হাটে আমি ধরমিকে বলি অত দূর থেকে এই বোঝা মাথায় করে এনেছেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। আমাদের চারপাশে জমে ওঠা ছোটোখাটো ভিড়টা থেকে প্রতিবাদ আসে। ধরমির চেয়েও বেশি দূর দূর থেকে আসেন অনেক মহিলা, ডজনখানেক কণ্ঠস্বর একসঙ্গে বলে ওঠে। যাচাই করার একটাই উপায়। পরের দিন থেকে আলাদা আলাদা পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়িয়া মেয়েদের সঙ্গে একই পথে হাঁটতে হবে আমাদের।
ভোর ৬টার সময় থেত্রিগোড্ডা পাহাড়ের যাত্রাপথের আধাআধি পৌঁছতে পৌঁছতে বুঝে গেছি, কাজটা কিঞ্চিত বোকামি হয়ে গেছে। এক-একটা পাহাড়িয়া গ্রামে পৌঁছতে দুই থেকে তিনটে টিলা পার করতে হয়। আট কিলোমিটার পথ হাঁটি আমরা, যার অনেকটাই চড়াই। উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরার পর দেখতে পাই তাঁদের। হাতে কাস্তে নিয়ে পর পর সার বেঁধে জঙ্গলের পথে এগিয়ে চলেছেন পাহাড়িয়া মেয়েরা। তাঁদের ক্ষিপ্র, অভ্যস্ত গতির সঙ্গে পেরে উঠি না আমরা, হাঁচড়-পাঁচড় করতে করতে এগোই পিছন পিছন। পথে যেতে যেতে আরও কিছু মেয়েদের দলের সঙ্গে দেখা হয়, কেউ জঙ্গলের দিকে যাচ্ছেন, কেউ গ্রামের দিকে। প্রত্যেক মেয়ের মাথায় বিরাটাকৃতি জ্বালানি কাঠের বোঝা, এক-একটা ৩০-৪০ কিলো তো হবেই।
*
পাহাড়িয়া নারীর এই শারীরিক সক্ষমতা ও প্রাণশক্তির আপাত ছবিটার আড়ালে রয়ে যায় যে বাস্তব, তা হল এঁদের মধ্যে খুব অল্পজনই পঞ্চাশের বেশি বয়স অবধি বাঁচেন। গোড্ডার বহু পাহাড়িয়া গ্রামেই এই বয়ঃসীমার বাইরে নারী বা পুরুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বহু মহিলা তো পঁয়তাল্লিশও পেরোন না।
হাটে যেদিন জ্বালানি নিয়ে যান সেদিন সারাদিনে ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হাঁটেন গুহি পাহাড়িনি। কিন্তু তাঁর ছোট্ট জীবনে হাঁটাপথের খতিয়ানে এই দূরত্বটা কিছুই নয়। জল আনতে দিনে ছয় থেকে আট কিলোমিটার হাঁটতে হয় তাঁকে।
“জলের জায়গাটা খুব দূরে নয়”, খুশিমনে বলেন তিনি (দূরে নয় মানে দুই কিলোমিটার)। “কিন্তু একবারে তো খুব বেশি নিতে পারি না। তাই এক-একদিন ওই রাস্তাটা তিন-চারবার যেতে-আসতে হয়।” এটা সপ্তাহে দু’বার হেঁটে হাটে যাওয়ার বাইরে। জলের জায়গা ‘মাত্র’ দুই কিলোমিটার হলেও সেখানে যাওয়ার পথ খাড়াই ও দুর্গম, শরীরে ভালোই চাপ পড়ে।
গুহির জীবন অসাধারণ কিছু নয়। বেশিরভাগ পাহাড়িয়া মেয়ের জীবনই এরকম। বর্ষায় পিচ্ছিল বিপজ্জনক উৎরাই ঢাল বেয়ে নামতে নামতে আমরা সেই জীবনের একটা আন্দাজ পাই। গুহির মতো পাহাড়িয়া নারীরা বছরে চার-পাঁচবার দিল্লি থেকে বম্বের দূরত্বের সমান পথ হেঁটে যাতায়াত করেন।
পুরুষরা পাহাড়ের ঢালে ঝুমচাষ পদ্ধতিতে স্থানান্তর কৃষি করে থাকেন। এই চাষপদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে উপকারী, কিন্তু সেটা ফলপ্রসূ হতে হলে চাষ-করা জমি দশ বছরের জন্য ফেলে রাখতে হবে আগের মতো জঙ্গল সেখানে ফিরে আসার জন্য। এককালে পাহাড়িয়ারা সেভাবেই চাষ করতেন। কিন্তু ঋণের বোঝা, জমির উপর জনসংখ্যার চাপ, এবং রুটিরুজির চাহিদা থেকে দশ বছরের অনেক আগেই একই জায়গায় আবার জঙ্গল পুড়িয়ে চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। স্বাভাবিক জীবনচক্র বাধা পাওয়ায় ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে জঙ্গল। তাছাড়া, একই জায়গায় বার বার চাষ করলে প্রতিবার আগের থেকে কিছু কম করে ফলন হয়।
এখানে ফলানো কিছু ধরনের ডালশস্য বম্বের বাজারে চড়া দামে বিকোয়। পাহাড়িয়ারা অবশ্য সেই দাম পান না। “আমায় যে মহাজন ধার দিয়েছে আমায় তাকেই ফসল বেচতে হয়,” জানালেন চন্দ্রশেখর পাহাড়িয়া। কিলো প্রতি এক টাকা দরে ফসল বেচতে হয় তাঁকে। বেশিরভাগ সময়ে ফলানো ফসল নিজেদের ব্যবহারের জন্যও রাখতে পারেন না পাহাড়িয়ারা। সবই মহাজনের কাছে ‘বিক্রি’ হয়ে যায়। ড. দারাধিয়ারের সমীক্ষা বলছে পাহাড়িয়াদের রোজগারের ৪৬ শতাংশ সরাসরি যায় মহাজনদের ঋণ শুধতে। পরোক্ষভাবে যায় আরও ৩৯ শতাংশ (নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার মাধ্যমে)।
ন্যাড়া পাহাড়ের ঢালগুলোর করুণ দশা দেখতে দেখতে, হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা মেয়েদের পিছন পিছন এক টিলা থেকে নেমে আর এক টিলায় উঠি। পথে যে গ্রামগুলি পড়ে, সেখানে স্কুল বলতে যদি কিছু থাকে তাহলে ফাঁকা স্কুলবাড়ি একটা, নয়তো শুধু কাগজে-কলমেই অস্তিত্ব তাদের। সাক্ষর পাহাড়িয়া নারী খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।
ছবি তোলার জন্য মহিলাদের ২০ মিটার সামনে সামনে চলাটা মোটেই সহজ কাজ নয়। চাঁদিফাটা রোদ আর তাঁদের হাঁটার গতির সঙ্গে যখন আর পারব না মনে হচ্ছে, তখনই থামলেন তাঁরা, পাহাড়ের ঢালে একটু জিরিয়ে নিতে আর পাশের ঝোরা থেকে জল খেতে। হাঁপ ধরে যাওয়া ফুসফুস আর পাংচার হওয়া প্রেস্টিজকে একটু শান্তি দেওয়ার সুযোগ পেলাম আমরাও। তিন ঘণ্টার উপর হাঁটছেন তাঁরা।
ড. দারাধিয়ারের সমীক্ষা বলছে, এখানকার ঝোরাগুলিতে আয়োডিনের পরিমাণ কম, “গুণমান ভালো নয়।” তাঁর কথায়, জলের এই অবস্থা এখানকার মানুষের “সার্বিকভাবে খারাপ স্বাস্থ্যের জন্য দায়ী।”
জল জোগানোর কোনও ব্যবস্থাই এখানে নেই। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অবহেলায় যা ছিল তাও ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে পাহাড়িয়াদের মধ্যে জলবাহিত রোগের প্রকোপ খুব বেশি। তার অন্যতম ডায়রিয়া, আন্ত্রিক, এবং যকৃত বড় হয়ে যাওয়া। যক্ষ্মা, গয়টার এবং সিকল সেল অ্যানিমিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগেও ভোগেন অনেকে। এছাড়া ম্যালেরিয়ার রাজত্ব এখানে। ডোরিও গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ ৪৫ বছরের গান্ধে পাহাড়িয়া বলছেন, “এখানে কারও যদি খুব অসুখ করে, নিয়ে যাওয়ার জন্য আশপাশে কোনও হাসপাতাল নেই। এই দুর্গম রাস্তায় খাটিয়ায় বাঁশ বেঁধে অন্তত ১৫ কিলোমিটার তাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
মেয়েদের জল খাওয়া শেষ, তাঁরা আমাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবার। এই অঞ্চলের মেয়েরা হবু শ্বশুরবাড়িতে যখন থাকতে যান তখন তাঁদের জল বয়ে নিয়ে আসার দক্ষতার পরীক্ষা হয়। পাহাড়িয়াদের মধ্যে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার অনেক পরেও হতে পারে বিবাহের অনুষ্ঠান।
সবদারপাহাড়িয়া ব্লকের উপর সিদলার গ্রামের বর্ষীয়ান এতরো পাহাড়িয়া জানালেন, জল এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। “আমাদের শর্তে যদি মেয়ে জল বয়ে নিয়ে আসতে পারে, তবেই তাকে গ্রহণ করা হবে।”
সাঁওতাল পাহাড়িয়া সেবা মণ্ডলের গিরিধর মাথুর গত ১৪ বছর ধরে এই জনজাতির সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁর মতে এই ‘অপেক্ষা’র সময়ের বিষয়টা একটু বাড়িয়ে-চাড়িয়ে বলা হয়। পুরুষদের কাজের ক্ষমতার কোনও পরীক্ষা নেওয়া হয় না সেটা মেনে নিচ্ছেন তিনি। তবে একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে বলছেন যে পাত্রের বাড়িতে গিয়ে থাকার পর অন্য কোনও কারণে মেয়েটিও বিয়েতে রাজি না হতে পারে।
*
তেথরিগোড্ডা আর ভোদা খোটার মাঝে উৎরাইটা প্রবল খাড়াই, পিচ্ছিল আর খোঁচালো পাথরে ভর্তি। পাহাড়িয়াদের অবশ্য ভ্রূক্ষেপ নেই। মাথুরের কথায়, “এখানে রাস্তা থাকলে সেটা শোষণের চিহ্ন, উন্নয়নের নয়।” তাঁর কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সমতলের কাছাকাছি থাকেন যে পাহাড়িয়ারা, পাহাড়ের মাথার গ্রামে থাকা পাহাড়িয়াদের তুলনায় তাঁদের মহাজনের ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
যেসব ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ এখানে এসেছে তার একটিতেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পাহাড়িয়াদের রাখা হয়নি। একবার একটা পরীক্ষা করা হয়েছিল, প্রতি পাহাড়িয়া পরিবারকে দুটো করে গরু দেওয়া হয়েছিল। পাহাড়িয়ারা গরুর দুধ ব্যবহারই করেন না – তাঁদের মতে গরুর দুধ তো বাছুরের পাওয়ার কথা।
দুগ্ধজাত খাবারও খান না পাহাড়িয়ারা, কিন্তু সেটা কারও জানা ছিল না। যেটা তাঁরা খান তা হল গোমাংস, ফলে ‘ধার’ দেওয়া সেইসব গরুর তেমনই পরিণতি হয়েছিল। অন্যরা গরুদের মোট বওয়ার কাজে ব্যবহার করছিলেন, কিন্তু দুর্গম পথঘাটের কারণে তারা অচিরেই প্রাণ হারায়। দেশের দরিদ্রতম মানুষগুলিকে এরপর এমন একটা ঋণ শোধ করতে বাধ্য করা হয় যা তাঁরা নিজেরা চানইনি।
মাথুর জানাচ্ছেন, সরকারি তহবিল শুধু “ঠিকাদারদের দল ভারি করেছে।” দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসকদের কাছ থেকে ঘাড়ধাক্কা খেয়ে খেয়ে পাহাড়িয়ারা আরও বেশি করে মহাজনদের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। রাজনীতি-সচেতন পাহাড়িয়া মধুসিং পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ করলেন ভালো। “অফিসাররা ক্ষণিকের বাস্তব। মহাজনরা চিরকালীন বাস্তব।”
রাজনৈতিক আন্দোলন এখানে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। ষাট ও সত্তরের দশকে সিপিআই-এর নেতৃত্বে একটি আন্দোলন মহাজনদের কবল থেকে পাহাড়িয়াদের জমি ফেরত এনেছিল। কিন্তু সরকার তারপর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি, ফলে আগের অবস্থাতেই ফেরত যায় সব। এলাকায় একাধিক এনজিও রয়েছে, যারা যথেষ্ট সদিচ্ছা নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করে চলেছে, কিন্তু সাফল্য পায়নি।
ড. দারাধিয়ার ও তাঁর সহ-গবেষক ড. পি কে ভর্মা মনে করেন, এই জনজাতি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার সেটা স্বীকার করে না, তবে সেটার যে আশঙ্কা আছে সেটা মানে। এর মোকাবিলা করতে সরকার একাধিক যোজনার ঘোষণা করেছে যেগুলো পাহাড়িয়াদের বিশেষ কাজে লাগার নয়, কিন্তু মহাজন ও ঠিকাদারদের খুব সুবিধা করে দিয়েছে। মধুসিং বলছেন, “এই করে করে আমাদের জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জমি কমছে, যন্ত্রণা বাড়ছে।”
*
পাহাড়পুর পেরিয়ে অনেকটা গিয়ে যখন শেষ অবধি হাটে পৌঁছই, ওই মহিলাদের যেখানে প্রথম দেখেছিলাম সেখান থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি। সারাদিনে প্রায় ৪০ কিলোমিটার হেঁটেছি সেদিন। আগামী আট দিন এই একই কাজ করতে হবে ভাবলে মোটেই আনন্দ হচ্ছে না। আমাদের সামনেই মহিলারা ওই ৩০-৪০ কিলোর জ্বালানি কাঠ বিক্রি করলেন – বান্ডিল প্রতি পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে।
গোড্ডায় পরের দিন সকালে সারা গায়ে ব্যথা নিয়ে ১৯৪৭ সালে বসানো ‘মুক্তিস্তম্ভ’ দেখতে যাই। তালিকায় প্রথম নামটি একজন পাহাড়িয়ার, বস্তুত তালিকার বেশিরভাগ শহীদই পাহাড়িয়া।
স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রথম বলিপ্রদত্ত তাঁরা, স্বাধীনতার ফলভোগে সবার শেষে।
পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সৌজন্যে পি সাইনাথ রচিত ‘এভরিবডি লাভস আ গুড ড্রাউট’ থেকে গৃহীত।
অর্ডফ্রন্ট-এর বিংশ শতাব্দীর সেরা প্রতিবেদন সংকলনে ‘জীবনযন্ত্রণার পাহাড়’ নির্বাচিত ও প্রকাশিত হয়েছে।
অনুবাদ: দ্যুতি মুখার্জি