্গে আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত করবেন: গ্রামীণ জীবনের যে কোনও ঘটনা বা দৃশ্যকে ঘিরে একটি আলোকচিত্র তুলবেন এবং তারপর সেই আলোকচিত্রটিকে একটি স্কেচে রূপান্তরিত করবেন। পারির এই সিরিজের এটি অষ্টম প্রয়াস। স্লাইডারটি কোনও একটি দিকে টানলে আলোকচিত্রটি অথবা স্কেচটি সম্পূর্ণ দেখতে পাওয়া যাবে
“এইটিই সম্ভবত আমার মেরামত করা শেষ গরুর গাড়ি,” হারোলি গ্রামের দত্তাত্রেয় সুতার বলছিলেন। মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর জেলায় কাঠের গরুর গাড়ি নির্মাতা এবং মেরামতির শেষ কাজে দক্ষ হাতেগোনা কারিগরদের মধ্যে ৬০-বছর বয়সি দত্তাত্রেয় একজন। এখন অবশ্য তিনি শুধুই গাড়ি মেরামতের কাজ করেন।
হারোলি এবং তার পাশের গ্রাম নন্দানি এই শিরোল তালুকে সবচেয়ে সুন্দর ও নিপুণভাবে তৈরি গরুর গাড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল। আজ প্রায় ১০ বছর হল এই গ্রামগুলিতে এই গাড়ি তৈরি করার কারুশিল্প ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে আসছে। টেকসই গাড়িগুলো কৃষিপণ্য, ভাইরান (গবাদি পশুদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত একধরনের শুকনো ঘাস) বওয়া এবং মানুষের যাতায়াতের কাজে ব্যবহার করা হত।
“নন্দানির একজন কৃষক আমায় তাঁর এই গাড়ি মেরামত করতে দেন বছর চারেক আগে। কিন্তু সেটা আর ফেরত নিতে আসেননি। তারপর থেকে এটা আমার কাছেই রয়ে গেছে,” দত্তাত্রেয় বললেন। এই গাড়িটা (এখানে যেটির ছবি রয়ছে) এখন তাঁর কর্মশালার সামনে খোলা জায়গাটায় রাখা থাকে। প্রতিবেশীরা ওটার গায়ে ঘুঁটে শুকোতে দিয়ে গেছেন।
মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে দত্তাত্রেয় গরুর গাড়ি তৈরি করতে শুরু করেন। ছুতোর কারিগরদের পরিবারে তাঁকে নিয়ে আজ চার প্রজন্ম এই একই কাজ করে আসছে। নিজের বাপ ঠাকুরদাদের দেখে তিনি এই কাজ শিখেছিলেন। ৬ বছর বয়সে বাবাকে হারান দত্তাত্রেয়। তাঁর মা তখন কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি আরও জানালেন যে আগেকার দিনে এই গাড়ি ছাড়াও কাঠ দিয়ে চাষের কাজে ব্যবহৃত নানান সরঞ্জাম তৈরি করেছে তাঁদের পরিবার।
“প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শুধু পুরুষেরা এই কাজ করে এসেছেন। মহিলারা চিরকাল চাষবাসের কাজ করতেন।” স্বামীর কথা সম্মতি জানিয়ে তাঁর স্ত্রী কাঞ্চন (৫৫) এপাশ থেকে বললেন, “হ্যাঁ, (আমাদের পরিবারে) এই কাজটা পুরুষরাই করেন। আমি জমিতে কাজ করি।”
কিন্তু বলদ-টানা গাড়ি বাঁধার কাজ আর প্রায় নেই বললেই চলে। দত্তাত্রেয় ভেবে বললেন, “সেই শেষ এই গাড়ি তৈরি করার অর্ডার পেয়েছিলাম মোটামোটি বছর দশেক আগে।” এই ঐতিহ্যবাহী কাঠের চাকা দেওয়া গাড়ির জায়গা দখল করে ফেলেছে ট্র্যাক্টর এবং অনান্য (প্রধানত লোহার) ধাতু দিয়ে বানানো রাবারের চাকা লাগানো গাড়ি।
দত্তাত্রেয় যে গাড়িগুলো বানাতেন সেগুলো হত প্রায় ৭ ফুট লম্বা আর ৩.৫ ফুট চওড়া এবং গাড়ির চাকাগুলো ৪.৫ ফুট হত। এই গাড়ি তৈরি করতে কারিগরেরা সাঙ্গলী জেলার পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে খুব শক্তপোক্ত বাবুল কাঠ নিয়ে আসতেন। দত্তাত্রেয় বললেন, “এক একটা গাড়ি তৈরি করতে প্রায় ১০ ঘানফুট (১ ঘন ফুট=১ কিউবিক ফুট) বাবুল কাঠ ব্যাবহার করা হত।” কোনও রকম লোহার পেরেক ব্যাবহার হত না। কাঠের মধ্যে গর্ত করে সেইগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে জোড়া হত। শুধুমাত্র চাকার মাঝের অংশ এবং বাইরের অংশর জন্য লোহা ব্যাবহার করা হত।
দত্তাত্রেয় আরও জানালেন, “আটের দশকে ৬০০ টাকায় এই গাড়ি বিক্রি করার পরে আমাদের লাভ থাকত। তখন এক ঘনফুট বাবুল কাঠের দাম ছিল ৬ টাকা। এখন সেটাই বেড়ে ৬০০ টাকা হয়ে গেছে। শেষ যে গাড়িটা তৈরি করেছিলাম সেটাকে ২০০৮ সালে ৫,৫০০ টাকায় বিক্রি করি।”
একসময় এই পরিবারের জমজমাট কর্মশালায় দত্তাত্রেয় এবং তাঁর চার ভাই ছাড়া আরও ১০ জন ভাড়াটে কারিগর মিলে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করতেন। প্রত্যেক বছর সেপ্টেম্বর থেকে মে মাস অবধি ১০৫টি গরুর গাড়ি তৈরি হত। মহারাষ্ট্রর কোলহাপুর এবং সাঙ্গলী জেলা আর কর্ণাটকের বেলগাও জেলার কৃষকেরাই এই পরিবারের প্রধান খরিদ্দার মধ্যে ছিলেন।
“বর্ষাকালে আমরা গাড়ি তৈরি করতাম না। ওই সময়টায় এই গ্রামের কাছেই ইচকরঞ্জি শহরে ছুতোরমিস্ত্রি হিসেবে ভাঙ্গা জানালা আর চেয়ার সারাতে যেতাম। এই কাজের জন্য গ্রাম থেকে ২২ কিমি সাইকেল চালিয়ে যাওয়া আসা করতে হত,” দত্তাত্রেয় পুরোনো দিনের কথা মনে করে চলেন।
গরুর গাড়ি তার জনপ্রিয়তা হারালো কেন? দত্তাত্রেয় উত্তর দেন, “লোহা কাঠের চাইতে অনেক বেশি টেকসই এবং কেজি দরে মাত্র ৪০-৫০ টাকা। তাছাড়া বহু কৃষকেরই এখন গবাদি পশু পালন করার সামর্থ্য নেই। তাঁরা ট্র্যাক্টর ভাড়া করে চাষ করেন। এমন কি যে বাবুল কাঠ দিয়ে গাড়ি তৈরি হত সেই কাঠ এখন পাওয়া দুষ্কর,” [এটি বাবুল কাঠের চাহিদা বেড়ে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যাবহারের ফলশ্রুতি]।“
দত্তাত্রেয়র ছেলে মহাদেব, যার বয়স এখন প্রায় ৪০-এর কোঠায়, দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করে ধাতব কাজ (ফেব্রিকাশান) শিখেছেন। এই কাজে লোহা, অ্যালুমিনিয়াম এবং অন্যান্য ধাতু দিয়ে জিনিস গড়া হয়। এখন তিনি পরিবারের কর্মশালার দায়িত্ব নিয়েছেন। দত্তাত্রেয়র বিবাহিত মেয়ে ৩৪-বছরের মেঘনা বাড়ির কাজ সামলান।
পরিবারের কর্মশালায় এখন মাত্র ৩ জন কর্মচারি কাজ করেন। লোহার গাড়ি তৈরি করার পাশাপাশি মহাদেবের তত্ত্বাবধানে রয়েছে জানালার গ্রিল, সিঁড়ির পাশের রেলিং এবং কাঠের আলমারি তৈরি করা।
একটি লোহার গাড়ির দাম এখন ১০,০০০ থেকে ১৪,০০০ হাজার টাকার মধ্যে। দত্তাত্রেয় বলেন, “অনেক কৃষকের পক্ষেই এতটা টাকাটা খরচা করা সম্ভব নয় আর তাই শেষ কয়েক বছরে এই গাড়ির চাহিদাও পড়ে গিয়েছে।” তাই তিনি তাঁর এক একরের জমিতে মাঝেমধ্যে আখ চাষ করেন আর তাঁর কর্মশালাটির দেখাশুনো করেন। হ্যাঁ, সেই কর্মশালা, যা এককালে এই অঞ্চলের সেরা গরুর গাড়ি তৈরি করার জন্য বিখ্যাত ছিল।
অনুবাদ: অর্ণা দীর্ঘাঙ্গী
অনুবাদ সম্পাদনা: স্মিতা খাটোর
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/the-last-cart-the-last-craftsmen-of-haroli-bn

