নড়বড়ে হুইলচেয়ারটাকে কাছে টেনে নিলেন তিনি। আজকাল যে পুরোনো হাসপাতালের বেডটায় তাঁর দিন কাটে, সেদিকেই এগিয়ে আনলেন। কাঠের কড়ি-বরগা থেকে একটা ছেঁড়াখোঁড়া গিঁট পাকানো ন্যাকড়া ঝুলছিল, সেটাকে বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরলেন শক্ত করে। ডান হাতের ভরে কোমরের ওপর দিকটা মুচড়ে ঠেলে আস্তে করে নিজেকে বসিয়ে ফেললেন হুইলচেয়ারে। তারপর এক এক করে হাত দিয়ে নিজের পা দুটো ধরে ধরে নামিয়ে চেয়ারের পাদানিতে রাখলেন। এমন নিপুণভাবে সবটা সামলালেন, বোঝা গেল এর আগে হাজারবার এ কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। ঠিক যেমন বিলিগিরিরঙ্গনা পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে লম্বা লম্বা গাছগুলো তরতরিয়ে বাইতেন এককালে। ওইভাবেই তো একদিন…


Chamarajanagar, Karnataka
|THU, MAR 19, 2026
বিআর পাহাড়ের সেই ডানাভাঙা পাখি
কর্ণাটকের বিআর পাহাড়ে উঁচু-উঁচু গাছগাছালি থেকে মধু সংগ্রহ করতেন এক সোলিগা আদিবাসী যুবক। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সব খুইয়ে আজ কেবল নিজের গানটুকুই খুঁজে ফিরছেন তিনি
Author
Editor
Photo Editor
Translator

M. Palani Kumar
"তখন ওই সন্ধে ছ'টা মতো বাজে। বৃষ্টি পড়ছিল। গাছের ছাল-টাল হড়হড়ে হয়ে ছিল। তারে মারা [বহেড়া বা টেরিমিনালিয়া বেলিরিকা] গাছটায় একখানা মস্ত চাক দেখতে পেয়ে ওইটাকেই কাটব বলে ঠিক তার পাশের একটা হোন্নে মারা [পিয়াশাল বা টেরোকার্পাস মারসুপিয়াম] গাছ বেয়ে উঠেছিলাম। এসব তো বড়ো বড়ো গাছ। খুব উঁচু।" অরুণ কুমার যে গাছগুলোর কথা বলছিলেন তারা আদতে ১৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
"হাতে ওই ধোঁয়া-ওঠা মশালটা ধরেই ছিলাম, তাও মৌমাছিগুলো এমন হুল ফোটাচ্ছিল – আমি তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নামতে পারলে বাঁচি। হঠাৎ পা-টা পিছলে গেল – সোজা ছিটকে পড়লাম ২৫ ফুট নিচে, মাটির ওপর একদম চিত হয়ে।" সেই ভয়ানক সন্ধেটার কথা বলতে গিয়ে আজও আতঙ্কের ছায়া পড়ে তাঁর মুখে। তারিখটাও ভোলেননি – ১২ মে, ২০২৪। এদিনই নিজের দু'পায়ে দাঁড়াতে পেরেছিলেন শেষবারের মতো।
অরুণের হাতদুটো ভাঙাচোরা চেয়ারখানা চালিয়ে নিয়ে যায় তাঁর ৮×১০ ফুটের টিনের ছাউনির দরজার দিকে। অন্ধকার ঘুপচি ঘরখানায় ওই ফাঁক দিয়েই যেটুকু যা আলো আসে। ইট আর মাটির তৈরি যে বাড়িতে পরিবারের আর সকলের বাস, তারই আড়ালে যেন মুখ লুকিয়ে থাকে তাঁর এই এক চিলতে খুপরি। এর চেয়ে বরং বেশি চোখে পড়ে, উল্টোদিকে কয়েকটা খুঁটির ওপর বসানো পায়রাদের খোপগুলো, তাতে কয়েকটা পায়রা আছে এখনও। অরুণের বাবাই দেখভাল করেন তাদের।

Pratishtha Pandya

M. Palani Kumar
"একটা লোক নেই সাহায্য করার মতো। সকালে আমি নিজেকে উঠিয়ে বাইরে আনি, রোদে বসে থাকি," বলতে বলতে বছর চব্বিশের তরুণ এবার চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিজের খুপরির পেছনে একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গায় নিয়ে আসেন। জায়গাটাকে চারদিক থেকে ঘিরে থাকা সিলভার ওক গাছগুলোর ডালপালার মধ্যে দিয়ে সবে তখন চুঁইয়ে ঢুকছে সকালের রোদ্দুর।
সাধারণত, বছরের এই সময়টার মধ্যে, বাড়ির লোকেদের সঙ্গে হাতে হাতে এইসব গাছের একেবারে ওপরদিকের ডালপালা ছেঁটে দিতেন অরুণ, যাতে তাঁদের কফি গাছগুলো একেবারে মাপমতো সূর্যের আলো পায়। এ বছর লোক ডেকে করানো ছাড়া গতি নেই, অথচ মজুরি দেওয়াও সাধ্যে কুলোবে না। অতএব গাছেরা বেড়েই চলেছে খেয়ালখুশি মতো।
শীতের সূর্য রঙ্গমঞ্চের মতো আলোর বৃত্ত রচনা করেছে এক জায়গায়। তার ভেতরে ঢুকে আসেন অরুণ।
"মরসুম পড়লে দু'পয়সা রোজগারের জন্য মধু জোগাড় করতে বেরোতাম। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে মোটে পাঁচ-ছ'হপ্তাই এসব করা যায়," তিনি জানান। "গরমকালে তো বাইরে কোথাও কাজ জোটে না। বাড়িতেও পয়সার টানাটানি লেগেই থাকে। তাই আমরা চার-পাঁচজন বন্ধু দল পাকিয়ে একটু রোজগারপাতির আশায় এই কাজ শুরু করেছিলাম।" অল্প কিছুই পেতেন, তাতেই সংসারে খানিক সুরাহা হত।

Courtesy: Arun
"বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরেফিরে বেড়াতে তো ভালোই লাগত, কিন্তু ক্লাসে যে কী শেখানো হচ্ছে পুরোপুরি মাথায় ঢুকত না। সাতের ক্লাসে উঠে পড়া ছেড়ে দিলাম," অরুণ বলছিলেন। "অন্য বাচ্চাদের দেখাদেখি গাছ বাইতে শিখলাম, মধু জোগাড় করতে শিখলাম। প্রথম প্রথম বড্ড ভয় করত, তারপর জিনিসটা রপ্ত হয়ে গেল। দেখতাম লোকে জেনু কুইয়ো হাড়ু [একরকম মধু সংগ্রহের গান] গেয়ে গেয়ে গাছ বাইতে যাচ্ছে। আমি কখনও ও গান শিখিনি।" সোলিগারা বংশপরম্পরায় ওস্তাদ মউলি। কিন্তু অরুণের বাবা, অধুনা বছর তিপ্পান্নর এম. সন্নারঙ্গে গৌড়া বেশিদিন এ পেশায় ছিলেন না।
চামরাজনগর জেলায় বাসিন্দা সন্নারঙ্গে চাষবাস করেন, জনগোষ্ঠীর সমাজকর্মী হিসেবেও দায়িত্ব সামলান। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে সরকারি তরফে সোলিগা আদিবাসীদের বনের মধ্যে পোড়ু (ছোটো বসতি)-তে উঠে যেতে বাধ্য করা হয়, ঝুম চাষও ছাড়তে হয় তাঁদের। ইয়েলান্দুর তালুকের মুট্টুগাড়গাড্ডু পোড়ুতে যে একর দুয়েক জমি বরাদ্দ হয়েছিল তাঁদের নামে, তাতেই ১৯৭৪ সাল থেকে আবাদ করে আসছে অরুণদের পরিবার।

Courtesy: Arun
"আমরা আভারেকাই (শিমের প্রজাতিবিশেষ), জোলা (জোয়ার), টোগরি (অড়হর কড়াই), রাগি কতকিছু ফলাতাম। কিন্তু হাতি আর শুয়োর এসে সব তছনছ করে দিত। তাই ১৯৯০ এর সময় থেকে কফিচাষ ধরলাম," সন্নারঙ্গে বলেন।
স্কুলছুট হওয়ার পর থেকে বাবার সঙ্গে তাঁদের খেতের কাজ দেখতেন অরুণ – চারা রুইতেন, গাছ ছাঁটতেন, আশপাশ সাফসুতরো রাখতেন, আগাছা নিড়াতেন, জাম-টাম তুলে আনতেন। আরও সব টুকটাক কাজ করে দু'পয়সা কামাইয়ের চেষ্টাটাও জারি ছিল। "যা কাজ পেতাম করতাম। গাছ কাটা, কাঠ চ্যালা করা থেকে শুরু করে মধু কিংবা পাচি (লাইকেন) জোগাড় করে আনা, যেমন জুটত। একেকদিন তো ১০০০ টাকাও হাতে এসে যেত, কিন্তু রোজগারের কোনও ঠিকঠিকানা ছিল না আসলে।"
"সোলিগাদের তরুণ প্রজন্ম বাইরে তেমন কাজ পায় না। আর কোনও বিশেষ বিদ্যে তাঁদের জানা নেই, তাছাড়া লেখাপড়া করলেও যে সবসময় কাজ মেলে তাও তো নয়," এই জনগোষ্ঠী থেকে আসা প্রথম পিএইচডি গবেষক তথা সমাজকর্মী ড. সি. মাড়েগৌড়া বুঝিয়ে বলছিলেন এসব।
আঠেরো বছর বয়স থেকে অরুণ রোজগারের খোঁজে দেশান্তরি হওয়া শুরু করেন। নির্মাণক্ষেত্রে মজুরি কাজ নিয়ে বেঙ্গালুরু পাড়ি দেন প্রথম, পরে আবার কফি বা গোলমরিচের খেতেও কাজ জোটে, কর্ণাটক আর কেরালায়। ফসল কাটার পর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ঘরে ফিরতেন তিনি।
ওই মাসগুলোয় তাঁদের গ্রামে মধু সংগ্রহের পালা চলত।

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
"প্রত্যেকবার বেরোলেই যে মৌচাক পাবেন, তা কিন্তু নয়। মরসুমের প্রতিটা দিনও জঙ্গলে যাওয়া যায় না। মাসে ওই চার-পাঁচবার। আমরা সকালে বেরোতাম, আশেপাশে পনেরো কিলোমিটারের মধ্যে খুঁজেপেতে দেখতাম কোনও জেনু গুডু (মৌচাক) পাই কিনা, বাড়ি ফিরে আসতাম আর সন্ধেবেলা ফের যেতাম মধু কেটে আনতে। আবার দু'-তিনদিনের মতো খাবার-দাবার বেঁধে নিয়ে আরও গভীর জঙ্গলে চলে যেতাম প্রায়ই," খোলসা করেন অরুণ।
সংখ্যায় কতগুলো আর কতটা বড়ো মৌচাক খুঁজে পাচ্ছেন তার ওপর তাঁদের রোজগার নির্ভর করত। এক একবার গিয়ে ৬০-৭০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত মধু আনতে পারতেন। বাড়ি ফিরে, পরিষ্কার কাপড়ের জাল দিয়ে ছেঁকে ক্যানে করে করে ভরে রাখতেন সব। এই মধুই এক দালালকে বিক্রি করা হত দুশো কি তিনশো টাকা কিলো দরে, পুরো টাকাটা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেওয়া হত।
"সেদিনও তিন বন্ধু ছিল আমার সঙ্গে।" অরুণের মনে আজও দগদগে সেই বিপর্যয়ের স্মৃতি। "পড়ে যাওয়ার পর খুব চেষ্টা করছিলাম ওঠার। কিন্তু পিঠ দিয়ে চিত হয়ে পড়েছিলাম একদম, অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল। হাড়গোড় ভেঙে গেছিল। নড়তেচড়তে অব্দি পারছিলাম না। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে বলে বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ছিল আমার সঙ্গে, বুনো জন্তুজানোয়ার থেকে বাঁচবার জন্য আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। সকাল হতে গ্রামের লোকেরা এল, অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হল আমায়।" হাসপাতাল বলতে কাছের বিবেকানন্দ আদিবাসী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (বিবেকানন্দ ট্রাইবাল হেলথ সেন্টার বা ভিটিএইচসি) নিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না।

M. Palani Kumar
"সেই যে সেদিন সকাল থেকে শুরু হল, তারপর থেকে এই ক'টা বছর থেকে থেকেই হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে," দীর্ঘশ্বাস ফেলেন অরুণের বাবা। ভিটিএইচসির ডাক্তারেরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোমরের নিচে থেকে সমস্ত শক্তি হারিয়েছে অরুণ। সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁর মেরুরজ্জু (সুষুম্না কাণ্ড)। "ওঁরা আমাদের পাঠিয়ে দিলেন চামরাজনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (সিআইএমএস)-এ। ওখানে আবার ডাক্তারেরা বললেন ওর পিঠের হাড়টা জায়গায় জায়গায় গুঁড়িয়ে পিষে গেছে, অপারেশন করাতে হবে। একটা স্নায়ু অব্দি ছিঁড়ে গেছে। রিপোর্টগুলো হাসপাতালই রেখে দিল। আমাদের কেবল ওষুধ আর ইনজেকশনগুলো দিয়ে দেওয়া হল," বলছিলেন এম. গৌড়া।
মেরুদণ্ডের ভাঙা নালিপথ সারাতে আর স্নায়ুগুলোকে আরও জখমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সিআইএমএসে একটা অপারেশন করা হয়। তারপর আবার ভিটিএইচসি ফেরেন অরুণ। সেখানে পরিষেবা কর্মীরা তাঁর পরিবারের প্রাথমিক শুশ্রুষাকারীদের সব শিখিয়ে-পড়িয়ে দেন, তাঁর তরুণী স্ত্রীও গেছিলেন সেবার।

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
সবে তখন ছ'মাস হল বিয়ে হয়েছে তরুণ দম্পতির, হঠাৎই জীবনটা ওলোটপালোট করে দিয়ে গেল ভয়ানক এই দুর্ঘটনা। "ওর বউই ওর পুরো দেখভালটা করত, তারপর তো…," কথাটা শেষ করতে পারেন না অরুণের মা বছর পঁয়তাল্লিশের মাসানাম্মা। "সারাটা দিন জঙ্গলে জঙ্গলেই কাটে আমাদের। ও ঘরে থাকে, মোবাইল দেখে। আগে যেমন বন্ধুবান্ধব আসত, এখন আর তাদেরও দেখা পাওয়া যায় না। ওর একঘেয়ে লাগে, বড্ড অসহায় লাগে। আমি তো কিছু করতে পারি না। শুধু ওই চিন্তা করেই মরি। আর কি," শূন্য চোখে চেয়ে থাকেন তিনি।
"জানি না ডাক্তারেরা মা-বাবাকে কী বলেছেন। আমায় তো বলছিলেন আমি নাকি ফের নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে উঠতে পারব। বলেছিলেন একটু একটু হাঁটার চেষ্টা করতে। কিন্তু ধরবার মতো কিছু তো পাই না, চেষ্টা করে দেখিনি আর," অরুণ বলেন। হুইলচেয়ারের বাঁদিকের হাতলের ওপর রাখা ক্যাথিটার ব্যাগের প্লাস্টিক টিউবটা নিয়ে আপনমনে নাড়াচাড়া করতে থাকে তাঁর আঙুলগুলো।
অপারেশনের পরপরই প্রস্রাবধারণে সমস্যা দেখা দেয় অরুণের। ভিটিএইচসির ডাক্তাররা সারানোর চেষ্টা করেন বটে, লাভ কিছু হয় না। তলপেটের নিচের দিকটা ফুলে উঠে ব্যথা করতে থাকে, বাইরে থেকেই বোঝা যায় ফোলা ভাব। সেই নিয়ে ২০২৪-এর জুন মাসে আরেক প্রস্থ হাসপাতাল ছোটাছুটি। প্রথমে সিআইএমএস তারপর মাইসোরের কে. আর. হাসপাতালের একজন ইউরোলজিস্টকে দেখানো হয়। সমস্যাটা খতিয়ে দেখার জন্য পাঁচদিন ভর্তি রেখে ছেড়ে দেওয়া হয় তাঁকে।

M. Palani Kumar

Pratishtha Pandya
পুরো জুলাই-অগস্ট জুড়ে সমস্যাটা ফিরে ফিরে আসতে থাকল। আর প্রত্যেকবারই মাইসোরে এক ইউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে দিনকয়েক ভর্তি থাকতে হত অরুণকে। প্রায়ই সংক্রমণ হয়ে যেত, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা চলত। কখনও বাড়ত রক্তচাপ, তাতে আবার অ্যান্টিআ্যংজাইটি (উদ্বেগ প্রতিরোধী) ওষুধ দিতে হত। শুশ্রুষা করাটাও কঠিন হয়ে উঠছিল দিনের পর দিন।
"ওই পেচ্ছাপের সমস্যাটা হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার মাইসোর ছুটতে হয়েছিল," বলেন অরুণের বাবা। "সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাটা নিখরচায় হয় বটে, কিন্তু গাড়িভাড়া তো লাগে। চামরাজনগর যেতে তিন হাজার আর মাইসোর – পাঁচ! তার ওপর থাকা খাওয়ার খরচা তো আছেই…প্রত্যেকবার যাওয়া বাবদ অন্ততপক্ষে হাজার দশেক টাকা বেরিয়েই যেত।"
আসলে অরুণের মতো মানুষদের জন্য সরকার থেকেও খুব একটা কিছু করা হয় না, বলছিলেন ড. মাড়েগৌড়া। "বাঘের হাতে প্রাণ গেলে কিংবা হাতি হামলা করলে, তাও লাখবিশেক টাকা মতো ক্ষতিপূরণ মেলে। এমনকি লার্জ এরিয়া মাল্টিপারপাস সোসাইটিগুলো (প্রত্যন্ত এলাকায় ক্রিয়াশীল সমবায় সমিতি বিশেষ) গুরুতর দুর্ঘটনা বা অসুখবিসুখের জন্যেও বিমা পলিসির সুবিধে দেয়। কিন্তু মধু সংগ্রহ করতে গাছ থেকে পড়েছ মানে, কপালে কিস্যু জুটবে না – না বিমা, না ক্ষতিপূরণ।" বিআর পাহাড়ের মতোই দেশজুড়ে বনজ দ্রব্য সংগ্রহকারী আদিবাসীরা এই একই বঞ্চনার শিকার। "অরুণের আগেও কেরেড়িম্বা পোড়ুর আরেকটি ছেলে গাছ থেকে পড়ে পাটা খুইয়েছিল।" সমবায় সমিতি মাঝেমধ্যে দু'-তিন হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় বটে, কিন্তু তাতে দিন চলে না।

Pratishtha Pandya
ডাক্তাররা শুধু "অল্পখানিক ঠিক করতে পেরেছিলেন [অরুণের সমস্যাটা]," বলেন তাঁর বাবা। "কে. আর. হাসপাতাল থেকে বলল, আরও সুযোগ-সুবিধে আছে এমনি কোথাও চিকিৎসা করাতে হবে। আমাদের পয়সা কোথায়? এখন প্রতি তিন মাসে [ভিটিএইচসি থেকে] একজন ডাক্তার এসে ওর ক্যাথিটারটা বদলে দিয়ে যান, পয়সা নেন না। কোথাও আটকে-টাটকে যাওয়ার মতো বড়ো কিছু সমস্যা হলে আমাদের আবার সেই চামরাজনগর নিয়ে যেতে হয়।"
সেই পুরোনো চেনা ছন্দটা একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছে অরুণের জীবন থেকে।
"সকাল থেকে শুধু বসেই থাকি এখেনে। মাঝেমাঝে চেয়ারটা টেনে নিয়ে একদম বাইরের বড়ো দরজা অব্দি যাই। নয়তো রোদ্দুরে বসি খানিকক্ষণ। ফের ঘরে ফিরে আসি। আগে তো [আসল বাড়িতে] সবাই একসঙ্গে থাকা হত। আমি বসে যাওয়ার পর থেকে সব খাঁ-খাঁ করে। মোবাইলে কিছু না কিছু একটা দেখতে থাকি। এই ছাউনিটা আগেই বানানো হয়েছিল। চলাফেরায় সুবিধে হবে বলে আমিই ভাবলাম এখানে চলে আসি। কাউকে তো পাই না একটু হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো। আর ভাল্লাগে না এভাবে থাকতে।
"আমার বৌও ছেড়ে চলে গেছে," অরুণ মৃদু কণ্ঠে বলেন। "ও আমার যত্নআত্তি করত। কিন্তু যখন কিছুতেই কিছু সারছিল না, ও চলে গেল। একবার আমায় ফোন করে বলেছিল, 'তুমি ভালো হয়ে গেলে আমি আবার ফিরে আসব।' তিন মাস হল ও চলে গেছে।" শরীরের মতো তাঁর গলার স্বরটাও গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়তে চাইছিল যেন।

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
"আমি ওকে নাশতা আর রাতের খাবারটুকু দিয়ে আসি," বলছিলেন অরুণের মা। "চানও করিয়ে দিই। বাথরুম যেতে হলে ওর বাবা দেখে।" তাঁর ঘরে এক ব্যাগ প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়পার ঝুলতে দেখেছিলাম। "শুধু ওতেই মাসে পনেরোশো টাকা করে খরচা হয়," অরুণের বাবা আক্ষেপ করেন।
"বোনেরা দিনে পাঁচ-দশ মিনিট কথা বলে ওর সঙ্গে, তাদেরও তো কলেজের কাজকম্ম আছে।" একটু চুপ করে থেকে ফের মাসানাম্মা বলেন: "আমরা শুধু চাই ও একটু একটু হেঁটে বেড়াক, নিজের কাজটুকু অন্তত নিজে করতে পারুক।"
"তার জন্য বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে," কথার পিঠেই উত্তর করেন বাবা।
"আর কোত্থাও ভর্তি করব না ওকে," রুক্ষ শোনায় মায়ের গলাটা। "শেষবার যখন করা হল, কিচ্ছু তো বদলাল না। আবার ওইসব সইবার মতো অবস্থা নেই আমার।"
"আসলে আমার স্ত্রী হাসপাতাল-টাতাল খুব একটা পছন্দ করেন না। সেজন্যই আসলে…" বোঝাতে চান সন্নারঙ্গে।

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
"ওখানে ওকে দেখবে কে?" সন্নারঙ্গে কথাটা শেষ করার আগেই ঝাঁঝিয়ে ওঠেন মাসানাম্মা। "কেউ না। আর আমরা যদি যাই, এখানে কামকাজ সামলানোর লোক থাকবে না। তার মানে আমরাও পারব না। এতদিক সামলানো যায় একসঙ্গে?" বলতে বলতে আচমকা উঠে খেতের কাজে বেরিয়ে যান। হয়তো কাজে ডুবে গিয়ে এই দিশেহারা শোক থেকে রেহাই চান কিছুটা।
অরুণের অবশ্য সে সুযোগটুকুও নেই। তাঁর শুধু অপেক্ষায় বাঁচা। কখন কেউ তাঁকে একটু সহায়তা করবে। কখন কীভাবে সময়টা কাটবে।

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
মার্চ মাস এলে আবার ফুল ধরবে জামগাছগুলোয়। হালকা হলুদ ফুলেদের মধুর খোশবাই ছুটবে দিকে-দিকে। ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে আসবে পরিযায়ী পাহাড়ি মৌমাছি। আর দেরি নেই! বিআর পাহাড়ের বনে বনে আরেকটা মধু সংগ্রহের মরসুম এল বলে। অরুণের যুবক বন্ধুরা পা মিলিয়ে এগিয়ে যাবে লম্বা লম্বা গাছগুলোর দিকে। বনের গাছে গাছে প্রতিধ্বনিত হবে চাক-কাটার গান, মউলিদের গান – জেনু কুয়ো হাড়ু:
ডাক রে তারে ডাক গো, ডাকি…
ডাক ঝুপসি বনের মানুষ যে…
মৌমাছির চাকে যেথায় মধু ভরে ওঠে…
মৌমাছির চাকে যেথায় মধু ভরে রে…
ঘন গাঢ় মৌ টুপটুপ মধুমাছির চাক…
ঘন গাঢ় মৌ টুপটুপ মধুমাছির চাক…
ও ডাকি ভাই, ডাক রে তারে, ডাক…
তখন অরুণের গানটা জানা ছিল না; আজ আর এ গান গলায় তুলতেও চান না তিনি…

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar

M. Palani Kumar
অরুণ আর তাঁর পরিবার তো বটেই, এছাড়াও – ড. প্রথমেশ, বেঙ্গালুরুর ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ ও বিআর পাহাড়ের গিরিজন কল্যাণ কেন্দ্রের ড. তন্যা শেষাদ্রি, ড. সঙ্গীতা ভি, সোলিগা সমাজকর্মী করানা কেথেগৌড়া ও মহাদেবাম্মা কুম্বেগৌড়ার কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ এই প্রতিবেদক। এঁদের সকলের অমূল্য সহযোগিতা ছাড়া কোনওভাবেই প্রতিবেদনটি লেখা সম্ভব হত না। লেখার সময় বিভিন্ন পর্যায়ে অনুবাদের কাজে সহায়তার জন্য ড. শোভনা কিরণ, শঙ্কর এন কেঞ্চানুরু আর দীপারও অসংখ্য ধন্যবাদ প্রাপ্য।
অনুবাদ: রম্যাণি ব্যানার্জী
Want to republish this article? Please write to [email protected] with a cc to [email protected]
Donate to PARI
All donors will be entitled to tax exemptions under Section-80G of the Income Tax Act. Please double check your email address before submitting.
PARI - People's Archive of Rural India
ruralindiaonline.org
https://ruralindiaonline.org/articles/the-broken-winged-bird-of-br-hills-bn

