প্রতিটি ট্রাক-সওয়ার রিগের লেজুড় হিসেবে আবার বড়ো গাড়িও থাকে একটা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কর্মীদলের যাতায়াতের জন্য। সে দলে একজন ম্যানেজার, দু’জন ড্রিলার, দু’জন সহকারী, দু’জন চালক, একজন রাঁধুনি এবং ১২ জন মজুর সহ ২০ জন পর্যন্তও থাকতে পারেন।
এই শ্রমিকদের সুবাদেই তিরুচেঙ্গোড়ের কাজকর্ম আরও এক সর্বভারতীয় মাত্রা পায়। তামিলনাড়ুর রিগ অপারেটরদের প্রতিটি রাজ্যেই এজেন্ট ও দালাল থাকে। শ্রমিকদের বেশিরভাগই আসেন বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড় থেকে, তামিলনাড়ুর বাসিন্দা এক্ষেত্রে হাতেগোনা। বছরের বেশ কয়েক মাস ধরে চলতে পারে এই কাজ, যার জন্য দৈনিক ২০০ টাকা, সঙ্গে তিন বেলার খাবার বাঁধা মজুরি হিসেবে তাঁরা পেয়ে থাকেন।
এতে খাটুনি অনেক, আর কাজ কতটা কঠিন তা বিবেচনা করে দর হাঁকা হয়। অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু শক্ত মাটির এলাকায় এক ঘণ্টায় ৮০ ফুটের বেশি খোঁড়া যায় না। এরকম জায়গায় প্রতি ফুটে ৭৫ টাকা করে ধার্য থাকে, ফলে দিনে ১,০০০ ফুট খনন করতে পারলে আয় হয় ৭৫,০০০ টাকা। আবার যে “লুজ ফরমেশন” মাটিতে ঘণ্টায় ১২০ ফুট পর্যন্ত খোঁড়া যায় বলে ভাইয়াপুরি জানিয়েছিলেন, সেখানে দর কমে ফুটপিছু ৫৬ টাকায় নেমে আসে। তবে চাইলে সেক্ষেত্রে দিনে প্রায় ১,৩০০ ফুট পর্যন্ত খনন চালিয়ে ৭৩,০০০ টাকা রোজগার করাও অসম্ভব হয় না। এমনকি কেউ যদি বছরে মাত্র ২০০ দিনের জন্যও কাজ করেন (প্রায়শই তার চেয়ে ঢের বেশি করতে হয়) তাহলেও সব মিলিয়ে আয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১.৫ কোটি টাকা।
তিরুচেঙ্গোড়ে গঞ্জ আর তালুক মিলে মোট কতগুলো রিগ আছে? ৫,০০০ এর বেশি নয়, জানান শীর্ষস্থানীয় ড্রিলিং রিগ-নির্মাণ সংস্থা পিআরডি-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর টি.টি. পারান্থামান। অন্যদিকে তিরুচেঙ্গোড়ে লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (লরি মালিক সমিতি) সভাপতি এবং খোদ রিগ-মালিক এন.পি. ভেলুর অনুমান যে সংখ্যাটা প্রায় ৭০০০। তবে অন্য রিগ-অপারেটরেরা অবশ্য জোর দিয়ে বলেন ২০,০০০ পর্যন্ত মেশিন আছে এ অঞ্চলে। এবার আলাদা আলাদা দিক থেকে ভাবলে এই তিনটে হিসাবই ঠিক হতে পারে। এ শিল্পক্ষেত্রের অভিজ্ঞ এক ব্যক্তি বলেন, “এখানে অনেক রিগ-মালিক আর মেশিন আছে। তবে অনেক রিগের নাম অন্য রাজ্যের খাতায় তোলা হয়েছে, সম্ভবত কর সংক্রান্ত কারণে।”
ইতিমধ্যে, রিগ-অপারেটররা রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মতো দূরদূরান্তের এলাকা থেকেও কাজ সেরে ফিরছেন এখন। তাঁদের মধ্যে একজন জম্মুতেও বোরওয়েল বসিয়েছেন এমনকি। বছরে দু-তিন মাস রিগ যন্ত্রগুলো একটু মেরামতি করিয়ে চাঙ্গা হবে বলে কাজ থেকে ছুটি নেয়। আর সাধারণত বর্ষা এলেই শুরু হয় এই বিরতির পালা।
রাজ্যভেদে কিন্তু বোরওয়েলের গড় গভীরতা আলাদা আলাদা, বলছিলেন এন.পি. ভেলু। “কর্ণাটকে ওই গড় এখন প্রায় ১,৪০০ ফুট। তামিলনাড়ুতেও এর চেয়ে খুব একটা কম নয়। ১৯৭০-এর দশকে একবার খরা হয়, সেই থেকে এসবের শুরু।” এই ক্ষেত্রে সুযোগের সম্ভাবনা দেখে বোরওয়েল বসানোর কাজে যুক্ত কৃষক ও শ্রমিকদের কয়েকটি দল নিজেদের অর্থ ও অন্যান্য সম্পদ একত্র করে কিছু রিগ যন্ত্র কিনে নেয় (আজও এখানকার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রিগ এই ধরনের গোষ্ঠীর মালিকানাধীন)।
“সেকালে জল পেতে ১০০-২০০ ফুটের বেশি খুঁড়তে হত না,” বলছিলেন ভেলু। “খুব বেশি হলে ৩০০ ফুট। গত পাঁচ বছরেই কূপগুলো আরও গভীর করে খুঁড়তে হচ্ছে।”
এই শহরের রিগ-অপারেটরদের কাহিনি শুনে বড়ো দোটানায় পড়ে যাই। তাঁদের হাত ধরেই তিরুচেঙ্গোড়ে ও আশপাশের এলাকায় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। এই দলে সেই একদা নিরক্ষর শ্রমিকরাও আছেন যাঁরা কিনা ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে একজোট হয়ে রিগ কিনেছিলেন আর সেই জোরেই অভাব-অনটন কাটিয়ে উঠেছিলেন। (কোয়েম্বাটোর, করুর ও তিরুপ্পুর-সহ তামিলনাড়ুর এই গোটা অঞ্চলেই সমাজের তৃণমূল স্তরের উদ্যোগে ব্যবসা গড়ে ওঠার এক চমৎকার ইতিহাস রয়েছে)। তাছাড়া, হাজার হোক, দেশজুড়ে কৃষকদের গভীর হতাশা ও অসহায়তা থেকে উঠে আসা একটা বাস্তব চাহিদাও তো এই রিগ-অপারেটররাই মেটাচ্ছেন।
উল্টোদিকে এই সমাধানই আবার আদত সমস্যাটার পালে হাওয়া লাগাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ জলের জোগানের ক্ষেত্রে ডেকে আনছে এক ভয়াবহ পরিণতি। ব্যবহারযোগ্য জলসম্পদের অবাধ উত্তোলনের ফলে দেশজুড়ে দ্রুত নেমে যাচ্ছে ভৌম জলের স্তর। ২০১৩ সালের মার্চে মারাঠওয়াড়ার ওসমানাবাদ জেলার কালেক্টর জানিয়েছিলেন, তাঁর জেলায় (যেখানে জোরকদমে রিগ মেশিন চলেছে বহুদিন) ভূগর্ভস্থ জলের স্তর গত পাঁচ বছরের গড় গভীরতার চেয়ে পাঁচ মিটার নিচে নেমে গিয়েছে।
তামিলনাড়ুর একটি মাত্র অঞ্চল থেকে আসা ১০,০০টা যন্ত্র যদি সারা ভারতে প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ ফুট করে খনন করে, তাহলেও দিনে মোট ১ কোটি ফুট খোঁড়া হয়। বছরে মাত্র ২০০ দিনও যদি এভাবে খনন করা তবে সেই পরিমাণ দাঁড়াবে ২০০ কোটি ফুট। অর্থাৎ খনন হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। এমনকি একাজে ব্যর্থতার হার অনেক বেশি হলেও প্রচুর জল আসলে তুলে নেওয়া হচ্ছে প্রতি বছর।
দেশের উন্নয়নের এই পথ তিরুচেঙ্গোড়ের রিগ-অপারেটররা বেছে নেননি এবং এর জন্য তাঁদের দোষারোপও করা চলে না। ভূগর্ভস্থ জল অবাধ উত্তোলনের রাশও তাঁদের হাতে নেই। আর তাঁরা এই ক্ষেত্রে প্রধান চালিকা-শক্তি হিসেবে কাজ করলেও, দেশের অন্যত্র আরও অনেক রিগ-অপারেটর রয়েছেন। অন্যান্য নানান কাজও এই যন্ত্র দিয়ে করা যায়, যদিও বোরওয়েল খননের জন্যই রিগের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আর বোরওয়েলের বাড়বাড়ন্তেই বিপর্যয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। (ভারতে সেচের জলের দুই-তৃতীয়াংশ এবং পানীয় জলের চার-পঞ্চমাংশেরও বেশি আসে ভূগর্ভস্থ জল থেকে)। এর উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠলেও বর্তমান শাসন-ব্যবস্থায় জল সংক্রান্ত নীতিনিয়ম দেখে আদৌ ভরসা জাগে না।
“আপনাদের নিজেদের এলাকাতেই এত কম রিগ কেন কাজ করছে?” তিরুচেঙ্গোড়ের এক অভিজ্ঞ রিগ-অপারেটরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, “এখানে এখন আর তেমন জল নেই। কাছের ইরোড শহরে ১,৪০০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করতে হয়েছে আমাদের।” পরিণতিটা সহজেই অনুমেয়।
এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই দ্য হিন্দু পত্রিকায়
আরও পড়ুন: জল সংকট: উবে যেতে থাকা বিন্দু বিন্দু আশা
এই প্রতিবেদনটি যে সিরিজের অংশ, তার জন্য ২০১৪ সালে পি. সাইনাথ ওয়ার্ল্ড মিডিয়া সামিট গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সেলেন্স সম্মানে ভূষিত হন।