দেশজুড়ে জোরকদমে সাক্ষরতা অভিযান চলছে তখন। আমার এক সরকারি চাকুরে বন্ধুর সঙ্গে ঘটনাচক্রে গিয়ে পড়েছিলাম আজমের জেলার এক গাঁয়ে। সেখানে বেশ চোখে পড়ার মতো এক স্কুলবাড়ির পাঁচিলে দেখি বেপরোয়া একখানি দেওয়াল-লিখন: 'সাক্ষরতা কি ক্যা পেহচান? উপর চাড্ডি, নিচে বানিয়ান (সাক্ষরতা চিনব কিসে? চাড্ডি গায়ে, গেঞ্জি নিচে)’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার আধিকারিক বন্ধু গ্রামবাসীদের কাছে এহেন দেওয়াল-লিখনের হেতু জানতে চাইলে, সাফ উত্তর পান, “আমাদের বালবাচ্চার জন্য ইস্কুল চালানোর বেলায় তো তোমাদের দেখি না। গাঁয়ে থাকবে না বলে মাস্টারেরা দিনের পর দিন ছুটি করে। তোমাদের আসা-যাওয়ার বন্দোবস্তটাও তো অকেজো। কিন্তু পরে যখন আমাদের আর শরীর দেয় না, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকে, তখন তোমরা আমাদের অক্ষর চেনাতে হাজির হও। ইস্কুলগুলোকেই একটু চালাও না বাপু তার চেয়ে।"
রাজস্থানে সরকার এসেছে-গেছে। এইসব কথায় কান দেয়নি। শাসকশ্রেণির অভিজাতদের বাচ্চাকাচ্চারা সব দামী দামী বেসরকারি স্কুলে পড়ে কিনা, সেজন্যই হয়তো। কিন্তু বর্তমান সরকারের জবরদস্ত সিদ্ধান্তটির কাছে সবই ফিকে – ১৭০০০ স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে ঠিক করা হয়, তার প্রায় পুরোটাই গ্রামাঞ্চলে। ফের স্কুলগুলো খোলার দাবিতে লোকে প্রতিবাদ করতে নামলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যাঁরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি কোনওদিন, তাঁদের এবার আর ভোটেও দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।
ভোট-যুদ্ধে বাতিল যাঁরা
সরপঞ্চ আর পঞ্চায়েত সমিতি সদস্য নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে বিনাবাক্যব্যয়ে বিধানখানা জারি হয়ে গিয়েছিল – আট আর দশের ক্লাসে পাশ করা থাকলে তবেই মিলবে ভোটে দাঁড়ানোর ছাড়পত্র। বিস্ময়ের ঘোরটা কাটিয়ে রাজস্থানের গ্রামাঞ্চলে রীতিমতো ক্ষেপে ওঠে লোকজন। এমনকি শাসকদলের সমর্থকরাও বাদ যাননি। এই রায় মানলে তো গ্রামীণ মহিলাদের ৯৫ শতাংশ আর মোট ভোটাধিকার প্রাপ্ত জনতার ৮০ শতাংশই ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না আর। এমন একটা খামখেয়ালি পদক্ষেপ নিয়ে তাই হাজারও প্রশ্ন ওঠে।
তবে সেসব প্রশ্নের উত্তর একটাই। তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবে অভিজাতদের কব্জায় আনার জন্যই ইচ্ছে করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। এতে করে এক ঢিলেই যেমন আমজনতার ওপর দোষ দেওয়া যায়, পড়াশোনা না শেখার দায় চাপানো যায়, অন্যদিকে মুষ্টিমেয়র হাতেই রেখে দেওয়া যায় ক্ষমতার রাশ। কিন্তু সরকারের তো সবার মতামতকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কোনওকিছু ঠিকভাবে না পৌঁছলে তার জন্য তো আর ভুক্তভোগীদেরকেই সাজা দেওয়া চলে না। যেহেতু নারী, দলিত আর আদিবাসীরা রয়েছেন গোটা সমাজ কাঠামোটার একেবারে নিচে, তাই তাঁদেরকেই এসব সিদ্ধান্তের ফলে সবচাইতে বেশি ভুগতে হয়।
জীবনের চল্লিশটা বছর ধরে গ্রামীণ ভারতের নিরক্ষর কিন্তু উচ্চশিক্ষিত মানুষজনের থেকে বিশেষ করে গণতন্ত্র, নৈতিকতা আর শাসনপদ্ধতির পাঠ পেয়েছি আমি। নিজেদের মধ্যে বিদ্যে দেওয়া-নেওয়াও করেছি। (আজমের জেলার) হর্মারার অধুনা সরপঞ্চ নৌরতির কথাই ধরা যাক। নৌরতি "নিরক্ষর" বটে, কিন্তু পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে কম্পিউটার ব্যবহার শিখেছেন তিনি। এখন মধ্য আর উচ্চ বিদ্যালয়ের স্কুলছুট বাচ্চাদেরকেও এ যন্ত্রটি ব্যবহারের কায়দাকানুন শেখান। ক্লাস এইট পাশের শংসাপত্র তাঁর নেই, কিন্তু তাতে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের ওয়েবসাইট ইস্তেমাল করতে তো বাধে না। আমাদের মধ্যে কে এই ব্যাপারে সবচাইতে পটু সেইটে নিয়ে অবশ্য মতবিরোধ থাকতে পারে। মোদ্দা কথাটা হল, নৌরতিকে মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের মাথায় বসানো হোক কিংবা তাঁকে শেক্সপিয়ার পড়াতে দেওয়া হোক – এমন কোনও সুপারিশ করতে যাচ্ছি না। কিন্তু পঞ্চায়েতের শাসনক্ষমতা নিয়ে আমার চেয়ে ঢের বেশি জ্ঞান তাঁর আছে।
বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার উদ্ভাবন, গ্যালিলিও কী কালিদাস নিয়ে প্রথাগত ধাঁচের বাইরে আমার পড়াশোনা নিঃসন্দেহে বেশ একটা সার্থক দৃষ্টিকোণ দিয়েছে আমায়। কিন্তু বিতর্কিত কোনও বিষয় এলে, পঞ্চায়েতের প্রধান প্রধান সদস্যদের নিয়ে বসে কেমন করে একটা জটিল আর ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তের দিকে এগোনো যায় তার খুঁটিনাটি কি নৌরতির মতো আদৌ জানি আমি? টাকাপয়সা বা জাতের জোর না থাকা সত্ত্বেও সতীপ্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেভাবে লোকের রাগঝালের লক্ষ্য হয়েছেন তিনি, আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সত্ত্বেও অবিচল থেকেছেন, অমন ক্ষমতা কখনও আমার হত কিনা জানা নেই। নীতিজ্ঞানশূন্য, ভন্ড লোকজনের ফাঁদে পা দেওয়ার বান্দা নৌরতি নন। সাদা কাগজে কয়েকটা কীসব হিজিবিজি লেখা তাঁর বোঝার বাইরে, তবু সে ফাঁদেও পড়বেন না তিনি।




